ইস্তিহাযা ও মাসিক
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
মাসিক ও ইস্তিহাযার পার্থক্য এবং আপনার মাসআলা
আপনার বর্ণিত সমস্যাটির ক্ষেত্রে ফিকহে হানাফীর নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে হায়েজ (মাসিক) ও ইস্তেহাজা (অসুস্থতাজনিত রক্ত) পৃথক করার শরয়ী নিয়ম, রক্ত শুরু হওয়ার সময় গণনা এবং নামায-রোযা আদায়ের সঠিক সমাধান নিচে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ বিস্তারিত পেশ করা হলো:
সংক্ষিপ্ত সমাধান:
১. পুরোপুরি হেভি ব্লিডিং শুরু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা সঠিক নয় । প্রথম যেদিন অল্প লালস্রাব দেখা দেবে, সেদিন থেকেই আপনার হায়েজ শুরু হয়েছে বলে গণ্য হবে । তাই লালস্রাব দেখামাত্র নামায-রোযা বন্ধ রাখতে হবে । ২. যদি লালস্রাব ও ব্লিডিং মিলে মোট রক্তস্রাবের দিন ১০ দিন বা ১০ দিনের কম সময়ের মধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো সময়টিই ‘হায়েজ’ গণ্য হবে । ৩. আর যদি মোট রক্তস্রাবের দিন ১০ দিন পার হয়ে ১৩-১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়, তবে আপনার আগের জানা অভ্যাসের (আদাতের) দিনগুলো ‘হায়েজ’ গণ্য হবে এবং বাকি অতিরিক্ত দিনগুলো ‘ইস্তেহাজা’ গণ্য হবে ।
শরয়ী মাসআলা ও বিস্তারিত ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. লালস্রাব দেখা দিলে কখন থেকে হায়েজ ধরা হবে?
হানাফী ফিকহের মূলনীতি অনুযায়ী, হায়েজের নির্দিষ্ট মেয়াদের ভেতরে নির্গত লাল, গাঢ় লাল, বাদামী, হলুদ, মাটি বর্ণ বা ধূলি বর্ণের যেকোনো স্রাবই শরীয়তের দৃষ্টিতে রক্তের অন্তর্ভুক্ত এবং হায়েজ হিসেবে গণ্য । সুতরাং, শুরুতে যে ৪/৫ দিন অল্প অল্প লালস্রাব যায়, তা হায়েজেরই অংশ। পুরো ব্লিডিং হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে নামায পড়ে যাওয়া শরীয়তসম্মত নয়; বরং লালস্রাব দেখামাত্রই হায়েজ শুরু হয়েছে ধরে নামায-রোযা বন্ধ করে দেওয়া আবশ্যক ।
২. ১০ দিনের হিসাব ও ইস্তেহাজা নির্ধারণের নিয়ম:
শরীয়তে হায়েজের সর্বনিম্ন মেয়াদ ৩ দিন ৩ রাত এবং সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন ১০ রাত [৪৬, ১১৩]। ১০ দিনের অতিরিক্ত রক্তকে ‘ইস্তেহাজা’ (অসুস্থতাজনিত রক্ত) বলা হয় ।
- পরিস্থিতি-১ (যদি ১০ দিনের মধ্যে রক্ত বন্ধ হয়):
শুরুর লালস্রাব, মাঝের ব্লিডিং এবং শেষের লালস্রাব সব মিলিয়ে যদি ১০ দিন ১০ রাতের ভেতরেই রক্ত পুরো বন্ধ হয়ে যায়, তবে সম্পূর্ণ সময়টিই আপনার হায়েজ বা মাসিক হিসেবে গণ্য হবে । - পরিস্থিতি-২ (যদি ১০ দিন পার হয়ে ১৩/১৪ দিন পর্যন্ত যায়):
যদি রক্ত ১০ দিন অতিক্রম করে যায়, তবে পুরো সময় হায়েজ থাকবে না। এ ক্ষেত্রে:- আপনার যদি আগে থেকে নির্দিষ্ট কোনো অভ্যাস (আদাত) জানা থাকে: (যেমন: এই সমস্যা হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে মাসে ৬ দিন, ৭ দিন বা ৮ দিন হায়েজের অভ্যাস ছিল), তবে রক্ত ১০ দিন পার হয়ে গেলে কেবল ওই অভ্যাসের দিনগুলোই ‘হায়েজ’ হিসেবে গণ্য হবে। অভ্যাসের অতিরিক্ত দিনগুলো (চাই তা শুরুর লালস্রাবের দিন হোক বা শেষের দিন হোক) ‘ইস্তেহাজা’ হিসেবে ধরা হবে।
- যদি কোনো নির্দিষ্ট অভ্যাস জানা বা মনে না থাকে: তবে প্রথম লালস্রাব শুরু হওয়ার পর থেকে প্রথম ১০ দিন ১০ রাত পর্যন্ত ‘হায়েজ’ গণ্য হবে এবং ১০ দিনের পরবর্তী দিনগুলো (১১, ১২, ১৩, ১৪তম দিন) ‘ইস্তেহাজা’ গণ্য হবে।
আপনার বর্তমান ভুল ধারণা ও করণীয়:
১. ভুল সংশোধন: লালস্রাব থাকা সত্ত্বেও "শিওর না থাকার কারণে" নামায পড়ে যাওয়া সঠিক নয়। কারণ লালস্রাবই হায়েজের সূচনা নির্দেশ করে । ২. এখন কী করবেন:
- প্রথম লালস্রাব দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই হায়েজ ধরে নামায-রোযা বন্ধ রাখবেন।
- যদি ১০ দিন পার হয়ে রক্ত চলতে থাকে, তবে আপনার হায়েজের নির্ধারিত অভ্যাসের দিনগুলো শেষ হওয়া মাত্রই গোসল করে নামায-রোযা পড়া শুরু করবেন।
- ইস্তেহাজার দিনগুলোতে নামায পড়া ফরয। এ সময় প্রতিটি ফরয নামাযের ওয়াক্ত শুরু হলে নতুন ওজু করে নামায আদায় করবেন ।
- অতীতে ইস্তেহাজার দিনগুলোতে ভুলবশত যেসব ফরয নামায ছাড়া পড়ে গেছে, সেগুলোর আনুমানিক হিসাব করে কাযা পড়ে নেবেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৩ (প্রথম পরিচ্ছেদ: হায়েজের বিবরণ, বিভিন্ন রঙের রক্ত ও হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন)।
- পৃষ্ঠা: ১১৭–১১৮ (তৃতীয় পরিচ্ছেদ: ইস্তেহাজার বিবরণ, রক্ত ১০ দিন অতিক্রম করলে আদাত বা অভ্যাসের মাধ্যমে হায়েজ ও ইস্তেহাজা পৃথক করার নিয়ম)।
- পৃষ্ঠা: ১২০–১২১ (ইস্তেহাজাওয়ালী নারীর ওজু, নামায ও ইবাদতের শরয়ী বিধান)।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৪৬–৪৭ (পরিচ্ছেদ: হায়েজ, নেফাস ও ইস্তেহাজার সময়সীমা ও আহকাম)।
আল্লাহ তা'আলা আপনার সমস্যার সহজ সমাধান দান করুন। আমীন।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩২৬
- সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩৩
- আল-মাবসূত (সারাখসী), ৩/১৪৯
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী), ১/২৮৩-২৯০
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৬-৪২
- ফাতাওয়া উসমানী, ১/১৪৫-১৫০
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/১০৫-১১০
- বেহেশতী জেওর, মাসিক-ইস্তিহাযা অধ্যায়
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা আয়াত ২২২-এর তাফসীর