হালাল টাকার সাথে কিছু পরিমাণ হারাম টাকা মিশে গেলে করণীয় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
উল্লেখ্য যে কত টাকা হারাম তা বোঝার উপায় নাই।
২- বেশিরভাগ হারাম খাবার বিক্রি করার রেস্তোরাঁয় কাজ করে সে টাকা উপার্জন করা হালাল? এই টাকার বেতন দিয়ে যদি অন্য হালাল ব্যবসার যায়গার ভাড়া, বা মাঝেমধ্যে হালাল মূলধনের সাথে জড়িত হয়, তাহলে পুরো ব্যবসার আয় ই হারাম হবে?
৩- এরকম উপার্জনের কেউ যদি পরিবারের সদস্য হয় এবং পরিবারের জন্য হাদিয়া, খাবার কিনে তা গ্রহণ বা খেলে ইবাদত কবুল হবে? হালাল হবে? যদি ভালো ধারণা করি যে তার হয়তো অন্য হালাল উপার্জন আছে, তা থেকে খরচ করছে। তাহলে হালাল হবে? এসব বলছি কারণ কিছু বললে পারিবারিক ফিতনাহ আশংকা করছি, আল্লাহ্ কি আমার উপর নারাজ?
Answer
উত্তর:
প্রশ্ন ১: যদি বেশিরভাগ হালাল টাকার সাথে কিছু পরিমাণ হারাম টাকা মিশে যায় এবং হারাম টাকার পরিমাণ জানা না থাকে, তবে পুরো টাকা হারাম হবে না। বরং, অনুমান করেই হারাম পরিমাণ বাদ দিয়ে বাকি টাকা হালাল বলে গণ্য হবে। তবে যদি হারাম টাকার পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়, তবে সেই পরিমাণ অবশ্যই বাদ দিতে হবে এবং বাকি হালাল টাকা ব্যবহার করা যাবে। যদি হারাম পরিমাণ নির্ণয় করা অসম্ভব হয়, তবে তওবা ও ইস্তিগফার করে পুরো টাকা থেকে বেঁচে থাকা উত্তম। তবে অনেক হানাফি ফকিহের মতে, হারামের অনুপাত অতি নগণ্য হলে (যেমন ১% এর কম) এবং হালাল পরিমাণ সুস্পষ্টভাবে বেশি হলে, পুরো টাকা হালাল বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মত হলো: যদি হালাল ও হারাম মিশ্রিত হয় এবং হারামের পরিমাণ অজ্ঞাত থাকে, তবে হালাল অনুমান করে চলবে। (সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৯/৪৫৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/৩৪৩)
সতর্কতা: ব্যাংকের সুদ স্পষ্ট হারাম। তাই সুদ-মুক্ত ব্যাংকিং বা সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে টাকা জমা রাখা উচিত। মিশ্রিত টাকার ক্ষেত্রে তওবা করে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রশ্ন ২: যে রেস্তোরাঁয় বেশিরভাগ হারাম খাবার (যেমন: গরু-মুরগির বৈধ জবাইকৃত না হওয়া, শূকরের মাংস, মদ ইত্যাদি) বিক্রি হয়, সেখানে কাজ করা এবং বেতন নেওয়া জায়েজ নয়। কারণ তা হারাম কাজে সহযোগিতা করার শামিল (সূরা মায়িদা: ২)। এই বেতন দিয়ে যদি কোনো হালাল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয় বা ভাড়া দেওয়া হয়, তবে সেই বিনিয়োগকৃত টাকা হারাম বলে গণ্য হবে এবং ঐ ব্যবসার আয়ও হারাম হবে। তবে যদি ব্যবসার মূলধনে হারাম টাকা মিশ্রিত হয় এবং তা পৃথক করা সম্ভব না হয়, তবে পুরো ব্যবসার আয় হারাম হবে না; বরং, হারাম টাকার অনুপাতিক পরিমাণ দান করে দিতে হবে।
সতর্কতা: এই ধরনের রেস্তোরাঁয় কাজ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণের জন্য হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা ফরজ।
প্রশ্ন ৩:
(ক) যদি পরিবারের কোনো সদস্য হারাম উপার্জন করে, কিন্তু আপনি ভালো ধারণা করেন যে তার অন্য হালাল উপার্জন আছে এবং তা থেকে খরচ করছে, তাহলে তার দেওয়া হাদিয়া বা খাবার গ্রহণ করা জায়েজ। তবে যদি নিশ্চিত হন যে, তা হারাম টাকা থেকে কেনা, তবে তা গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা মানুষের নিয়্যত ও ধারণার ভিত্তিতে আমল গ্রহণ করেন (সূত্র: বুখারি, হাদিস: ১)।
(খ) পারিবারিক ফিতনার আশঙ্কায় চুপ থাকা এবং নিজে হালাল খাবার গ্রহণ করা উত্তম। তবে সরাসরি কোনো কিছু বললে পরিবারে অশান্তি হবে, এমন হলে নরম ভাষায় বুঝানোর চেষ্টা করুন। আল্লাহ তায়ালা বান্দার অবস্থা জানেন এবং নিয়্যত অনুযায়ী প্রতিদান দেন। আপনি আপনার কর্তব্য পালন করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন না।
মূলনীতি:
- ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত: হালাল খাদ্য ও পোশাক। তাই সন্দেহযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উত্তম।
- পরিবারের ফিতনা এড়াতে: হালাল উপার্জনে উৎসাহিত করুন, হারাম থেকে বিরত রাখার জন্য দোয়া করুন।
রেফারেন্স:
- মা'আরিফুল কুরআন (সূরা বাকারা: ১৬৭-১৬৮)
- বেহেশতী জেওর (প্রথম খণ্ড, হালাল-হারাম অধ্যায়)
- ফাতাওয়া উসমানি (প্রথম খণ্ড, হারাম উপার্জন সংক্রান্ত)
শেষ পরামর্শ: হারাম থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং হালাল উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পারিবারিক ফিতনার আশঙ্কায় হারামকে প্রশ্রয় না দেওয়াই উত্তম। আল্লাহ তায়ালা সহায় হোন।