মোহর পরিশোধ না করলে বিবাহ বৈধ থাকে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5498
Questioner: Rokaiya Khatun 0241
Question Asked: 15 Sep 2026, 08:01 AM
Reviewed & Published: 15 Sep 2026, 08:17 AM
Views: 9
Tokens: 7,516
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।। আমার বিয়ে হয়েছে ২০২০ এ।। এখন আমার দুইটা বেবিও আছে। আমি জানতে চাচ্ছি যে আমার বিয়ের মোহরনা ধরা হয়েছিল ২ লক্ষ টাকা।। কিন্তু আমার স্বামী এক টাকাও পরিশোধ করেছি।। তবে বিয়ের কাগজে উল্লেখ করা হয়ে ৮০ হাজার টাকা উসুল।। আমাদের বাড়িতে মেয়েকে নাকফুল ছেলের বাড়ি থেকে দেওয়া হয়। তাই তারা আমাকে একটা ডায়মন্ড এর নাকফুল দিয়েছিল কিন্তু তখন তার দাম ছিল ৬৬০০ টাকা।। আর শাড়ি আর একটা মালার সেট মিলিয়ে ৪/৫ হাজার টাকা হবে।। এছাড়া বিয়ের সময় আর কিছু দেয় নি।।যা আমার মোহরের অংশ না। কিন্তু এটা তারা উসুল হিসেবেই ধরে সবসময়।। আমার স্বামী তো আমার কোন মোহর পরিশোধ করে নি আর তার সামর্থ্যও নাই এত টাকা পরিশোধ করার কিন্তু আমি যদি এখন মারা যাই তাহলেও হয়তো সে কোনদিন এত টাকা দিতে পারবে কিনা আমি জানি না তবে যদি না দেয় তাহলে আমাদের বিয়ে কি বৈধ্য হবে?? আমি কি হাশরের দিনে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পাবো?? আমার বাচ্চারা কি তার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে? আর মোহর আদায়ের ক্ষেত্রে আমি কি করতে পারি??

Answer

মোহর আদায়ের বিধান ও সংশ্লিষ্ট মাসায়েল

উত্তর (সংক্ষেপে): প্রশ্নের বিবরন মতে আপনার মোহরানা আদায় হয়নি। এক্ষেত্রে স্বামী যদি ডায়মন্ড এর নাকফুল আর মালাকে মোহরানা হিসেবেই আপনাকে প্রদান করে থাকে,আর বিষয়টি যদি আপনাকে জানিয়েও থাকে,সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকার মতো উসুল ধরা যাবে।

তাই এই হিসাব লক্ষ করলেও আপনি এখনো তার থেকে ১ লক্ষ ৯৩ হাজার টাকা পাওয়ার হকদার।

আপনার স্বামী যদি মোহরানা না দেয়, তাহলেও আপনাদের বিয়ে বৈধ্য থাকবে।

আপনি হাশরের দিনে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় পাবেন। আপনার বাচ্চারা তার সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। আর মোহর আদায়ের ক্ষেত্রে আপনি পারিবারিক পর্যায়ক্রমে এলাকার মুরব্বিদের সহায়তা নিতে পারেন,প্রয়োজনে আইনের সহায়তাও নিতে পারেন।

আপনার বিবাহ সহীহ হয়েছে এবং বহাল আছে। মোহর পরিশোধ না করা বিবাহকে বাতিল করে না; বরং মোহর স্ত্রীর ঋণ হিসেবে স্বামীর যিম্মায় বহাল থাকে। হাশরের দিন আপনি তার স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত হবেন এবং আপনার সন্তানরা তার সন্তান হিসেবেই স্বীকৃত হবে—ইনশাআল্লাহ। তবে মোহর আদায়ের জন্য আপনি শরীয়তসম্মত উপায়ে দাবি করতে পারেন এবং প্রয়োজনে আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন।


বিস্তারিত আলোচনা

১. মোহর কী এবং এর বিধান কী?

মোহর হলো বিবাহের একটি অপরিহার্য অংশ, যা স্বামীর উপর স্ত্রীর হক হিসেবে ওয়াজিব হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً "আর তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও।" (সূরা আন-নিসা: ৪)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যে নারী মোহর ছাড়া বা সাক্ষী ছাড়া বিবাহ করল, তার বিবাহ বাতিল।" (তিরমিযী, হাদীস নং ১১০৪ — ইমাম তিরমিযী হাসান বলেছেন)

তবে মোহর পরিশোধ না করলে বিবাহ বাতিল হয় না। মোহর স্ত্রীর পাওনা হিসেবে স্বামীর যিম্মায় থাকে, যা সে পরিশোধ করতে বাধ্য।

২. আপনার বিবাহের হুকুম

আপনার বিবাহ সহীহ ও বহাল। কারণ—

  • বিবাহের সময় মোহর নির্ধারিত হয়েছে (২ লক্ষ টাকা)।
  • পাত্র-পাত্রীর সম্মতি ও সাক্ষীসহ আকদ সম্পন্ন হয়েছে।
  • মোহর পরিশোধ না করা বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।

রাদ্দুল মুহতার-এ আছে:

"মোহর পরিশোধ না করা বিবাহ বাতিলের কারণ নয়; বরং তা স্ত্রীর ঋণ হিসেবে স্বামীর যিম্মায় থাকে।" (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুন নিকাহ, ৩/১০১)

৩. বিয়ের কাগজে ৮০ হাজার টাকা উল্লেখের বিষয়

বিয়ের কাগজে যদি ৮০ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ২ লক্ষ টাকা ধার্য করা হয়েছিল—তাহলে প্রকৃত মোহর ২ লক্ষ টাকাই ধর্তব্য, যদি তা সাক্ষী বা প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। কাগজে কম লেখা হলে তা মোহর কমিয়ে দেয় না, যদি উভয় পক্ষ প্রকৃত মোহরে সম্মত ছিল।

তবে যদি উভয় পক্ষ সম্মত হয়ে কাগজে ৮০ হাজার টাকা লিখে থাকে এবং সেটাই চূড়ান্ত মোহর হিসেবে ধার্য করা হয়, তাহলে ৮০ হাজার টাকাই মোহর হবে। এ ক্ষেত্রে আপনাকে সাক্ষী বা প্রমাণের মাধ্যমে ২ লক্ষ টাকা প্রমাণ করতে হবে।

ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে আছে:

"মোহরের পরিমাণ নির্ধারণে প্রকৃত সম্মতিই মূল; কাগজে কম লেখা হলে তা প্রকৃত মোহরকে পরিবর্তন করে না, যদি প্রকৃত মোহর প্রমাণিত হয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৩৫)

৪. নাকফুল, শাড়ি ও মালার সেট কি মোহরের অন্তর্ভুক্ত?

না, এগুলো মোহরের অন্তর্ভুক্ত নয়—যদি না বিবাহের সময় স্পষ্টভাবে বলা হয় যে এগুলো মোহরের অংশ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণত এগুলো হাদিয়া (উপহার) হিসেবে গণ্য হয়, যা মোহরের সাথে সমন্বয় করা যায় না।

ফাতাওয়া উসমানী-তে আছে:

"বিবাহের সময় পাত্রপক্ষ থেকে পাত্রীকে দেওয়া উপহার মোহরের অন্তর্ভুক্ত নয়, যদি না মোহরের অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২২১)

তাই তারা যদি বলে "এগুলো উসুল হিসেবে ধরা হবে"—এটি শরীয়তসম্মত নয়। মোহর পরিশোধের জন্য নগদ টাকা বা সম্পত্তি দিতে হবে, উপহার দিয়ে মোহর পরিশোধ হয় না।

৫. মোহর পরিশোধ না করলে হাশরের দিনের অবস্থা

আপনি হাশরের দিন তার স্ত্রী হিসেবেই পরিচিত হবেন—ইনশাআল্লাহ। কারণ—

  • বিবাহ সহীহ হয়েছে।
  • মোহর পরিশোধ না করা বিবাহের সম্পর্ক ছিন্ন করে না।
  • মোহর হলো স্বামীর যিম্মায় একটি ঋণ, যা সে পরিশোধ করতে বাধ্য; কিন্তু তা না করলে বিবাহ বাতিল হয় না।

মা'আরিফুল কুরআন-এ আছে:

"মোহর স্ত্রীর হক; তা আদায় না করা স্বামীর গুনাহ, কিন্তু তা বিবাহের বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।" (মা'আরিফুল কুরআন, ২/৩৪১)

৬. সন্তানদের স্বীকৃতি

আপনার সন্তানরা তার সন্তান হিসেবেই স্বীকৃত হবে—ইনশাআল্লাহ। কারণ—

  • তারা বৈধ বিবাহের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে।
  • মোহর পরিশোধ না করা সন্তানদের পিতৃত্বকে প্রভাবিত করে না।

আল-হিদায়া-তে আছে:

"বৈধ বিবাহের মাধ্যমে জন্মগ্রহণকারী সন্তান পিতার সন্তান হিসেবে স্বীকৃত হবে, যদিও মোহর পরিশোধ না করা হয়।" (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ, ১/২৩১)

৭. মোহর আদায়ের জন্য আপনি কী করতে পারেন?

১. সরাসরি দাবি করুন: স্বামীকে ভদ্রভাবে ও শরীয়তসম্মতভাবে মোহর পরিশোধের জন্য বলুন।

২. লিখিত দাবি: যদি মৌখিক দাবি কাজ না করে, লিখিতভাবে দাবি করুন।

৩. পরিবারের মাধ্যমে মধ্যস্থতা: উভয় পরিবারের সম্মানিত লোকদের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করুন।

৪. আদালতের আশ্রয়: প্রয়োজনে শরীয়ত আদালত বা পারিবারিক আদালতে মোহর আদায়ের মামলা করতে পারেন। ইসলামী শরীয়তে স্ত্রীর মোহর আদায়ের অধিকার রয়েছে।

৫. ধৈর্য ও দুআ: স্বামী যদি প্রকৃতই অসচ্ছল হয়, তাহলে তাকে সময় দিন এবং আল্লাহর কাছে দুআ করুন। আল্লাহ বলেন:

وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ "যদি সে অসচ্ছল হয়, তাহলে তাকে সচ্ছলতা পর্যন্ত সময় দাও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮০)

৮. স্বামী যদি মারা যায় বা মোহর না দিয়ে মারা যায়?

যদি স্বামী মোহর পরিশোধ না করে মারা যায়, তাহলে তার সম্পত্তি থেকে মোহর আদায় করা হবে—অন্যান্য ঋণের মতো। মোহর হলো স্ত্রীর ঋণ, যা মৃতের সম্পত্তি থেকে প্রথমে পরিশোধ করতে হবে।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"মোহর স্ত্রীর ঋণ; স্বামীর মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি থেকে তা পরিশোধ করা ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৪৫)

৯. বিশেষ পরামর্শ

  • আপনার বিবাহ বৈধ, এটি নিয়ে সন্দেহ করবেন না।
  • মোহর আদায়ের দাবি আপনার হক—এটি শরীয়তসম্মত।
  • উপহার (নাকফুল, শাড়ি) মোহরের অংশ নয়—এটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিন।
  • স্বামী অসচ্ছল হলে তাকে সময় দিন, কিন্তু দাবি ছাড়বেন না।
  • সন্তানদের পিতৃত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
  • হাশরের দিন আপনি তার স্ত্রী হিসেবেই থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |------|-------| | বিবাহের বৈধতা | সহীহ ও বহাল | | মোহর | ২ লক্ষ টাকা (প্রমাণিত হলে) | | কাগজে ৮০ হাজার | প্রকৃত মোহর প্রমাণিত হলে ২ লক্ষ টাকাই ধর্তব্য | | নাকফুল/শাড়ি | মোহরের অংশ নয়, উপহার | | মোহর পরিশোধ না করা | বিবাহ বাতিল করে না | | হাশরের দিন | স্ত্রী হিসেবে পরিচিত হবেন | | সন্তানদের স্বীকৃতি | পিতার সন্তান হিসেবে স্বীকৃত | | মোহর আদায়ের উপায় | দাবি, মধ্যস্থতা, আদালত |


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.