খেলায় স্পন্সর করা কি জায়েয?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমাদের Amanah Foods নামে ছোট একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমরা অনলাইনে এবং আশেপাশের দোকানে বিভিন্ন ধরনের পণ্য সেল করি। আশেপাশের দোকানে বাদাম এবং মধু দিয়ে তৈরি "মিনি হানি নাটস" বিক্রি করি। এছাড়া আমরা মধু, তেল, ঘি, মসলা ইত্যাদি বিক্রি করি।
আমরা মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানায় থাকি। আমাদের গ্রামে মাঝে মাঝে ফুটবল খেলা হয়। গ্রামভিত্তিক খেলা হয় এবং টুর্নামেন্টে হয়।ওইখানে দূর দূরান্ত থেকে অনেক গ্রামের মানুষই আসে।
আমরা আমাদের ব্যবসার মার্কেটিং এর উদ্দেশ্যে খেলা পরিচালনাকারী ভলেন্টিয়ার টিমকে আমাদের লোগো সহ গেঞ্জি কিনে দিতে চাই। এতে আমাদের কোম্পানির প্রচার বাড়বে। এছাড়া মাঠের চারদিকে সীমানার জন্য লাল পতাকা টানানো হয়। ওই পতাকাতেও আমরা আমাদের কোম্পানির লোগো দিতে চাই। এজন্য আমাদের পতাকাগুলো কিনে দিতে হবে। এবং আমরা মাঠের পাশে একটা সাময়িক দোকান দিতে চাই। যেখানে খেলা চলাকালীন সময়ে যে সকল মানুষ আসবে তারা আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারবে, আমাদের পণ্য দেখতে পারবে এবং কিনতে পারবে। এবং যারা খেলা পরিচালনা করবে এবং খেলার বিবরণী মাইকে বলতে থাকবে তাদের মাধ্যমেও আমরা পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে চাই। এজন্য তাদের হয়তো কিছু টাকা দিতে হবে।
প্রশ্ন ১: আমরা টাকা দিয়ে খেলায় দায়িত্বরত ভলান্টিয়ারদের গেঞ্জি কিনে দিলে ইসলামিক দৃষ্টিতে কোন সমস্যা আছে?
প্রশ্ন ২: খেলার মাঠের সীমানার পতাকা কিনে দেওয়া কি জায়েজ হবে?
প্রশ্ন ৩: খেলার উদ্দেশ্যে আসা মানুষদের জন্য দোকান দিয়ে বিক্রি করা কি জায়েজ হবে?
প্রশ্ন ৪: খেলার বিবরণী মাইকে প্রকাশ করা ব্যক্তিদের টাকা দিয়ে মার্কেটিং করানো কি জায়েজ হবে?
Answer
খেলায় স্পন্সর করা: ইসলামী দৃষ্টিকোণ
উক্ত খেলায় যদি হারাম বিষয় থাকে** যেমন: জুয়া, বাজি ধরা, সতর খোলা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গান-বাজনা, নামাজ ত্যাগ করা — তাহলে সেই খেলাকে স্পন্সর করা নাজায়েয, কারণ এটি গুনাহের কাজে সহায়তা।
অন্যথায় জায়েজ।
উত্তর (বিস্তারিত):
بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين، أما بعد
মূলনীতি (উসূল)
ইসলামী শরীয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো:
الأصل في المعاملات الإباحة — "মুআমালাত (লেনদেন) বিষয়ে মূলনীতি হলো বৈধতা।"
অর্থাৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পার্থিব লেনদেনে মূল বিধান হলো জায়েয, যতক্ষণ না কোনো স্পষ্ট হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত না হয়। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, ইবনে আবিদীন, খণ্ড ৪; আল-আশবাহ ওয়ান নাযায়ির, ইবনে নুজাইম)
তবে শর্ত হলো — লেনদেনে কোনো হারাম বস্তু, হারাম কার্যক্রম বা গুনাহের কাজে সহায়তা থাকা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ — "নেক কাজ ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, আর গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)
প্রশ্ন ১: ভলান্টিয়ারদের গেঞ্জি কিনে দেওয়া
উত্তর: এটি শর্তসাপেক্ষে জায়েয। কারণ এটি একটি প্রচলিত ব্যবসায়িক প্রচার/স্পন্সরশিপ (Sponsorship), যা ইসলামী ফিকহে "ইজারা" বা "জু'আলা"-এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, অথবা সাধারণ দান-সদকা হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
তবে লক্ষণীয় বিষয়:
-
খেলা যদি শরীয়তসম্মত হয় (যেমন: পোশাক-সতর ঠিক থাকা, নামাজ-নামাযের সময়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা, জুয়া/বাজি না থাকা, হারাম কিছু না থাকা) — তাহলে গেঞ্জি কিনে দেওয়া জায়েয।
-
খেলায় যদি হারাম বিষয় থাকে (যেমন: বাজি ধরা, সতর খোলা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, গান-বাজনা, নামাজ ত্যাগ) — তাহলে সেই খেলাকে স্পন্সর করা নাজায়েয, কারণ এটি গুনাহের কাজে সহায়তা।
-
গেঞ্জিতে কোম্পানির লোগো থাকা — এতে আপত্তি নেই, এটি প্রচারের একটি বৈধ মাধ্যম।
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ৩) ও ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী) — এ উভয় কিতাবেই স্পন্সরশিপের মূলনীতি আলোচিত হয়েছে যে, যদি স্পন্সরকৃত কাজটি নিজে জায়েয হয়, তবে স্পন্সর করাও জায়েয।
প্রশ্ন ২: মাঠের সীমানার পতাকা কিনে দেওয়া
উত্তর: এটিও জায়েয, যদি খেলাটি শরীয়তসম্মত হয়। কারণ এটি খেলার আয়োজন ও পরিচালনার একটি সাধারণ প্রয়োজনীয়তা, এবং এতে কোম্পানির প্রচারও হচ্ছে — যা একটি বৈধ ব্যবসায়িক স্বার্থ।
তবে মনে রাখতে হবে — পতাকা বা ব্যানারে কোনো হারাম ছবি, অশ্লীলতা বা ইসলামবিরোধী কিছু থাকা যাবে না।
প্রশ্ন ৩: খেলার উদ্দেশ্যে আসা মানুষের জন্য দোকান দেওয়া
উত্তর: সম্পূর্ণ জায়েয। এটি সাধারণ ব্যবসা। খেলা দেখতে আসা মানুষের কাছে পণ্য বিক্রি করা একটি বৈধ লেনদেন। এতে কোনো আপত্তি নেই।
শর্ত:
- পণ্য হালাল হতে হবে (আপনাদের পণ্য মধু, তেল, ঘি, মসলা — এগুলো হালাল, আলহামদুলিল্লাহ)।
- বিক্রয়ে কোনো প্রতারণা, মাপে কম দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ইত্যাদি না থাকা।
- দোকান পরিচালনায় পর্দা ও শরীয়তের বিধান মানা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا — "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
প্রশ্ন ৪: মাইকে বিবরণী প্রকাশকারীদের টাকা দিয়ে মার্কেটিং করানো
উত্তর: এটিও শর্তসাপেক্ষে জায়েয। কারণ এটি একটি বিজ্ঞাপন চুক্তি (Advertising Contract), যা ইসলামী ফিকহে "ইজারা"-এর অন্তর্ভুক্ত। আপনি তাদেরকে পারিশ্রমিক দিচ্ছেন একটি নির্দিষ্ট কাজের (আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপন বলা) বিনিময়ে — এটি বৈধ।
শর্ত:
- পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট হতে হবে (টাকা, পণ্য বা অন্য কিছু)।
- কাজটি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হতে হবে (কতবার, কীভাবে বিজ্ঞাপন বলবে)।
- বিজ্ঞাপনে মিথ্যা, অতিরঞ্জন বা প্রতারণামূলক কিছু না থাকা।
- খেলার ধারাভাষ্য নিজেই যদি হারাম হয় (যেমন: বাজি, অশ্লীল মন্তব্য), তাহলে সেই কাজে সহযোগিতা করা যাবে না।
ফাতাওয়া আলমগিরি (খণ্ড ৩) ও আল-হিদায়া (মারগিনানি, কিতাবুল ইজারা) — এতে ইজারা চুক্তির শর্তাবলি বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে, যা এখানে প্রযোজ্য।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | বিধান | শর্ত | |--------|--------|------| | ১. ভলান্টিয়ারদের গেঞ্জি | জায়েয | খেলা শরীয়তসম্মত হতে হবে | | ২. সীমানার পতাকা | জায়েয | হারাম ছবি/বিষয়বস্তু না থাকা | | ৩. খেলার সময় দোকান | জায়েয | হালাল পণ্য, সততার সাথে বিক্রি | | ৪. মাইকে বিজ্ঞাপন | জায়েয | পারিশ্রমিক নির্দিষ্ট, মিথ্যা না থাকা |
সতর্কতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — খেলাটি নিজেই শরীয়তসম্মত হতে হবে। যদি খেলায় বাজি ধরা হয়, সতর খোলা হয়, নামাজের সময় খেলা চলে, গান-বাজনা হয় — তাহলে এসব স্পন্সর করা জায়েয হবে না। কারণ গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা হারাম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন ও হালাল ব্যবসার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৪ — কিতাবুল ইজারা
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানি), খণ্ড ৩
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৪
- ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩ — কিতাবুল ইজারা
- আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুল ইজারা
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা মায়িদা: ২-এর তাফসির