স্বামী মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখতে নিষেধ করলে কি করব?
Family Life · Hanafi
Question
ওর বিয়ে হয়েছে ইন্টার ২য় বর্ষে পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়। ওর হাসবেন্ড কাজ করতো না কিছু পারিবারিক জামেলার কারনে পরে ডিবোর্স হয়ে যায়। মেয়ে সংসার করতে চাইলেও বাবা মা এক প্রকার জোড় করে নিয়ে আসে।তখন ও প্রেগনেন্ট ছিলো যাওর সাম্বীর বাড়ির কেউ জানতো না। ওর মা ওর এবোর্সান করায় কাউকে না জানিয়ে। মেয়েও ভয়ে কিছু বলতে পারে নি।
পরে মেয়ের আবার বিয়ে হয় বাবা রাজি কিন্তু মা রাজি ছিলো না। এখন ও আবার প্রেগনেন্টহয় পরে বাচ্চার হার্ড বিট পাওয়া না যাওয়ায় ডাক্তার ১ সপ্তাহ দেখতে বলে তখন ২মাস + আলে প্রগনেনছির। পরে ওয় মা এসে ওকে একটা পানি খাওয়ায় যে এটা দোয়া পরে ফু দেয়া পানি ( ওর মা ওর প্রেগনেন্সির শুরু থেকে বাচ্চাটা না রাখতে বলে যেহেতু সে স্টুডেন্ট মেয়েটা রাজি হয় না?) তার ২ দিন পর ওর বাচ্চা মিসকারেজ হয়ে যায়,, এখন ওর হাসবেন্ড ওকে বলতেছে ওয় মায়ের সাথে আর যোগাযোগ না রাখতে যদি রাখে ত সে তাকে ডিবোর্স দিবে।
মেয়ের মা অসুস্থ তাই মেয়ে লুকিয়ে মাকে ডাক্তার দেখায় এটা স্বামী জানতে পারে তাই এখন সে একটা বেছে নিতে বলছে এখন ঔ মেয়ের করণীয় কি
Answer
উত্তর: মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখা না রাখা ও স্বামীর ডিভোর্সের হুমকির বিষয়ে
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল। এখানে কয়েকটি আলাদা বিষয় জড়িত আছে। নিচে ধাপে ধাপে শরীয়তের দৃষ্টিতে আলোচনা করা হলো।
মেয়েটি আপাতত মায়ের সাথে সম্পর্ক কম রেখে স্বামীর মন জয় সাথে স্বামীর সাথে সংসার চালিয়ে যাবে। পরবর্তীতে সময় সুযোগ মোতাবেক স্বামীকে হিকমতের সহিত মায়ের অসুস্থতা ও কষ্টের কথা বুঝিয়ে মার সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক কায়েম করার চেষ্টা করবে। কমপক্ষে মাঝে মাঝে ফোনে যোগাযোগ করে মায়ের খোঁজ খবর নিবে।
১. মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখা প্রসঙ্গে
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) ফরজ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার কুরআনের সরাসরি নির্দেশ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" — (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বাড়ুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" — (সহীহ বুখারী: ৫৯৮৬)
সুতরাং স্বামীর নির্দেশে মায়ের সাথে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা ইসলামে জায়েয নয়। তবে মায়ের সাথে এমন গোপনীয়তা বা এমন কাজ করা যাবে না যা স্বামীর বৈবাহিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে বা সংসারে ফিতনা সৃষ্টি করে।
২. মায়ের কৃতকর্মের শরয়ী বিচার (গুরুত্বপূর্ণ)
প্রশ্নে যা বর্ণিত হয়েছে, তা অত্যন্ত ভয়াবহ:
- কাউকে না জানিয়ে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো — এটি ইসলামে হত্যার সমতুল্য গুরুতর গুনাহ। জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো ও করাতে বাধ্য করা উভয়ই কবীরা গুনাহ।
- প্রতারণামূলক পানি পান করানো — যদি সত্যিই গর্ভপাত ঘটানোর উদ্দেশ্যে কিছু খাওয়ানো হয়, তবে এটি প্রতারণা ও হত্যার চেষ্টা।
- প্রেগনেন্সির শুরু থেকে বাচ্চা না রাখতে বলা — এটি সন্তান হত্যার ষড়যন্ত্র।
ইসলামে প্রাণ রক্ষা করা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ "আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, তাকে হত্যা করো না।" — (সূরা আনআম: ১৫১)
৩. স্বামীর "মা'র সাথে সম্পর্ক না রাখলে ডিভোর্স" — এর শরয়ী বিধান
ক) স্বামীর এই শর্ত কি বৈধ?
না, এটি শরীয়তসম্মত শর্ত নয়। কারণ:
- ইসলামে সিলাতুর রাহিম ফরজ — স্বামী স্ত্রীকে ফরজ ইবাদত থেকে বিরত রাখার অধিকার রাখে না।
- মায়ের সেবা করা (বিশেষত অসুস্থ অবস্থায়) ফরজে কিফায়া/ওয়াজিব পর্যায়ের আমল।
- স্বামীর আনুগত্য শরীয়তের সীমার ভেতরে — গুনাহের কাজে আনুগত্য নেই।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টির আনুগত্যে স্রষ্টার অবাধ্যতা করা যাবে না।" — (মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১০৯৮; সহীহ)
খ) তবে স্ত্রীর করণীয় কী?
স্ত্রীকে প্রজ্ঞা ও ভারসাম্যের সাথে চলতে হবে:
- মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখবে — কিন্তু স্বামীকে অসম্মান বা গোপনীয়তা করে নয়।
- স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করবে — যে মায়ের সেবা করা তার দ্বীনি দায়িত্ব, এটি স্বামীর প্রতি অবাধ্যতা নয়।
- গোপন করে ডাক্তার দেখানো — এটি ঠিক হয়নি। স্বামীকে জানিয়ে, সম্মান রেখে করা উচিত ছিল। গোপনীয়তা সন্দেহ বাড়ায়।
- মাঝখানে সমঝোতার পথ খুঁজবে — সম্ভব হলে পরিবারের বড়দের বা বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে মীমাংসা।
৪. ডিভোর্সের হুমকি প্রসঙ্গে
স্বামী যদি শুধু মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে ডিভোর্স দেয়, তবে:
- ডিভোর্স দেওয়া তার অধিকার — শরীয়তে স্বামী ডিভোর্স দিতে পারে।
- কিন্তু অন্যায় কারণে ডিভোর্স দেওয়া গুনাহের কাজ — কারণ এটি ফরজ ইবাদত থেকে বিরত রাখার হুমকি।
- তবে ডিভোর্সের পরও মায়ের সাথে সম্পর্ক রাখা ফরজ — ডিভোর্স হলে সেটা মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার অজুহাত নয়।
والله أعلم بالصواب