শাফেয়ী মাযহাবে মুরতাদ নারীর বিধান
Marriage and Divorce · Shafei
Question
কোনো বিবাহিতা মহিলা যদি তার কোনো কথা বা কাজের জন্য (যে ব্যাপারে সে নিজে নিশ্চিত নয়) আল্লাহ না করুক কোনোভাবে কাফির বা ইসলামচ্যুত হয়ে যান, তাহলে তার ইদ্দত চলাকালীন সময়ের মধ্যে সে যদি তাওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে, তবে কি স্বামীর সাথে তার পূর্বের বিয়ে ঠিক থাকবে? নাকি তাদের আবার নতুন করে বিয়ে বা নিকাহ করতে হবে?দয়া করে কোরআন ও হাদিসের আলোকে শাফেয়ী মাজহাবের বিধানটি বিস্তারিত জানিয়ে উপকৃত করবেন।
Answer
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি এই বিষয়ে যে, কোনো বিবাহিতা মুসলিমা যদি ভুলবশত বা নিশ্চিত না জেনে এমন কথা বলে বা কাজ করে যা কুফরির কারণ হয়ে যায় (যেমন—কোনো কুফরি বাক্য উচ্চারণ, ইসলামের অবমাননা, ইত্যাদি), ফলে সে মুরতাদ হয়ে যায় — অতঃপর ইদ্দতের ভেতরে তাওবা করে ইসলামে ফিরে আসে — তাহলে কি তার পূর্বের বিবাহ বহাল থাকবে, নাকি নতুন করে নিকাহ করতে হবে?
প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি
শাফেয়ী মাযহাবের মূলনীতি হলো: মুরতাদ হওয়ার কারণে স্ত্রী-স্বামীর মধ্যকার বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যায় (ফাসখ হয়ে যায়) — এটি তালাক নয়, বরং দ্বীনের পার্থক্যের কারণে বিবাহ বাতিল হয়ে যায়।
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ
"আর তোমরা কাফির নারীদের বিবাহ-বন্ধন ধরে রাখো না।"
— (সূরা আল-মুমতাহিনা: ১০)
শাফেয়ী মাযহাবের বিস্তারিত বিধান
১. মুরতাদ হলে বিবাহ ভেঙে যায়
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো মুসলিম পুরুষ বা নারী মুরতাদ হয়ে যায়, তাহলে তার বিবাহ বাতিল হয়ে যায়।"
— (আল-উম্ম, কিতাবুন নিকাহ)
ইমাম নববী (রহ.) আল-মাজমু' গ্রন্থে বলেন:
"আমাদের (শাফেয়ী) মাযহাবের সুস্পষ্ট মত হলো—মুরতাদ হওয়ার সাথে সাথেই বিবাহ বাতিল হয়ে যায়, এটি ফাসখ, তালাক নয়।"
— (আল-মাজমু' শরহুল মুহাযযাব, খণ্ড ১৬)
২. ইদ্দতের বিধান
মুরতাদ নারীর জন্য ইদ্দত হলো এক হায়য (অথবা গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত)। এটিই শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"মুরতাদ নারীর ইদ্দত এক হায়য।"
— (আল-মাজমু', খণ্ড ১৮)
৩. ইদ্দতের ভেতরে ইসলামে ফিরে আসলে কী হবে?
এখানেই মূল প্রশ্নের উত্তর। শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত হলো:
যদি মুরতাদ ব্যক্তি ইদ্দতের ভেতরে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে পূর্বের বিবাহ বহাল থাকবে — নতুন নিকাহর প্রয়োজন নেই।
দলিল:
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَقَدْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَهُمْ إِنْ آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ
— (সূরা আন-নিসা: ২১)
আরও ইরশাদ:
فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَاتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ ۖ لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ
"অতঃপর যদি তোমরা তাদেরকে মুমিনা জানতে পার, তাহলে তাদেরকে কাফিরদের কাছে ফিরিয়ে দিও না। তারা (মুমিনা নারীরা) কাফিরদের জন্য হালাল নয় এবং কাফিররাও তাদের জন্য হালাল নয়।"
— (সূরা আল-মুমতাহিনা: ১০)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"যদি মুরতাদ ব্যক্তি ইদ্দতের ভেতরে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তার পূর্বের বিবাহ বহাল থাকবে। কারণ ইদ্দতের ভেতরে সে ইসলাম গ্রহণ করলে বিবাহের বন্ধন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।"
— (আল-মাজমু', খণ্ড ১৬)
ইবন হাজার আল-হায়তামী (রহ.) তুহফাতুল মুহতাজ গ্রন্থে বলেন:
"যদি মুরতাদ নারী ইদ্দতের ভেতরে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে তার বিবাহ বহাল থাকবে, নতুন নিকাহর প্রয়োজন নেই।"
— (তুহফাতুল মুহতাজ, কিতাবুন নিকাহ)
ইমাম রমলী (রহ.) নিহায়াতুল মুহতাজ গ্রন্থে একই মত সমর্থন করেছেন।
৪. ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে কী হবে?
যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায় এবং এরপর সে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে পূর্বের বিবাহ আর বহাল থাকবে না। তখন নতুন করে নিকাহ করতে হবে — নতুন মোহর, নতুন ইজাব-কবুল, নতুন সাক্ষী সহ।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"যদি ইদ্দত শেষ হয়ে যায়, তারপর সে ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে পূর্বের বিবাহ বাতিল হয়ে গেছে। তখন নতুন নিকাহ ছাড়া একত্রে থাকা জায়েয হবে না।"
— (আল-মাজমু', খণ্ড ১৬)
সারসংক্ষেপ সিদ্ধান্ত
| অবস্থা | বিধান | |--------|-------| | মুরতাদ হওয়ার সাথে সাথে | বিবাহ ফাসখ হয়ে যায় (বাতিল) | | ইদ্দতের ভেতরে ইসলামে ফিরলে | পূর্বের বিবাহ বহাল থাকবে, নতুন নিকাহ লাগবে না | | ইদ্দত শেষ হওয়ার পর ইসলামে ফিরলে | পূর্বের বিবাহ বাতিল, নতুন নিকাহ করতে হবে |
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. তাকফিরের বিষয়ে সতর্কতা: কোনো মুসলিমকে কাফির বলা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। হাদিসে এসেছে:
وَمَنْ قَالَ لِأَخِيهِ يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
"যে ব্যক্তি তার ভাইকে 'হে কাফির' বলে, সেই কুফরির (দোষ) তাদের একজনকে ঘিরে ধরে।"
— (সহিহ বুখারী: ৬১০৪, সহিহ মুসলিম: ৬০)
২. ভুলবশত কুফরি বাক্য উচ্চারণ: যদি কেউ ভুলবশত, না জেনে, বা জোরপূর্বক কুফরি বাক্য বলে, তবে শাফেয়ী মাযহাবের বিধান হলো—তাকে কাফির বলা যাবে না, যদি না সে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং জেনে-বুঝে তা করে।
৩. বাস্তব ক্ষেত্রে: এ ধরনের সূক্ষ্ম মাসআলায় সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য শাফেয়ী মুফতির সাথে পরামর্শ করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
আরবি মূল ইবারত (তুহফাতুল মুহতাজ)
وَلَوْ ارْتَدَّتْ ثُمَّ أَسْلَمَتْ فِي الْعِدَّةِ بَقِيَ النِّكَاحُ، وَإِنْ أَسْلَمَتْ بَعْدَ انْقِضَاءِ الْعِدَّةِ لَمْ يَبْقَ النِّكَاحُ وَاحْتَاجَتْ إِلَى نِكَاحٍ جَدِيدٍ
"যদি সে মুরতাদ হয়, অতঃপর ইদ্দতের ভেতরে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে বিবাহ বহাল থাকবে। আর যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে বিবাহ বহাল থাকবে না এবং নতুন নিকাহর প্রয়োজন হবে।"
— (তুহফাতুল মুহতাজ, কিতাবুন নিকাহ)
والله أعلم بالصواب