বিবাহের কথাবার্তার সময় ছেলের ছবি দেখা যাবে কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিবাহের কথাবার্তার সময় পূর্ণ বায়োডাটা না দেখে ছেলের ছবি দেখা যাবে কি?
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বিবাহের প্রস্তাবের কথাবার্তা চলাকালীন সময়ে পূর্ণ বায়োডাটা না দেখে শুধু পাত্রের ছবি দেখা শরীয়তসম্মত হবে কি না?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
শরীয়তের দৃষ্টিতে বিবাহের প্রস্তাব চলাকালীন পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখা জায়েয। তবে শর্ত হলো—বিবাহের প্রকৃত ইচ্ছা থাকতে হবে, শুধু কৌতূহল বা মজা করার উদ্দেশ্যে নয়। আর ছবি দেখার ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো—জীবন্ত মানুষকে সরাসরি দেখা ও ছবি দেখা এক নয়। ছবি দেখার দ্বারা সরাসরি দেখার যে উদ্দেশ্য (চেহারা, গঠন, সৌন্দর্য সম্পর্কে ধারণা লাভ) তা পূর্ণভাবে হাসিল হয় না; বরং ছবি দেখায় নানা ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই প্রয়োজনে সরাসরি দেখা উচিত, ছবি দেখার উপর নির্ভর করা উচিত নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. বিবাহের প্রস্তাবকালে পাত্র-পাত্রীকে দেখা প্রসঙ্গে শরীয়তের বিধান
ইসলামে বিবাহের প্রস্তাব চলাকালীন পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখা বৈধ। এ বিষয়ে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
হাদীস ১: হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ الْمَرْأَةَ فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ» অর্থ: "তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তার দিকে এমনভাবে দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে, তবে সে যেন তা করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৮৪৫৭; সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৮৭—ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)
হাদীস ২: হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি এক নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বললেন—
«انْظُرْ إِلَيْهَا فَإِنَّهُ أَحْرَى أَنْ يُؤْدَمَ بَيْنَكُمَا» অর্থ: "তুমি তার দিকে দেখে নাও, কারণ এতে তোমাদের উভয়ের মধ্যে প্রেম-প্রীতি স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।" (সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৮৬; সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩২৩৫; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৮৬৬)
হাদীস ৩: হযরত জাবির (রাঃ) বর্ণনা করেন—
«قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ الْمَرْأَةَ فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ» অর্থ: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তার দিকে এমনভাবে দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে, তবে সে যেন তা করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২)
২. হানাফী মাযহাবের ফকীহগণের অভিমত
ইমাম কাসানী (রহঃ) «بدائع الصنائع» গ্রন্থে বলেন—
"বিবাহের প্রস্তাবকারীর জন্য প্রস্তাবিত নারীর চেহারা ও হাতের তালু দেখা জায়েয; কারণ এতেই সৌন্দর্য ও গঠন সম্পর্কে ধারণা লাভ হয়।" (বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ২, পৃ. ২৫৩)
ইবনে আবিদীন শামী (রহঃ) «রাদ্দুল মুহতার» গ্রন্থে উল্লেখ করেন—
«وَلِلْخَاطِبِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى وَجْهِ الْمَخْطُوبَةِ وَكَفَّيْهَا» অর্থ: "বিবাহের প্রস্তাবকারীর জন্য প্রস্তাবিত নারীর চেহারা ও উভয় হাতের তালু দেখা জায়েয।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭—কিতাবুন নিকাহ)
ফতোয়ায়ে আলমগীরী-তে আছে—
«وَيَنْظُرُ الْخَاطِبُ إِلَى وَجْهِ الْمَخْطُوبَةِ وَكَفَّيْهَا» অর্থ: "প্রস্তাবকারী প্রস্তাবিত নারীর চেহারা ও হাতের তালু দেখতে পারবে।" (ফতোয়ায়ে আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ২৮৩)
আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) «বেহেশতী জেওর»-এ লেখেন—
"বিবাহের প্রস্তাব দেওয়ার সময় পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখতে পারে। তবে অবশ্যই বিবাহের ইচ্ছা থাকতে হবে, শুধু দেখার জন্য দেখা যাবে না।" (বেহেশতী জেওর, বিবাহ অধ্যায়)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহঃ) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা নূরের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন—
"বিবাহের প্রস্তাবকালে পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা ইসলামে অনুমোদিত, কারণ এটি বিবাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক।"
মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) «ফতোয়ায়ে উসমানী»-তে উল্লেখ করেন—
"বিবাহের প্রস্তাবের সময় পাত্র-পাত্রীর পরস্পরকে দেখা জায়েয। তবে এতে শর্ত হলো—বিবাহের প্রকৃত ইচ্ছা থাকা, নির্জনতা (খালওয়া) না হওয়া এবং কামনা-বাসনার সাথে না হওয়া।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩২১)
৩. ছবি দেখার বিধান
শরীয়তের দৃষ্টিতে জীবন্ত মানুষের ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শন সম্পর্কে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে:
হাদীস: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—
«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ» অর্থ: "কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৫০; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১০৯)
হাদীস: হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—
«إِنَّ أَصْحَابَ هَذِهِ الصُّوَرِ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ» অর্থ: "এই ছবিগুলোর নির্মাতাদের কিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে।" (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১০৭)
তবে প্রয়োজনে (যেমন—পাসপোর্ট, পরিচয়পত্র) ছবি তোলার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে ছবি আদান-প্রদান বা প্রদর্শন শরীয়তসম্মত নয়।
৪. ছবি দেখে পাত্রী নির্বাচন করা কি যথেষ্ট?
ছবি দেখার দ্বারা সরাসরি দেখার উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। কারণ:
- ছবিতে চেহারার প্রকৃত সৌন্দর্য, উচ্চতা, গঠন, স্বভাব-চরিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় না।
- ছবি এডিট বা ফিল্টার করা থাকতে পারে, যা বাস্তবতার সাথে মেলে না।
- ছবি আদান-প্রদানে নানা ফিতনা ও অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে।
- শরীয়তের দৃষ্টিতে ছবি দেখা ও সরাসরি দেখা এক নয়; সরাসরি দেখার বিধান হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।
ইবনে আবিদীন শামী (রহঃ) বলেন—
"বিবাহের প্রস্তাবকারীর জন্য প্রস্তাবিত নারীর সরাসরি চেহারা ও হাতের তালু দেখা জায়েয। ছবি দেখার দ্বারা এই বিধান প্রযোজ্য হয় না।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭)
মুফতি তাকী উসমানী (দাঃবাঃ) «ফতোয়ায়ে উসমানী»-তে বলেন—
"ছবি দেখে পাত্রী নির্বাচন করা শরীয়তসম্মত পদ্ধতি নয়। প্রয়োজনে সরাসরি দেখা উচিত, তবে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে।" (ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩২২)
৫. সঠিক পদ্ধতি
বিবাহের প্রস্তাবকালে পাত্র-পাত্রী পরস্পরকে দেখার সঠিক পদ্ধতি হলো:
- বিবাহের প্রকৃত ইচ্ছা থাকতে হবে—শুধু কৌতূহল বা মজা করার উদ্দেশ্যে নয়।
- মাহরাম পুরুষের উপস্থিতিতে দেখা উচিত—যেমন পাত্রের বাবা, ভাই বা নিকটাত্মীয়।
- নির্জনতা (খালওয়া) পরিহার করতে হবে—একা একা দেখা যাবে না।
- কামনা-বাসনার সাথে না হওয়া—শুধু বিবাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে হওয়া।
- প্রয়োজনে একাধিকবার দেখা—তবে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে।
- ছবি দেখার উপর নির্ভর না করা—সরাসরি দেখা সম্ভব না হলে, মাহরামদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা।
উপসংহার
বিবাহের কথাবার্তার সময় পূর্ণ বায়োডাটা না দেখে ছেলের ছবি দেখা শরীয়তসম্মত নয়। কারণ—
- শরীয়তে বিবাহের প্রস্তাবকালে সরাসরি দেখা জায়েয, ছবি দেখা নয়।
- ছবি দেখার দ্বারা সরাসরি দেখার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না।
- ছবি আদান-প্রদানে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে।
- হানাফী মাযহাবের ফকীহগণ সরাসরি দেখার কথা বলেছেন, ছবি দেখার কথা বলেননি।
তাই করণীয় হলো: পাত্র-পাত্রী সরাসরি দেখা করবেন, মাহরামদের উপস্থিতিতে, শরীয়তের সীমা রক্ষা করে। ছবি দেখার উপর নির্ভর করা উচিত নয়। যদি সরাসরি দেখা সম্ভব না হয়, তবে মাহরামদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
- সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৮২
- সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ১০৮৬, ১০৮৭
- সুনানে নাসাঈ,