দ্বীনের বিষয় নিয়ে মশকরা করা কি কুফর?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5260
Questioner: TBB
Question Asked: 11 Sep 2026, 01:04 AM
Reviewed & Published: 11 Sep 2026, 02:08 AM
Views: 28
Tokens: 10,900
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। একটি বিষয়ের শরয়ী হুকুম জানতে চাই।

কয়েক দিন আগে আমি আমার এক মুসলিম বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছি। বর্তমানে আমার কাছে টাকা নেই, তাই তাকে বলেছিলাম যে ইনশাআল্লাহ দুই দিনের মধ্যে টাকা ফেরত দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। এরপর আমি তাকে বলেছিলাম—“আমি যদি এই দুই দিনের মধ্যে মারা যাই, তাহলে তুমি যেন আবেগপ্রবণ হয়ে বিষয়টি লুকিয়ে না রাখো; আমার পরিবারকে পরিষ্কারভাবে জানাবে যে আমি তোমার কাছে টাকা ধারী, যাতে আমার এই ঋণ পরিশোধ করা হয় এবং আখিরাতে আমার ওপর অন্যের হক না থাকে।”

এরপর আমার বন্ধু কিছুটা হাসি-ঠাট্টার সুরে বলল যে সে আমার পরিবারকে বলবে না এবং কিয়ামতের দিন আমার কাছ থেকে আমার কিছু নেক আমল নিয়ে নেবে। সে কথাটি মজা করেই বলেছিল, ধর্মকে অসম্মান করার উদ্দেশ্যে নয়।

আমি তার সেই হাসি-ঠাট্টার সুর অনুসরণ করে বললাম, “না না, আমি এটা করতে পারব না। আমি আমার নেক আমল তোমাকে দিতে পারব না। যে দিনে মা তার সন্তানকেও চিনবে না, সেই দিনে আমি কীভাবে আমার নেক আমল দিয়ে দেব?” এরপর সে আবার মজা করে বলল যে সে আল্লাহর কাছে বলবে যে আমি তার কাছে টাকা ধারী, তাই সে আমার কিছু নেক আমল পেতে পারে।

তখন আমিও হাসি-ঠাট্টার মধ্যে তাকে বললাম, “তুমি তো খুব খারাপ মানুষ!” এবং বললাম যে তাহলে আমি আমার PC-এর কিছু parts বিক্রি করে হলেও তার টাকা দিয়ে দেব, ইনশাআল্লাহ।

পুরো কথোপকথনটি হাসি-ঠাট্টার সুরে হয়েছিল। আমরা তখন কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে কথা বলছিলাম না। তবে **আমাদের কারও উদ্দেশ্য আল্লাহ, ইসলাম, কুরআন, রাসূল ﷺ, কিয়ামতের সত্যতা বা ইসলামের কোনো বিধানকে উপহাস করা ছিল না।** আমরা বরং কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে দিতে হতে পারে—এই বাস্তব বিষয়টিকে নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা করছিলাম।

কথা শেষ হওয়ার পর আমরা দুজনেই বিষয়টির প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করি এবং কিয়ামতের দিন আসলে কত ভয়াবহ হবে, মানুষ কত মানুষের হক নষ্ট করে ফেলেছে যা আজ মনে নেই—এসব নিয়ে কথা বলি। এরপর আমরা দুজনেই চুপ হয়ে যাই এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুভব করি।

আমার প্রশ্ন:

১. এই কথোপকথনের কারণে কি আমি কোনো কুফরি কথা বলেছি বা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছি?

২. কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এভাবে হাসি-ঠাট্টা করা কি নিজেই কুফর, নাকি এটি গুনাহ/অনুচিত কথা হতে পারে কিন্তু কুফর নয়?

৩. আমার কথাগুলোর মধ্যে কি আল্লাহ, কিয়ামত, আখিরাত, ইসলাম বা কোনো শরয়ী বিষয়কে উপহাস করার অর্থ পাওয়া যায়?

৪. যদি কুফর না হয়ে থাকে, তাহলে কি শুধু ইস্তিগফার করে বিষয়টি ছেড়ে দেব, নাকি কোনো নির্দিষ্ট তওবা/কাফফারা প্রয়োজন?

আমি বিশেষভাবে জানতে চাই যে কথাগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এর শরয়ী হুকুম কী।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—যদি সত্যিই উদ্দেশ্য আল্লাহ, ইসলাম, কুরআন, রাসূল ﷺ, কিয়ামত বা শরীয়তের কোনো বিধানকে উপহাস করা না হয়ে থাকে, বরং কিয়ামতের দিন হক-বিচার ও নেক আমল দিতে হতে পারে—এই বিষয়টিকে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি-ঠাট্টার প্রেক্ষাপটে বলা হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণভাবে এটি কুফর নয়; বরং এটি অনুচিত, বেপরোয়া ও গুনাহের কাজ। তবে এ ধরনের বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা মুসলিমের জন্য শোভনীয় নয় এবং তা থেকে তওবা করা কর্তব্য।

তবে সতর্কতা এই যে—যদি কারও কথা বা হাসি দ্বারা আল্লাহ, রাসূল ﷺ, কুরআন, আখিরাত বা ইসলামের কোনো অকাট্য বিধানকে হালকা বা উপহাস করার অর্থ প্রকাশ পায়, তাহলে তা কুফর হয়ে যাবে। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
“আপনি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা বলবে: আমরা তো শুধু গল্প-গুজব ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন: তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে উপহাস করছিলে? অজুহাত পেশ করো না; তোমরা ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।”
(সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে আবিদীন শামী রহ. বলেন, দ্বীনের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা কুফর। তবে যদি কেউ দ্বীনকে উপহাস করার উদ্দেশ্য না করে, শুধু কোনো জায়েয বা সম্ভাব্য বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে, তাহলে সেটি কুফর নয়; কিন্তু বেপরোয়ামি ও গুনাহ।
(রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল জিহাদ, মাসআলাতুল মুরতাদ; ফাতাওয়া উসমানী, ১/২৩৫-২৩৮)


প্রশ্নোক্ত বিষয়গুলোর বিস্তারিত উত্তর

১. এই কথোপকথনের কারণে কি কুফরি কথা বলা হয়েছে বা ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছেন?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—আপনি বা আপনার বন্ধু কেউই আল্লাহ, ইসলাম, কুরআন, রাসূল ﷺ, কিয়ামতের সত্যতা বা ইসলামের কোনো বিধানকে উপহাস করার উদ্দেশ্য করেননি। বরং কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে দিতে হতে পারে—এই বাস্তব বিষয়টিকে নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা করছিলেন।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণভাবে কুফর হয়নি। তবে এটি গুনাহ ও অনুচিত ছিল। কেননা আখিরাত ও কিয়ামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা মুসলিমের জন্য বেপরোয়ামি।

তবে যদি কেউ মনে করে যে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মামলা করা বা নেক আমল হস্তান্তর করা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা মানে আখিরাতকে হালকা করা, তাহলে তা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই এ ধরনের কথা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা জরুরি।

২. কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে এভাবে হাসি-ঠাট্টা করা কি নিজেই কুফর, নাকি গুনাহ/অনুচিত কথা?

কিয়ামতের দিন হক-বিচার, মাজলুমের হক আদায়, নেক আমল হস্তান্তর ইত্যাদি বিষয়গুলো কুরআন-হাদীসে বর্ণিত সত্য। এগুলো নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা যদি দ্বীনকে হালকা বা উপহাস করার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা কুফর।
কিন্তু যদি শুধু বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে, দ্বীনকে উপহাস না করে, বিষয়টির ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলার সময় হালকা মেজাজে বলা হয়, তাহলে সেটি কুফর নয়; বরং গুনাহ ও অনুচিত
তবে এ ধরনের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ. বলেন, দ্বীনের আহকাম নিয়ে ঠাট্টা করা কুফর; কিন্তু কোনো জায়েয বিষয় নিয়ে ঠাট্টা করা কুফর নয়।
(ফয়যুল বারী, কিতাবুল ইলম)

৩. আমার কথাগুলোর মধ্যে কি আল্লাহ, কিয়ামত, আখিরাত, ইসলাম বা কোনো শরয়ী বিষয়কে উপহাস করার অর্থ পাওয়া যায়?

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—আপনি আল্লাহ, কিয়ামত, আখিরাত, ইসলাম বা শরীয়তকে উপহাস করেননি। আপনি বরং কিয়ামতের দিন নেক আমল দিয়ে দিতে হতে পারে—এই বাস্তব বিষয়টিকে নিয়ে ঠাট্টা করছিলেন।
তবে আপনার কথার মধ্যে “তুমি তো খুব খারাপ মানুষ!”—এটি বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা হিসেবে বলা হয়েছে; এটি কুফর নয়।
তবে “আমি আল্লাহর কাছে বলব যে আমি তার কাছে টাকা ধারী”—এই কথাটি যদি আল্লাহর কাছে মামলা করার বিষয়টিকে হালকা বা উপহাস করার উদ্দেশ্যে বলা হয়, তাহলে তা কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনি বলেছেন, উদ্দেশ্য উপহাস ছিল না; বরং বন্ধুত্বপূর্ণ ঠাট্টা ছিল। তাই সাধারণভাবে কুফর নয়।

৪. যদি কুফর না হয়ে থাকে, তাহলে কি শুধু ইস্তিগফার করে বিষয়টি ছেড়ে দেব, নাকি কোনো নির্দিষ্ট তওবা/কাফফারা প্রয়োজন?

যদি কুফর না হয়ে থাকে, তাহলে তওবা ও ইস্তিগফার করাই যথেষ্ট। নির্দিষ্ট কোনো কাফফারা নেই। তবে কর্তব্য হলো:

  • আল্লাহর কাছে sincere তওবা করা।
  • ভবিষ্যতে এ ধরনের হাসি-ঠাট্টা থেকে বিরত থাকা।
  • কিয়ামত, আখিরাত ও হক-বিচারের বিষয়গুলোকে সম্মানের সাথে আলোচনা করা।
  • যদি কারও হক নষ্ট হয়ে থাকে, তা আদায় করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।”
(সূরা নূর: ৩১)


গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. কিয়ামত, আখিরাত, হক-বিচার, নেক আমল হস্তান্তর—এসব বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করা উচিত নয়।
২. বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশেও দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বেপরোয়া কথা বলা মুমিনের শান নয়।
৩. যদি কখনো এমন কথা মুখ থেকে বের হয়ে যায়, সাথে সাথে ইস্তিগফার ও তওবা করা উচিত।
৪. ঋণ পরিশোধের বিষয়ে আপনার নিয়ত ও চেষ্টা প্রশংসনীয়। ঋণ আদায় করা অবশ্যই কর্তব্য।
৫. আপনার বন্ধুকে বিনয়ের সাথে বলুন যে এ ধরনের ঠাট্টা করা ঠিক হয়নি; ভবিষ্যতে এড়িয়ে চলুন।

উপসংহার:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী—উদ্দেশ্য উপহাস না থাকলে এটি কুফর নয়; বরং গুনাহ ও অনুচিত। তাই sincere তওবা ও ইস্তিগফার করুন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা থেকে বিরত থাকুন। নির্দিষ্ট কাফফারা নেই। তবে দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা থেকে সর্বদা সতর্ক থাকুন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.