অত্যন্ত আস্তে ফিসফিস করে বলা তালাক কি পতিত হয়?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5275
Questioner: Shahriar Shanto
Question Asked: 11 Sep 2026, 10:06 AM
Reviewed & Published: 11 Sep 2026, 02:47 PM
Views: 16
Tokens: 4,887
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

খুবই আস্তে রাগে মনের অজান্তেই যদি বের হয়ে পরে "তোকে আমি এক তালাক দিলাম' তাহলেই কি তালাক হয়ে যাবে?

অনলাইনে মেসেজ ঝগড়া শেষ করার পর স্বামী তার মনে মনে অনেক রেগে ছিল এন্ড হঠাৎ করে মনে মনে ভাবতে ভাবতে মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো।

অনেক আস্তে ফিসফিসানির মতো এক তালাক দিলাম তার কান পর্যন্ত যেতেই সে হতাশা অস্থিরতায় ভয়ংকর অবস্থা সে মনের অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়েছে।

তবুও অনেক আস্তে সাথে সাথে কান্না কাটি

Answer

প্রশ্ন: অত্যন্ত আস্তে ফিসফিস করে বলা তালাক কি পতিত হবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

হ্যাঁ, তালাক পতিত হয়ে যাবে। তালাকের জন্য উচ্চস্বরে বলা শর্ত নয়; বরং নিজের কান পর্যন্ত শুনতে পাওয়া বা মুখ থেকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ হওয়া যথেষ্ট। এমনকি ফিসফিস করে বলা তালাকও পতিত হয়, যদি তা ইচ্ছাকৃতভাবে বা সচেতনভাবে বলা হয়।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—"মনের অজান্তে" বা "নিয়ন্ত্রণহীনভাবে" মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া এবং রাগের বশে সচেতনভাবে বলা—এই দুটির মধ্যে বিধানগত পার্থক্য রয়েছে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।


বিস্তারিত আলোচনা

১. তালাকের শর্ত: ইচ্ছা ও সচেতনতা

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য দুটি মূল শর্ত:

  1. আকল (বিবেক/জ্ঞান) — পাগল বা অচেতন অবস্থায় তালাক পতিত হয় না।
  2. ইচ্ছা বা সচেতনতা (قصد) — তবে এখানে "ইচ্ছা" মানে তালাকের শব্দ উচ্চারণের ইচ্ছা, তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়।

গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি: রাগের বশে, ঠাট্টায়, এমনকি "না দেওয়ার ইচ্ছায়" তালাকের শব্দ উচ্চারণ করলেও তালাক পতিত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ»

"তিনটি বিষয়—এর গুরুত্বের সাথে করা এবং ঠাট্টার সাথে করা সমান (অর্থাৎ ঠাট্টাতেও কার্যকর): বিবাহ, তালাক এবং রাজআত (ফিরিয়ে নেওয়া)।"

সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২১৯৪; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১১৮৪; ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৩৯ (হাসান)

২. ফিসফিস করে বলা তালাক

রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন:

"তালাকের শব্দ যদি এত আস্তে বলা হয় যে, নিজে শুনতে পায়—তবুও তালাক পতিত হবে। আর যদি শুধু ঠোঁট নড়ে কিন্তু কোনো আওয়াজই না হয়, এবং কেউ না শোনে—তাহলে তালাক পতিত হবে না।"

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭ (কিতাবুত তালাক)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে এসেছে:

"যদি কোনো ব্যক্তি নিজ কানে শুনতে পায় এমনভাবে তালাক উচ্চারণ করে, তবে তালাক পতিত হবে।"

ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭৫

৩. "মনের অজান্তে" বলার বিধান

এখানে দুটি অবস্থা বিবেচ্য:

(ক) যদি সচেতনভাবে, ইচ্ছাকৃতভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করে — যদিও রাগের বশে, যদিও ফিসফিস করে, যদিও "মন চায়নি" — তবুও তালাক পতিত হবে। কারণ তালাকের ক্ষেত্রে "মনের ইচ্ছা" নয়, বরং শব্দ উচ্চারণ হলো মূল বিষয়।

(খ) যদি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে, অসুস্থতা বা মানসিক চাপে মুখ থেকে বেরিয়ে যায় — যেমন হঠাৎ জিহ্বা পিছলে যায়, বা এমন অবস্থায় যা ইচ্ছাশক্তির বাইরে — তবে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সতর্কতামূলক (এহতিয়াত) দৃষ্টিতে এমন অবস্থাতেও তালাক পতিত হয়েছে ধরে নেওয়া নিরাপদ, যদি না তা পাগলামি বা অচেতন অবস্থা হয়।

৪. প্রশ্নের বর্ণনায় যা বোঝা যাচ্ছে

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা:

  • অনলাইনে মেসেজে ঝগড়া হয়েছে
  • স্বামী মনে মনে অনেক রেগে ছিল
  • হঠাৎ মনে মনে ভাবতে ভাবতে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল
  • অনেক আস্তে, ফিসফিসানির মতো "এক তালাক দিলাম"
  • স্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছেছে
  • স্ত্রী হতাশা, অস্থিরতায় ভয়ংকর অবস্থায়
  • সাথে সাথে কান্নাকাটি

এই বর্ণনা অনুযায়ী: স্বামী সচেতন অবস্থায় ছিলেন, রাগের বশে ছিলেন, এবং তালাকের শব্দ স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছেন (যদিও আস্তে)। স্ত্রী তা শুনেছেন। সুতরাং হানাফি মাযহাব অনুযায়ী এক তালাকে রাজয়ি (ফিরিয়ে আনা যায় এমন) তালাক পতিত হয়ে গেছে।

৫. এখন করণীয়

যেহেতু এটি এক তালাকে রাজয়ি (প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক), তাই:

  1. ইদ্দতের মধ্যে (তিন হায়েজ/তিন মাস) স্বামী মৌখিকভাবে বা কাজের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন, নতুন বিবাহের প্রয়োজন নেই।
  2. ফিরিয়ে আনার উত্তম পদ্ধতি: সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মুখে বলা—"আমি তোমাকে আমার বিবাহে ফিরিয়ে নিলাম।"
  3. ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে নতুন করে বিবাহ করতে হবে (নতুন মোহর, নতুন সাক্ষী, স্ত্রীর সম্মতি)।

সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|------| | ফিসফিস করে বলা তালাক | পতিত হবে (যদি নিজে শুনতে পায়) | | রাগের বশে বলা তালাক | পতিত হবে | | "মন চায়নি" বলা | তালাক রোধ করবে না | | ঠাট্টায় বলা তালাক | পতিত হবে | | পাগল/অচেতন অবস্থায় | পতিত হবে না | | এক তালাক (রাজয়ি) | ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে আনা যায় |

আরবি দলিল

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ وَالطَّلَاقُ وَالرَّجْعَةُ»

সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪

وَفِي الرَّدِّ الْمُحْتَارِ: «لَوْ تَكَلَّمَ بِالطَّلَاقِ بِحَيْثُ يُسْمِعُ نَفْسَهُ يَقَعُ، وَإِنْ لَمْ يُسْمِعْ غَيْرَهُ»

রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ২৪৭

وَفِي الْفَتَاوَى الْعَالَمْكِيرِيَّةِ: «إِذَا أَتَى بِالطَّلَاقِ بِحَيْثُ يَسْمَعُ نَفْسَهُ يَقَعُ الطَّلَاقُ»

ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ৩৭৫


উপদেশ

রাগের বশে তালাকের মতো সংবেদনশীল শব্দ উচ্চারণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا يَطْلُبُ الرَّجُلُ طَلَاقَ امْرَأَتِهِ... فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُطَلِّقِينَ»

সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৯

অতএব, ভবিষ্যতে রাগের সময় জিহ্বা সংযত রাখুন, "তালাক" শব্দটি মুখে আনবেন না। ঝগড়ার সময় ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া, পানি পান করা, অজু করা—এসব সুন্নত পদ্ধতি অবলম্বন করুন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.