মুসলিম ও অমুসলিম মহিলার পর্দা, মাহরাম ও নন-মাহরাম পুরুষের সামনে পর্দার নিয়ম।
Halal and Haram · Hanafi
Question
★মুসলিম
★অমুসলিম
২.পুরুষ :
★মাহরাম
★নন মাহরামের সামনে কেমন হবে?
৩. পর্দা না করার শাস্তি :
কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব কেমন?
Answer
মহিলাদের পর্দা সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসআলা
উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
ভূমিকা
পর্দা ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কুরআন, হাদিস ও ইজমায়ে উম্মত দ্বারা পর্দা ফরজ হওয়া প্রমাণিত। মহান আল্লাহ বলেন:
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
"মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা প্রকাশ্য।" (সূরা নূর: ৩১)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ
"হে নবী! আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়।" (সূরা আহযাব: ৫৯)
১. মহিলাদের পর্দার বিধান
(ক) মুসলিম মহিলার পর্দা
মুসলিম মহিলার জন্য পর্দা ফরজ (আবশ্যক)। তার শরীরের সমস্ত অঙ্গ (মুখ, হাতের কব্জি, পায়ের গোড়ালি সহ) নন-মাহরাম পুরুষ থেকে ঢাকা ফরজ।
দলিল:
- সূরা নূর: ৩১
- সূরা আহযাব: ৫৯
- হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নারী হলো সতর্কতার সাথে গোপন রাখার বস্তু।" (তিরমিজি: ১১৭৩)
হানাফি ফিকহের বিধান: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, মহিলার সমস্ত শরীরই সতর, মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি সহ। তবে নামাজে হাতের কব্জি ও পায়ের পাতা পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েজ।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬
- আল-হিদায়া: কিতাবুস সালাত
- ফাতাওয়া আলমগিরি: খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮
(খ) অমুসলিম মহিলার সামনে পর্দা
অমুসলিম (কাফির) মহিলার সামনে মুসলিম মহিলার পর্দা:
হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, অমুসলিম মহিলার সামনে মুসলিম মহিলার সতর ঢাকা ফরজ নয় — অর্থাৎ চেহারা, চুল, হাত-পা দেখা যেতে পারে, তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম।
তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে একটি বর্ণনায় আছে: অমুসলিম মহিলার সামনেও পর্দা করা উত্তম ও সতর্কতামূলক।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৭
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: খণ্ড ৫, পৃ. ৩২৮
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: খণ্ড ৪, পৃ. ২৭০
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) বলেন: "বর্তমান ফিতনার যুগে অমুসলিম মহিলার সামনেও পর্দার বিধান পালন করা উত্তম।"
২. পুরুষদের সামনে পর্দার বিধান
(ক) মাহরাম পুরুষ
মাহরাম পুরুষ হলো যাদের সাথে বিবাহ চিরতরে হারাম:
- পিতা, দাদা, নানা (উর্ধ্বতন পুরুষ)
- পুত্র, পৌত্র, দৌহিত্র (অধঃস্থন পুরুষ)
- ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে
- চাচা, মামা, খালু, ফুফা
- শ্বশুর, দামাদ (জামাই)
- দুধ সম্পর্কের মাহরাম
মাহরামের সামনে পর্দা: মাহরাম পুরুষের সামনে মহিলার শরীরের সতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (হানাফি মতে)। তবে চেহারা, চুল, হাত-পা, গলা ইত্যাদি দেখা জায়েজ, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।
দলিল: সূরা নূর: ৩১ — যেখানে মাহরামদের তালিকা দেওয়া হয়েছে।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ৬, পৃ. ৩৬৭
- বাহিশতী জেওর: পর্দার অধ্যায়
- ফাতাওয়া উসমানি: খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫
তবে সতর্কতা: মাহরামের সামনেও অশ্লীল পোশাক, টাইট বা শরীর-প্রকাশক পোশাক পরা নিষিদ্ধ। ফিতনার আশঙ্কা থাকলে সম্পূর্ণ পর্দা করা ওয়াজিব।
(খ) নন-মাহরাম পুরুষের সামনে পর্দা
নন-মাহরাম পুরুষের সামনে মহিলার সমস্ত শরীর (মুখ ও হাতের কব্জি সহ) ঢাকা ফরজ।
শর্তসমূহ:
- পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে — শরীরের গঠন প্রকাশ পাবে না
- পোশাক অস্বচ্ছ (পাতলা/ট্রান্সপারেন্ট) হবে না
- সুগন্ধি ব্যবহার করে বের হওয়া নিষিদ্ধ
- আওয়াজ নরম/কোমল করা নিষিদ্ধ (সূরা আহযাব: ৩২)
- অপ্রয়োজনীয় কথা বলা ও দৃষ্টি বিনিময় নিষিদ্ধ
হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নারী হলো সতর (গোপনীয় বস্তু)। যখন সে বের হয়, শয়তান তার দিকে তাকিয়ে থাকে।" (তিরমিজি: ১১৭৩)
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার: খণ্ড ১, পৃ. ৪০৬; খণ্ড ৫, পৃ. ২৩৬
- মা'আরিফুল কুরআন: সূরা নূরের তাফসির
- ফাতাওয়া উসমানি: খণ্ড ২, পৃ. ৩৩০-৩৩৫
৩. পর্দা না করার শাস্তি
(ক) কবরের আযাব
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার দুই কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন:
"এই দুই কবরের অধিবাসীকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। তাদের একজন চোগলখুরি করত, অন্যজন পেশাব থেকে পবিত্র থাকত না।" (বুখারি: ২১৮; মুসলিম: ২৯২)
পর্দা না করার কারণে কবরের আযাব সম্পর্কে:
- হাদিসে বর্ণিত আছে, ব্যভিচার, পর্দা লঙ্ঘন, অনৈতিক কাজের শাস্তি কবরেই শুরু হয়
- ইবনে হাজার (রহ.) বলেন: "কবরের আযাব হক, তা কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।"
রেফারেন্স:
- ফাতহুল বারী: খণ্ড ৩, পৃ. ২৩৫
- শারহু মা'আনিল আছার: কিতাবুল জানাইয
(খ) জাহান্নামের আযাব
কুরআনের বর্ণনা:
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
"যারা স্বর্ণ-রৌপ্য সঞ্চয় করে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের কঠিন আযাবের সুসংবাদ দাও।" (সূরা তাওবা: ৩৪)
পর্দা না করার শাস্তি সম্পর্কে হাদিস:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"জাহান্নামের অধিবাসীদের মধ্যে কিছু নারী থাকবে যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ থাকবে, তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদের পথভ্রষ্ট করবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং তার সুগন্ধিও পাবে না।" (মুসলিম: ২১২৮)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "এই হাদিসে সেই নারীদের কথা বলা হয়েছে যারা পাতলা/টাইট পোশাক পরে শরীর প্রকাশ করে।"
রেফারেন্স:
- শারহু সহিহ মুসলিম: খণ্ড ১৪, পৃ. ১১০
- মা'আরিফুল কুরআন: সূরা নূরের তাফসির
- ইমদাদুল ফাতাওয়া: খণ্ড ৪, পৃ. ২৭০
জাহান্নামের আযাবের বর্ণনা:
- আগুনের পোশাক (সূরা ইবরাহিম: ৫০)
- ফুটন্ত পানি পান করানো (সূরা মুহাম্মদ: ১৫)
- চেহারা উল্টো করে টেনে নিয়ে যাওয়া (সূরা কাহফ: ২৯)
- যাক্কুম গাছের ফল খাওয়ানো (সূরা দুখান: ৪৩-৪৬)
৪. পর্দা না করার অন্যান্য পরিণতি
দুনিয়ার শাস্তি:
- ফিতনা ও অনৈতিকতার বিস্তার — সমাজে ব্যভিচার বৃদ্ধি পায়
- বরকত হ্রাস — ঘরে-বাইরে অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি
- সম্মানহানি — নারীর মর্যাদা নষ্ট হয়
- সন্তানদের উপর প্রভাব — পরবর্তী প্রজন্ম অনৈতিক হয়ে যায়
আখিরাতের শাস্তি:
- হাশরের ময়দানে লজ্জিত হওয়া
- জাহান্নামে প্রবেশ — যদি তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে
- জান্নাতের সুগন্ধি থেকেও বঞ্চিত হওয়া (মুসলিম: ২১২৮)
৫. তাওবার সুযোগ
মহান আল্লাহ বলেন:
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا
"তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোনো জুলুম করা হবে না।" (সূরা মারইয়াম: ৬০)
তাই পর্দা না করলে:
- সাথে সাথে তাওবা করতে হবে
- পর্দা করা শুরু করতে হবে
- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে
- ভবিষ্যতে পর্দা করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|------| | মুসলিম মহিলার পর্দা | ফরজ (সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা) | | অমুসলিম মহিলার সামনে | সতর ঢাকা ফরজ নয়, তবে সতর্কতা উত্তম | | মাহরামের সামনে | নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত সতর | | নন-মাহরামের সামনে | সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা ফরজ | | পর্দা না করার শাস্তি | কবরের আযাব, জাহান্নামের আযাব |
রেফারেন্স গ্রন্থপঞ্জি
- আল-কুরআনুল কারিম — সূরা নূর: ৩১, সূরা আহযাব: ৫৯
- সহিহ বুখারি — হাদিস: ২১৮
- সহিহ মুসলিম — হাদিস: ২১২৮, ২৯২
- সুনানে তিরমিজি — হাদিস: ১১৭৩
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — খণ্ড ১, ৫, ৬
- আল-হিদায়া — কিতাবুস সালাত
- ফাতাওয়া আলমগিরি — খণ্ড ৫
- ফাতাওয়া উসমানি — খণ্ড ২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া — খণ্ড ৪
- মা'আরিফুল কুরআন — সূরা নূরের তাফসির
- বাহিশতী জেওর — পর্দার অধ্যায়
- শারহু মা'আনিল আছার — কিতাবুল জানাইয
- ফাতহুল বারী — খণ্ড ৩