হাদীস সম্পর্কিত
Faith and Belief · Hanafi
Question
মৃত বাবা মায়ের জন্য নেক সন্তানের দুআ কবুল হয়।আমি তো নেককার নই,গুণাহগার।আল্লাহ আমাকে মাফ করুন। আমার দুআ কি কবুল হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের সারমর্ম
আপনি জানতে চেয়েছেন—হাদীসে এসেছে, মৃত বাবা-মায়ের জন্য নেক সন্তানের দুআ কবুল হয়। কিন্তু আপনি নিজেকে নেককার মনে করছেন না, বরং গুনাহগার মনে করছেন। তাহলে আপনার দুআ কি কবুল হবে?
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন
হাদীসে যে "নেক সন্তান" শব্দটি এসেছে, এর অর্থ এই নয় যে সন্তানকে নিষ্পাপ বা ভুল-ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। বরং এর অর্থ হলো—সন্তান ঈমানদার ও মুসলিম হবে, এবং বাবা-মায়ের জন্য দুআ করবে। কারণ কাফের সন্তানের দুআ মৃত মুসলিম বাবা-মায়ের উপকারে আসে না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، وَعِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، وَوَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
"মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) এমন ইলম যা থেকে উপকার নেওয়া হয়, (৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।"
— সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৩১; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৮০
এখানে "وَلَدٍ صَالِحٍ" (নেক সন্তান) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—সন্তান মুসলিম ও দুআকারী হবে। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এই হাদীসে দুআর শর্ত হলো সন্তান মুসলিম হওয়া; কারণ কাফেরের দুআ মুমিন মৃতের জন্য উপকারী নয়। (শরহু সহীহ মুসলিম)
গুনাহগার হওয়া দুআ কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধক নয়
আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেছেন:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
"আর যখন আমার বান্দারা আপনার কাছে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, (বলুন) আমি তো নিকটেই; আমি দুআকারীর দুআ কবুল করি যখন সে আমাকে ডাকে।"
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৬
এই আয়াতে আল্লাহ কোনো শর্ত দেননি যে দুআকারীকে নিষ্পাপ হতে হবে। বরং তিনি বলেছেন—যে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।
আল্লাহ আরও বলেছেন:
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
"তোমাদের প্রতিপালক বলেছেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।"
— সূরা গাফির, আয়াত ৬০
গুনাহগার হওয়া সত্ত্বেও দুআ কবুলের দলিল
১. হযরত আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.) — তাঁরা ভুল করার পর তাওবা করে দুআ করেছিলেন, আল্লাহ কবুল করেছিলেন। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৩৭)
২. হযরত ইউনুস (আ.) — মাছের পেটে থাকা অবস্থায় দুআ করেছিলেন, আল্লাহ কবুল করেছিলেন। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৭-৮৮)
৩. হাদীসে কুদসী: আল্লাহ বলেন—
"হে আদম সন্তান! তুমি যদি আমার কাছে দুআ করো এবং আমার উপর ভরসা রাখো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, তোমার গুনাহ যতই হোক।" — সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৪০
ফিকহের দৃষ্টিতে
ইমাম ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ উল্লেখ করেছেন, মৃত ব্যক্তির জন্য দুআ, ইস্তিগফার ও সদকা—সবই পৌঁছায় এবং উপকার করে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৩)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মাআরিফুল কুরআন"-এ সূরা আল-বাকারার ১৮৬ নং আয়াতের তাফসীরে বলেন—আল্লাহর দুআ কবুল করার জন্য বান্দার কোনো বিশেষ মর্যাদা শর্ত নয়; বরং বিনয়ী হয়ে, আন্তরিকভাবে দুআ করাই মূল বিষয়।
আপনার করণীয়
১. নিরাশ হবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফর। (সূরা ইউসুফ, আয়াত ৮৭)
২. তাওবা করুন। আন্তরিক তাওবা করলে আল্লাহ গুনাহ ক্ষমা করেন। (সূরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩)
৩. বাবা-মায়ের জন্য দুআ চালিয়ে যান। আপনার দুআ তাদের উপকার করবে—ইনশাআল্লাহ।
৪. সদকা করুন। বাবা-মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করুন; এটি তাদের জন্য উপকারী।
৫. নেক আমল বাড়ান। নিজেকে "নেক সন্তান" বানানোর চেষ্টা করুন—নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, ইস্তিগফার।
মূল উত্তর
হ্যাঁ, আপনার দুআ কবুল হওয়ার পূর্ণ আশা আছে—ইনশাআল্লাহ। কারণ:
- দুআ কবুলের জন্য নিষ্পাপ হওয়া শর্ত নয়; বরং আন্তরিকতা ও বিনয় শর্ত।
- গুনাহগার বান্দার দুআ আল্লাহ কবুল করেন—এটি কুরআন ও হাদীসে প্রমাণিত।
- "নেক সন্তান" দ্বারা উদ্দেশ্য মুসলিম সন্তান যে দুআ করে; আপনি মুসলিম, তাই আপনি দুআ করতে পারবেন।
- বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের দুআ বিশেষভাবে কবুল হয়—এটি হাদীসে বর্ণিত।
তবে হ্যাঁ, নিজের গুনাহ থেকে তাওবা করা, হালাল উপার্জন, নামাজ-রোজা ইত্যাদি নেক আমল করা দুআ কবুলের সম্ভাবনা বাড়ায়।
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে আন্তরিক তাওবা ও নেক আমলের তাওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।