শিরক করার পর ফরজ গোসল সম্পর্কে

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 5257
Questioner: Farida Yeasmin
Question Asked: 10 Sep 2026, 10:17 PM
Reviewed & Published: 10 Sep 2026, 10:21 PM
Views: 33
Tokens: 4,754
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

শিরক করলে তো ইমান থাকে না। তবে কারও সঙ্গে যদি এমন হয় যে সে শিরক করে ফেলে এবং তার উপর গোসল ওয়াজিব হয়ে যায়, তারপর সে যদি প্রথমে আল্লাহর নিকট পরবর্তিতে আর শিরক না করার ওয়াদা দেয়, শিরক পুরোপুরি পরিত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করে, লজ্জিত হয়, অনুতপ্ত হয়, নিজেকে এই কাজের জন্য ভৎসনা করে, শিরকের গুনাহ মাফ চায়, তারপর সে পূর্বনির্ধারিত ফরজ গোসল সম্পন্ন করে, তারপর তার মনে পড়ে যে সে এত কিছু করল কিন্তু কালিমা শাহাদাত পড়তে ভুলে গেছে আর তারপর সে তাও পড়ে নেয়, এখন আমার প্রশ্ন হলো যে তাকে কি এখন পুনরায় ফরজ গোসল করতে হবে??

Answer

শিরক করার পর ফরজ গোসল সম্পর্কে বিস্তারিত জবাব

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—কেউ যদি শিরক করে ফেলে, অতঃপর তাওবা করে, শিরক পরিত্যাগের প্রতিজ্ঞা করে, অনুতপ্ত হয়, ক্ষমা প্রার্থনা করে, তারপর ফরজ গোসল সম্পন্ন করে, কিন্তু পরে মনে পড়ে যে কালিমা শাহাদাত পড়তে ভুলে গেছে—তাহলে তাকে কি পুনরায় ফরজ গোসল করতে হবে?

মূল বিষয়: শিরক কি ইমান বিনষ্ট করে?

হ্যাঁ, শিরক করা মহা গুনাহ এবং তা ইমান বিনষ্টকারী কুফর। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না; এছাড়া অন্য সব গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" — (সূরা নিসা: ৪৮)

إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ

"নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম।" — (সূরা মায়িদা: ৭২)

শিরক করার পর কী করণীয়?

শিরক থেকে তাওবা করার জন্য শর্ত হলো:

  1. শিরক সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা
  2. অন্তর থেকে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া
  3. ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা
  4. (যদি কারও হক সম্পর্কিত হয় তবে তা ফিরিয়ে দেওয়া)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

"হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।" — (সূরা নূর: ৩১)

কালিমা শাহাদাত পড়া কি শর্ত?

গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা: কেউ যদি শিরক বা কুফর করে ফেলে, তারপর তাওবা করে—তাওবার জন্য কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করা শর্ত নয়। কেননা তাওবা মূলত অন্তরের কাজ—অনুশোচনা, পরিত্যাগ ও দৃঢ় সংকল্প। তবে কালিমা পড়া উত্তম ও মুস্তাহাব, এবং অনেক আলেমের মতে নতুন করে ইসলামে প্রবেশের ঘোষণা হিসেবে তা মুস্তাহাব।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন যে, মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) যখন ইসলামে ফিরে আসে, তখন তার ইসলাম গ্রহণের জন্য কালিমা উচ্চারণ করা জরুরি নয়; বরং ইসলামের স্বীকৃতি ও কুফর পরিত্যাগই যথেষ্ট। তবে কালিমা পড়া উত্তম।

মূল প্রশ্নের জবাব: পুনরায় গোসল করতে হবে কি?

উত্তর: না, পুনরায় ফরজ গোসল করতে হবে না।

এর কারণ নিম্নরূপ:

১. গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণ

শিরক বা কুফর করার কারণে গোসল ওয়াজিব হয় না। বরং গোসল ওয়াজিব হয় হায়েজ, নিফাস, জানাবাত (সহবাস/স্বপ্নদোষ), মৃত্যু ছাড়া অন্য কারণে নয়। শিরক করা বা কুফর করা গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণ নয়।

প্রশ্নে বলা হয়েছে "তার উপর গোসল ওয়াজিব হয়ে যায়"—সম্ভবত জানাবাত বা অন্য কোনো কারণে গোসল ওয়াজিব হয়েছিল। শিরক নিজে গোসল ওয়াজিবের কারণ নয়।

২. কালিমা না পড়ার প্রভাব

যেহেতু তাওবা অন্তরের কাজ এবং কালিমা পড়া তাওবার শর্ত নয়, তাই কালিমা না পড়ার কারণে তার তাওবা বাতিল হয়নি। আর তাওবা বাতিল না হলে নতুন করে গোসল ওয়াজিব হওয়ার কোনো কারণ নেই।

৩. ফরজ গোসল একবারই আদায় হবে

যে কারণে গোসল ওয়াজিব হয়েছিল (যেমন জানাবাত), তা একবার গোসল করলেই আদায় হয়ে যায়। পরবর্তীতে কালিমা পড়া বা না পড়া—এতে গোসল পুনরায় ওয়াজিব হয় না।

৪. ফিকহের মূলনীতি

রাদ্দুল মুহতারফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

الأصل أن الغسل لا يجب إلا بأحد أسباب موجبة له

"মূলনীতি হলো—গোসল ওয়াজিব হয় না, তবে তার ওয়াজিব হওয়ার কারণগুলোর একটি পাওয়া গেলে।"

গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণগুলো হলো:

  • জানাবাত (সহবাস, স্বপ্নদোষ)
  • হায়েজ
  • নিফাস
  • মৃত্যু (মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া)
  • ইসলাম গ্রহণ (কিছু ফকিহের মতে, তবে হানাফি মাজহাবে প্রসিদ্ধ নয়)

শিরক বা কুফর এগুলোর মধ্যে নেই।

তবে একটি সতর্কতা

যদি প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য হয়—শিরক করার কারণে তার ইমান চলে গিয়েছিল, আর ইসলামে ফিরে আসার পর নতুন করে ইসলাম গ্রহণকারীর জন্য গোসল ওয়াজিব হয়—তবে হানাফি মাজহাবে কাফির ইসলাম গ্রহণ করলে তার উপর গোসল ওয়াজিব নয় (এটি ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত)। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে মুস্তাহাব। তবে ওয়াজিব নয়।

আল-হিদায়া-তে আছে:

ولا يجب الغسل على الكافر إذا أسلم عند أبي حنيفة رحمه الله

"ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে কাফির ইসলাম গ্রহণ করলে তার উপর গোসল ওয়াজিব নয়।"

সুতরাং, শিরক থেকে তাওবা করার পর গোসল করা ওয়াজিব ছিল না—তা যদি সে করে থাকে, তবে তা নফল হিসেবে কবুল হবে। আর যদি জানাবাতের কারণে গোসল ওয়াজিব হয়ে থাকে, তবে তা একবার করাই যথেষ্ট।

চূড়ান্ত উত্তর

প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় তাকে পুনরায় ফরজ গোসল করতে হবে না। কারণ:

  1. শিরক করা গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণ নয়।
  2. তাওবার জন্য কালিমা শাহাদাত পড়া শর্ত নয়—অন্তরের অনুতাপ ও পরিত্যাগই যথেষ্ট।
  3. কালিমা না পড়ার কারণে তাওবা বাতিল হয় না।
  4. যে কারণে গোসল ওয়াজিব হয়েছিল (জানাবাত ইত্যাদি), তা একবার গোসল করলেই আদায় হয়ে গেছে।
  5. হানাফি মাজহাবে কাফির ইসলাম গ্রহণ করলে গোসল ওয়াজিব নয়।

তবে সে যেহেতু কালিমা পড়তে ভুলে গিয়েছিল এবং পরে পড়ে নিয়েছে—এটি উত্তম কাজ। তার তাওবা সহিহ হয়েছে। তাকে আর গোসল করতে হবে না। তবে ভবিষ্যতে সতর্ক থাকা ও ইস্তিগফার করা কর্তব্য।

রেফারেন্স:

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
  • ফাতাওয়া আলমগিরি
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)
  • বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভি)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.