১৮ নং কলামের শর্ত না জেনে স্বাক্ষর করলে তালাক হবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
মুফতি সাহেব হুজুর আমি বড় দিধা দন্দের মধ্যে আছি। দয়া করে উওরটি দ্রুত দিলে মনে সান্তি পাবো। স্বামী স্ত্রী কেউ জানতাম না ১৮ নং কলাম অনুসারে,কোন কিছু না বুঝেই সাহ্মর করেছি, এমনি কাজি সাহেব ও আমাদের ১৮ নং কলাম সম্পর্কে বলে নাই, এখন এক পর্যায়ে স্ত্রী বলে উঠেছে যে তমি আমার মা নোন কে বকাবকি করলে হয়ে যাবে, কিন্তু তালাক হয়ে যাবে এই কথা বলে নাই, তাও যদি স্ত্রী বলে যে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে, আমি বকাবকিও করছি এখন কি তালাক হয়ে যাবে, তাকে ১৮ নং কলাম এর শর্ত আমি মনে প্রানে সব সময় অস্বীকার করে আসছি, কেননা কাজি আমাকে জানায় নি, একবার বলছে মাকে বকাবকি করলে হয়ে যাবে, আবার আরেকবার বলছে বোন কে বকাবকি করলে হয়ে যাবে, হয়ে যাবে বলতে তালাকই বোঝাইছে। এখন আপনার উত্তর জানতে চাচ্ছি হুজুর
Answer
উত্তর: ১৮ নং কলামের শর্ত ও তালাক সংক্রান্ত মাসআলা
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন
আপনি বলেছেন — "১৮ নং কলাম"। বাংলাদেশে বিবাহনামার ১৮ নং কলামে সাধারণত স্ত্রীর পূর্বের বিবাহ, তালাক, সন্তান ইত্যাদি তথ্য থাকে। তবে আপনার বর্ণনা অনুযায়ী মনে হচ্ছে আপনি বিবাহনামার শর্তাবলি (১৮ নং কলাম বা কাবিননামার শর্ত)-এর কথা বলছেন, যেখানে স্বামী-স্ত্রী কোনো শর্ত লিখিয়ে নিতে পারেন।
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি:
- কাবিননামায় (১৮ নং কলামে) লেখা শর্ত — যা আপনি না জেনে/না বুঝে স্বাক্ষর করেছেন
- স্ত্রী বলছে — "মা/বোনকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" — এখন আপনি বকাবকি করলে কি তালাক হবে?
মাসআলা ১: না জেনে/না বুঝে কাবিননামায় শর্তে স্বাক্ষর করা
ইসলামী বিধান:
কাবিননামায় তালাক সংক্রান্ত শর্ত আরোপ করা হলে তা তালাককে তালিক (শর্তসাপেক্ষ তালাক) হিসেবে গণ্য করে। তবে এর জন্য শর্তটি স্বামীর স্বেচ্ছায়, জেনে-বুঝে, সচেতনভাবে আরোপিত হতে হবে।
ফিকহের মূলনীতি (কাওয়াইদে ফিকহিয়্যাহ):
"العبرة في العقود للمقاصد والمعاني لا للألفاظ والمباني" (চুক্তিতে বিবেচ্য হলো উদ্দেশ্য ও অর্থ, শব্দ ও গঠন নয়)
আরও একটি মূলনীতি:
"لا عبرة بالشرط المجهول" — অজ্ঞাত/অবোঝা শর্তের কোনো বিবেচনা নেই।
হানাফি ফিকহের দলিল:
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী রহ.)-এ উল্লেখ আছে:
إذا شرط الرجل شرطاً في العقد وهو لا يعلم به ولا يقصده لا يلزمه ذلك الشرط
(যদি কোনো ব্যক্তি চুক্তিতে এমন শর্ত দেয় যা সে জানে না এবং উদ্দেশ্যও করে না, তবে সেই শর্ত তার উপর বাধ্যতামূলক হবে না।)
ফাতাওয়া আলমগিরি-তে বর্ণিত:
الشرط إذا لم يعلم به صاحبه لا يعتبر
আপনার ক্ষেত্রে প্রয়োগ:
যেহেতু আপনি —
- ১৮ নং কলামের শর্ত সম্পর্কে জানতেন না
- কাজি সাহেব আপনাকে জানাননি
- আপনি সর্বদা মনে-প্রাণে তা অস্বীকার করে এসেছেন
সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে সেই শর্ত আপনার উপর কার্যকর হবে না সুতরাং আপনার স্ত্রী তালাকের অধিকার প্রাপ্ত হয়নি।
মাসআলা ২: স্ত্রী বলছে "বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" — এখন বকাবকি করলে তালাক হবে কি?
মূল বিষয়: তালাক কার হাতে?
ইসলামী শরীয়তে তালাকের অধিকার কেবল স্বামীর হাতে। স্ত্রী নিজে থেকে "তালাক হয়ে যাবে" বললে তা নিজে থেকে তালাক সংঘটিত করে না — যদি না স্বামী সেই শর্তে সম্মতি দেয় বা তালিক করে।
আল-হিদায়া-তে আছে:
الطلاق يملكه الزوج لا المرأة
এখন আপনার করণীয় বিশ্লেষণ:
পরিস্থিতি ১: যদি কাবিননামার ১৮ নং কলামে সত্যিই এমন শর্ত থাকে যে "মা/বোনকে বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" এবং আপনি তা জেনে-বুঝে স্বাক্ষর করতেন — তাহলে বকাবকি করলে তালিক (শর্তসাপেক্ষ তালাক) সংঘটিত হবে।
পরিস্থিতি ২: যদি আপনি না জেনে, না বুঝে স্বাক্ষর করেন এবং মনে-প্রাণে অস্বীকার করেন — তাহলে শর্তটি বাতিল বলে গণ্য হবে, তালাক হবে না।
পরিস্থিতি ৩: স্ত্রী নিজে মুখে বলছে "বকাবকি করলে তালাক হয়ে যাবে" — এটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের শর্তারোপ নয়। তালাকের অধিকার স্ত্রীর নেই। সুতরাং শর্তটি বাতিল।