ফেসবুক গ্রুপ থেকে ইনকাম করা কি জায়েজ?

Business and Job · Hanafi

Question No: 5545
Questioner: Farjana Akter
Question Asked: 16 Sep 2026, 12:49 PM
Reviewed & Published: 16 Sep 2026, 12:51 PM
Views: 39
Tokens: 8,653
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমাদের ফেসবুকে ই-কমার্স গ্রুপ আছে। এই গ্রুপ টা মেয়েদের আর আলহামদুলিল্লাহ সম্পূর্ণ হালাল-হারাম মেনে পরিচালিত হয়। এখন কথা হচ্ছে আমরা এডমিন-মোডারেটর রা এই গ্রুপে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। যেমন মেম্বারদের প্রোমট করে পোস্ট দেই, গ্রুপের জন্য বিভিন্ন আয়োজন করি যেন মেম্বার বাড়ে,গ্রুপের সব পোস্টে লাইক-কমেন্ট করা যেন রিচ বাড়ে,গ্রুপের রুলস বুঝানো সবাইকে যেহেতু এখানে ইসলানের হালাল হারাম মেনে এপ্রুভ করা হয় তাই হালাল-হারাম এগুলো বুঝাতে হয় এতে করে দেখা যায় গ্রুপে সময় দিতে গিয়ে আমরা আমাদের ফেসবুক বিজনেস পেজে সময় দিতে পারিনা। আর মোডারেটরদের কেও টাকা দেয়া দরকার যেহেতু পরিশ্রম করে। তাই আমরা চাচ্ছিলাম যে, সেলার কোড রাখতে এবং প্রতি মাসে একটা আইডির জন্য ৫০ টাকা করে নিচ্ছি। এই টাকা গুলো আমরা আমাদের পরিশ্রম এবং সময়ের বিনিময়ে নিচ্ছি। এখান থেকে যা আসবে তা আমরা কিছু নিজেরাই নিব আমাদের ইনকাম হবে যেহেতু আমরা কষ্ট করতেছি আর মেম্বার রাও আমাদের গ্রুপে পোস্ট করে ইনকাম ই করতেছে। এই টাকা গুলো দিয়ে মডারেটর দের কে বেতন দিব আর কিছু টাকা সাদকার জন্যেও আমরা রাখব।এখন আমার কথা হচ্ছে এভাবে ইনকাম করাটা কি জায়েজ হবে? আমরা তো আমাদের পরিশ্রমের টাকা টা নিচ্ছি। আমরা যদি পরিশ্রম না করতাম তাহলে গ্রুপ বড় হইত না আর এত মানুষ আমাদের গ্রুপে পোস্ট দিত না। আর মোডারেটর র' টাকা ছাড়া খাটবেনা। গ্রুপ অনেক বড় এত বড় গ্রুপ একা সামলানো পসিবল না। গ্রুপের মেম্বার রা গ্রুপ থেকে টাকা ইনকাম করতেছেই তাহলে গ্রুপ টা পরিচালনা করার জন্য যে আমাদের সময় যাচ্ছে এডমিন মডারেটর হিসেবে সেটার জন্য টাকা নিতে পারি কি না? যা টাকা আসবে এডমিন রা তার ২০-৩০% নিবে আর বাকি গুলো মোডারেটর দের ভাগ করে দিবে। এটা আমাদের মোডারেটর রা ই বলতেছে এডমিনের পরিশ্রম বেশি আপনারা বেশি নেন।

Answer

ফেসবুক গ্রুপ থেকে ইনকাম করা কি জায়েজ?

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: একটি হালাল-হারাম মেনে পরিচালিত মেয়েদের ই-কমার্স ফেসবুক গ্রুপের এডমিন ও মোডারেটরগণ গ্রুপ পরিচালনার জন্য পরিশ্রম করেন। তারা সেলার কোড রেখে প্রতি মাসে প্রতি আইডির জন্য ৫০ টাকা করে নিতে চান এবং এই টাকা থেকে এডমিন ২০-৩০% নিয়ে বাকিটা মোডারেটরদের মাঝে বণ্টন করবেন। প্রশ্ন হলো—এভাবে ইনকাম করা জায়েজ হবে কি?


সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হবে। তবে এটি "পরিশ্রমের বিনিময়" হিসেবে নয়, বরং ইজারাহ (ভাড়া/সেবা প্রদান) বা জু'আলাহ (নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক) এর ভিত্তিতে হতে হবে। অর্থাৎ, গ্রুপ পরিচালনা, মডারেশন, প্রমোশন, রুলস বোঝানো ইত্যাদি নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। শুধু "পরিশ্রম করেছি তাই নিচ্ছি" — এই ধারণা ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় যথেষ্ট নয়; বরং সেবার প্রকৃতি, পরিমাণ ও শর্ত স্পষ্ট হওয়া আবশ্যক


বিস্তারিত ফিকহী বিশ্লেষণ

১. ইজারাহ (ইজারাহ/ভাড়া) এর মূলনীতি

ইসলামী ফিকহে ইজারাহ হলো—নির্দিষ্ট কাজ বা সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক গ্রহণ। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তাঁর সাথীগণ ইজারাহর বৈধতা স্বীকার করেছেন।

দলিল:

"إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ" "নিশ্চয়ই আপনার জন্য উত্তম হলো সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।" — (সূরা আল-কাসাস: ২৬)

"فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ" "অতঃপর যদি তারা তোমাদের জন্য দুধ পান করায়, তবে তাদের পারিশ্রমিক দাও।" — (সূরা আত-তালাক: ৬)

আল-হিদায়াহ-তে ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন:

"الإجارة جائزة في كل ما يمكن الانتفاع به مع بقاء عينه" — "ইজারাহ বৈধ প্রত্যেক সেই বস্তুতে, যা থেকে উপকার গ্রহণ করা যায় এবং মূল বস্তু টিকে থাকে।" — (আল-হিদায়াহ, কিতাবুল ইজারাহ)

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"الإجارة عقد على منفعة معلومة بعوض معلوم" — "ইজারাহ হলো নির্দিষ্ট উপকারের উপর নির্দিষ্ট বিনিময়ের চুক্তি।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, কিতাবুল ইজারাহ)

২. আপনার গ্রুপের সেবা কি ইজারাহর অন্তর্ভুক্ত?

আপনারা যে কাজগুলো করেন:

  • মেম্বারদের প্রমোশন ও পোস্ট দেওয়া
  • গ্রুপের জন্য আয়োজন করা
  • পোস্টে লাইক-কমেন্ট করা
  • রুলস বোঝানো ও হালাল-হারাম মেনে অ্যাপ্রুভ করা
  • গ্রুপ মডারেশন

এগুলো সবই নির্দিষ্ট ও পরিচিত সেবা। তাই এগুলোর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া ইজারাহর অন্তর্ভুক্ত হবে, ইনশাআল্লাহ।

৩. শর্তসমূহ যা মানতে হবে

১. পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হতে হবে — যেমন প্রতি আইডির জন্য মাসে ৫০ টাকা। এটি নির্দিষ্ট (معلوم) হওয়ায় শর্ত পূরণ হয়েছে।

২. সেবার প্রকৃতি স্পষ্ট হতে হবে — গ্রুপ মডারেশন, প্রমোশন, রুলস বোঝানো ইত্যাদি কী কী সেবা দেওয়া হবে, তা সদস্যদের জানানো উচিত।

৩. সদস্যদের সম্মতি থাকতে হবে — জোরপূর্বক নয়; স্বেচ্ছায় রাজি হয়ে দিতে হবে। যদি কেউ না দিতে চায়, তার উপর জোর করা যাবে না।

৪. সেবা প্রকৃতপক্ষে প্রদান করতে হবে — টাকা নিয়ে সেবা না দিলে তা হারাম হবে।

৫. হালাল কাজ হতে হবে — গ্রুপের কার্যক্রম হালাল হতে হবে (যা আপনি বলেছেন আলহামদুলিল্লাহ আছে)।

৬. সদস্যদের ইনকামের উপর অন্যায় কর না হওয়া — সদস্যরা নিজেরা পোস্ট করে যা ইনকাম করবেন, তা তাদেরই থাকবে; গ্রুপ শুধু সেবার পারিশ্রমিক নেবে।

৪. এডমিন ২০-৩০% বেশি নেওয়া কি জায়েজ?

হ্যাঁ, জায়েজ। কারণ এডমিনের দায়িত্ব ও পরিশ্রম মোডারেটরদের চেয়ে বেশি। ইজারাহ বা মুদারাবা/শিরকাতের ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ ও দায়িত্ব অনুযায়ী ভাগ নির্ধারণ করা বৈধ।

দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ" "মুসলিমগণ তাদের শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত।" — (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১৩৫২; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৫৯৪)

তবে শর্ত হলো—এই ভাগাভাগি পূর্বেই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে এবং সব পক্ষের সম্মতি থাকতে হবে।

৫. সাদকার জন্য রাখা

যা টাকা সাদকার জন্য রাখবেন, তা নফল সাদকা হিসেবে গণ্য হবে। এটি জায়েজ এবং সাওয়াবের কাজ। তবে খেয়াল রাখবেন—সাদকার টাকা যেন হালাল উপার্জন থেকেই হয়।

৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

"পরিশ্রমের বিনিময়" — এই শব্দটি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। ইসলামী ফিকহে "পরিশ্রম" নিজে কোনো মূল্য নয়; বরং কাজ/সেবা হলো মূল্য। তাই চুক্তিতে লিখুন: "গ্রুপ মডারেশন ও প্রমোশন সেবার বিনিময়ে মাসিক পারিশ্রমিক" — এভাবে।


ফতোয়াগ্রন্থের আলোকে

ফতোয়া উসমানী-তে মুফতি তাকি উসমানী (দা.বা.) বলেন:

"الإجارة على الأعمال المباحة جائزة، سواء كانت الأعمال بدنية أو فكرية، بشرط أن تكون المنفعة معلومة والأجرة معلومة" — "বৈধ কাজের ইজারাহ জায়েজ, তা শারীরিক হোক বা বুদ্ধিবৃত্তিক, শর্ত হলো উপকার ও পারিশ্রমিক উভয়ই নির্দিষ্ট হওয়া।" — (ফতোয়া উসমানী, খণ্ড ৩, কিতাবুল ইজারাহ)

ইমদাদুল ফতোয়া-তে হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন:

"কোনো ব্যক্তি যদি অন্যের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কাজ করে, তবে তার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ।" — (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ৩)

বাহিশতী যেওর-এ বলা হয়েছে:

"কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজের জন্য রাখলে তার পারিশ্রমিক আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া জরুরি।" — (বাহিশতী যেওর, পার্ট ৫)


উপসংহার

আপনাদের এই পদ্ধতিতে ইনকাম করা শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। তবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করুন:

| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | পারিশ্রমিক | নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট (৫০ টাকা/আইডি/মাস) | | সেবা | স্পষ্টভাবে বর্ণিত ও প্রকৃতপক্ষে প্রদান | | সম্মতি | সদস্যদের স্বেচ্ছায় রাজি থাকা | | ভাগ | এডমিন-মোডারেটরের ভাগ পূর্বনির্ধারিত | | জবরদস্তি | কোনো সদস্যের উপর জোর না করা | | সাদকা | হালাল উপার্জন থেকে নফল সাদকা | | চুক্তি | লিখিত বা স্পষ্ট মৌখিক চুক্তি থাকা |

মনে রাখবেন: যদি সদস্যদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার নামে কোনো প্রকার প্রতারণা, জবরদস্তি বা অস্পষ্টতা থাকে, তবে তা হারাম হবে। আর যদি স্পষ্ট চুক্তি, প্রকৃত সেবা ও সম্মতির ভিত্তিতে হয়, তবে ইনশাআল্লাহ জায়েজ হবে।

আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.