তালাক
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
পারস্পরিক সম্মতিতে খোলা তালাক সংক্রান্ত হলফনামায় একদম শেষে বলা হয়েছে তে স্ত্রী স্বীকারোক্তি দিয়েছে এখন থেকে সে স্বামীর এখন আর কোনো বৈধ স্ত্রী নয় এবং এখন থেকে তারা উভয়ে পরপুরুষ ও পরনারী একে অপরের জন্য। যদিও সত্যিকারার্থে এরকম হলফনামা দেওয়া হয়েছে যেন সাবেক স্ত্রী ভবিষ্যতে কোনো মামলা না করেন, প্রকৃতপক্ষে কোনো জবানবন্দি স্ত্রীর নেওয়াই হয়নি, প্রতিটি অভিযোগ বা বক্তব্য যা স্ত্রীর পক্ষে লেখা তা সব মিথ্যা। এখন সমগ্র দেনাপাওনা পরিশোধ শেষে যদি স্বামী স্বাক্ষর করেন এবং স্ত্রীকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো ও টিপসই দেওয়ানো হয় তাহলে কি তালাক সংঘটিত হয়ে যাবে? উল্লেখ্য যে, স্বামী কিন্তু মুখে তিন তালাক দেয়নি, শুধু ঐ হলফনামায় স্বাক্ষর করেছে আর এই ব্যাপারে স্ত্রীর সাথে কোনো খোলা আলোচনাতেও একান্তে বসেনি কোনোদিন। স্ত্রীর দোষ দিয়েছে যে স্ত্রী পরকীয়া করে যার কোনো প্রমাণাদি বা রেকর্ড কারোর কাছেই নেই, আরো অন্যান্য অহেতুক বিষয়ে দোষ ধরেছে। স্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করেছে সংসার টেকানোর।
আর এরকম জোরপূর্বক সংসার আর স্বামী থেকে যারা বিচ্ছিন্ন করেছে তাদের প্রতি কীরূপ বদদুআ/প্রতিশোধের দুআ করা জায়েয হবে? যেহেতু মেয়েটির ইজ্জত শেষ করে দিয়েছে আর সবকিছু বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া জোরপূর্বক হয়েছে?
**স্বামী তালাকের নিয়তেই স্বাক্ষর করেছে
**মূলত স্ত্রীকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো ও টিপসই দেওয়ানো হয়েছে
**হলফনামাটি স্বামীর পরিবার থেকে পাঠিয়েছিলো আর স্বামী অতিদ্রুত স্বাক্ষর করেছে কারণ সে এই তালাকে সম্মত ছিলো তবে স্ত্রী সম্মত ছিলো না
**সুস্পষ্ট তিন তালাক উচ্চারণ করেনি স্বামী, শুধু তালাকের নিয়তেই স্বাক্ষর করেছে, বা সংসার করতে চায়না বা স্ত্রী হিসেবে রাখবেনা বলেই স্বাক্ষর করেছে। এবং স্ত্রীকে সম্পূর্ণ কাবিনের টাকা ফেরত দিয়ে দিয়েছে।
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
উত্তর:
১. উক্ত পরিস্থিতিতে তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না?
উত্তর: হ্যাঁ, আপনার বর্ণিত সুরতে শরীয়তের দৃষ্টিতে ‘১ তালাকে বায়েন’ (এক তালাকে বায়েন) সংঘটিত হয়ে গেছে।
এর বিস্তারিত শরয়ী কারণসমূহ নিম্নরূপ:
১. তালাকের অধিকার স্বামীর: ইসলামি শরীয়তে তালাক প্রদান বা বিবাহবিচ্ছেদের মূল অধিকার ও ক্ষমতা স্বামীর হাতে ন্যস্ত। ২. লিখিত তালাক ও স্বামীর নিয়ত: স্বামী যদি মুখে উচ্চারণ না-ও করে, কিন্তু তালাক দেওয়ার নিয়তে লিখিত তালাকনামা বা খোলা তালাকের হলফনামায় নিজ ইচ্ছায় স্বাক্ষর করে, তবে ফিকহের বিধান অনুযায়ী লিখিতভাবে তালাক কার্যকর হয়ে যায়। এখানে স্বামী যেহেতু তালাক ও বিচ্ছেদের পূর্ণ নিয়তেই হলফনামায় স্বাক্ষর করেছে, তাই লিখিত তালাকের দ্বারা তালাক পতিত হয়ে গেছে। ৩. স্ত্রীকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানোর প্রভাব: তালাক পতিত হওয়ার জন্য স্ত্রীর সম্মতি, জবানবন্দি বা স্বাক্ষর থাকা শর্ত নয়। স্ত্রীকে যদি জোরপূর্বক স্বাক্ষর বা টিপসই দেওয়ানো হয়ে থাকে, তবে তার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না; কারণ স্বামী নিজ ইচ্ছায় ও তালাকের নিয়তে স্বাক্ষর করায় তালাক কার্যকর হয়ে গেছে। ৪. তালাকের প্রকার: যেহেতু স্বামী লিখিত হলফনামায় বিচ্ছেদের নিয়তে সই করেছে এবং কাবিনের টাকা পরিশোধ করেছে, কিন্তু মুখে তিন তালাক উচ্চারণ করেনি, সেহেতু এর দ্বারা ‘১ তালাকে বায়েন’ পতিত হয়েছে।
ফলাফল: ১ তালাকে বায়েন পতিত হওয়ার সাথে সাথেই আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং আপনারা একে অপরের জন্য পরপুরুষ ও পরনারী হয়ে গেছেন।
২. জোরপূর্বক বিচ্ছেদকারী ও অন্যায়কারীদের প্রতি বদদুআ করার শরয়ী বিধান:
উত্তর: আপনার ওপর যে অন্যায়, জোরপূর্বক বিচ্ছেদ এবং সতীর চারের ওপর মিথ্যা অপবাদ (পরকীয়া) আরোপ করা হয়েছে, তা শরীয়তের দৃষ্টিতে চরম জুলুম, কবিরা গোনাহ ও জঘন্য অপরাধ।
এক্ষেত্রে শরয়ী বিধান হলো:
১. বদদুআ করার বৈধতা: কোনো ব্যক্তি যদি অন্যায়ভাবে কারো সংসার ভেঙে দেয়, ইজ্জত নষ্ট করে কিংবা মিথ্যা অপবাদ দেয়, তবে উক্ত মাজলুম (নির্যাতিত) ব্যক্তির জন্য জালেমের (অত্যাচারীর) বিরুদ্ধে তার ওপর হওয়া জুলুমের সমপরিমাণ বদদুআ করা বা আল্লাহর দরবারে বিচার চাওয়া সম্পূর্ণ জায়েয ও বৈধ। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, "মাজলুমের দুআ/বদদুআ থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।" ২. উত্তম পন্থা: যদিও জালেমের বিরুদ্ধে বদদুআ করা জায়েয, তথাপি বিষয়টিকে পুরোপুরি আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে দেওয়া (তাফবীয) এবং আখেরাতের মহাবিচারের জন্য ছেড়ে দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অধিক উত্তম ও সওয়াবের কাজ। আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখেরাতে জালেমের বিচার অবশ্যই করবেন এবং আপনার ধৈর্য ও সহনশীলতার উত্তম প্রতিদান দান করবেন।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৪–২৬৫ (তালাকের অধিকার কার ও কেন?)।
- পৃষ্ঠা: ২৬৭–২৬৮ (পোস্টকার্ড ও লিখিত মাধ্যমে তালাকের বিধান এবং জোরপূর্বক তালাক)।
- পৃষ্ঠা: ২৬৯ (তালাকে বায়েন ও খোলা তালাকের বিবরণ)।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৮৪ / ৩১০ (ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ: লিখিত তালাকের বিবরণ — মারসুমা ও গাইরে মারসুমা কিতাবাত)।
- পৃষ্ঠা: ৩০৫ / ৩৩৭ (তাফবীযে তালাক ও খোলা সংক্রান্ত বিচ্ছেদের ফাতাওয়া)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১০২–১০৩ (বিনা প্রমানে কারোর ওপর মিথ্যা অপবাদ বা কজফ আরোপের শাস্তি ও কবিরা গোনাহ)।
- পৃষ্ঠা: ১৩২–১৩৩ (বাবুত তা'যীর ও ইনতেকাম — জালেমের বিরুদ্ধে সমপরিমাণ বদদুআ করার হুকুম ও ক্ষমার ফযীলত)।
৪. দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৫৯–৩৬১ (অন্যকে কষ্ট দেওয়া, হ্যাক করা বা সম্মানহানি করার কঠোর নিষেধাজ্ঞা)।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।