শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমতের সীমা এবং স্বামী বিদেশে থাকাকালীন বাবার বাসায় অবস্থান।
Family Life · Hanafi
Question
আমি সদ্য বিবাহিতা। আমার বিয়ের পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে।বিয়ের এক মাসের মধ্যে স্বামী পড়াশোনার জন্য অস্ট্রেলিয়া চলে যান। বর্তমানে আমি সৎ শ্বশুর এবং শাশুড়ির সাথে তাদের ফ্ল্যাটে থাকছি। এবং সেখানে একই ফ্ল্যাটে আমার ভাসুর আর তার স্ত্রী থাকেন।ভাসুরের চারিত্রিক ত্রুটির কথা বিয়ের পর আমাকে জানানো হয়েছে।
সেখানে শ্বশুর শাশুড়ির খেদমতের জন্য খাদেমা থাকা সত্ত্বেও ফজরের পর থেকে চা বানানো, খাবার সাজানো, শাশুড়ির যত্ন , স্বামীর মামার জন্য নাস্তা বানানো ইত্যাদি কাজ প্রতিদিন বাধ্যতামূলক ভাবে আমাকে করতে হয়,নাহলে শাশুড়ি কথা শোনান এবং এতে স্বামী আমাকে কাজের জন্য চাপ দেন। এক্ষেত্রে আমার পর্দা লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বামীকে জানানো হলে তিনি হিজাব নিকাবৎপড়ে আমাকে রান্না ঘরে কাজ করতে বলেন যা এক প্রকার অসম্ভব।ইলম এবং একাডেমিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না যা বিয়ের পূর্বে প্রতিশ্রুত ছিল। আবার আমার রুমে স্বামীর সাথে শাশুড়ি কথাও বলতে দেননা তিনি বেশ বিরক্ত হন। কিন্তু এতে আমার মানসিক চাপ বাড়লেও স্বামীর সমস্যা নেই।
বিয়ের পূর্বে স্বামী আমার বাবাকে বলেছিলেন আমি বেশিরভাগ সময় বাবার বাসায় থাকবো শ্বশুর বাড়িতে আসা যাওয়া থাকবে। কিন্তু এখন তার মা- সৎ বাবা এবং সংসারের কাজের জন্য তিনি সে কথা অস্বীকার করেন। আমার কষ্টের কথা কাজের চাপের কথা জানালে স্বামী বলেন তার সৎ বাবা বিশেষ করে মার সেবা করা নাকি তাদের হক আমার ইহসান না।
আমার মা বাবাকে সাহায্য করতে চাইলে তিনি বলেন,আমি মেয়ে আমার বাবা মায়ের জন্য কিছু করার নেই শুধু যেন দুআ করি। কিন্তু তার বাবা মায়ের খেদমতে তিনি আমাকে কোনো ছাড় দেয়না।
এক্ষেত্রে শায়েখ-
১/স্বামী বিদেশ থাকাকালীন আমার বাবার বাসায় থাকাটা কী আমার ইসলামী আইনের বিপরীত দাবি?(স্বামী বলেছেন হ্যাঁ)
২/শাশুড়ির এসকল খেদমতে কী আমি বাধ্য? যেখানে আমার মাকেই আমি সাহায্য করতে পারছি না বা স্বামীর সহায়তাও পাচ্ছি না?
জাযাকাল্লাহু খাইরান
Answer
উত্তর: শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমতের সীমা এবং স্বামী বিদেশে থাকাকালীন বাবার বাসায় অবস্থান
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে নারীর অধিকার, দাম্পত্য জীবনের দায়িত্ব এবং পিতা-মাতার খেদমতের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
মূলনীতি: স্ত্রীর ভরণপোষণ ও আবাসন স্বামীর দায়িত্ব
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"আর তাদের (স্ত্রীদের) জন্য তোমাদের (স্বামীদের) উপর রয়েছে তাদের ভরণপোষণ ও পোশাকের দায়িত্ব ন্যায়সংগতভাবে।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
"তোমরা তাদেরকে যেখানে নিজেরা থাকো, সেখানেই থাকতে দাও, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।" — (সূরা আত-তালাক: ৬)
হানাফী ফিকহের মূলনীতি (আল-হিদায়া, রাদ্দুল মুহতার):
- স্ত্রীর নফাকা (ভরণপোষণ), আবাসন এবং পোশাকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বামীর।
- স্ত্রীকে স্বামীর বাইরে অন্য কারো (শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাসুর, দেবর) খেদমত করতে বাধ্য করা শরীয়তসম্মত নয়।
- স্ত্রীর নিজের পিতা-মাতার খেদমত করা তার নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব, তবে তা স্বামীর অনুমতির সাপেক্ষে (যদি স্বামীর হক ক্ষুণ্ণ না হয়)।
প্রশ্ন ১: স্বামী বিদেশে থাকাকালীন স্ত্রী কি বাবার বাসায় থাকতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ, শরীয়তসম্মত কারণ থাকলে স্ত্রী বাবার বাসায় থাকতে পারে। স্বামীর "না" বলা ইসলামী আইনের দাবি নয়; বরং এটি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।
দলিল:
১. হানাফী ফিকহের মূলনীতি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, স্বামী যদি স্ত্রীর নফাকা ও আবাসনের ব্যবস্থা না করে বা স্ত্রীকে এমন পরিবেশে রাখে যেখানে তার দ্বীন, ইজ্জত ও মানসিক শান্তি বিপন্ন, তাহলে স্ত্রী নিজ পিতার বাসায় আশ্রয় নিতে পারে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭২; ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬৩)
২. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী):
"স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ে রেখে স্বামী বিদেশে থাকলে, যদি সেখানে পর্দার লঙ্ঘন, গায়রে মাহরামের সাথে অবাধ মেলামেশা বা মানসিক নির্যাতনের আশঙ্কা থাকে, তাহলে স্ত্রীর জন্য নিজ পিতার বাসায় থাকা জায়েয। স্বামী বাধা দিতে পারবে না।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩২-৩৩৪)
৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া (হাকীমুল উম্মত থানভী রহ.):
"স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত ফরজ নয়। এটি ইহসান ও সওয়াবের কাজ। যদি স্বামী বিদেশে থাকে এবং স্ত্রী নিজ পিতার বাসায় থাকতে চায়, তবে শরীয়ত তাকে বাধা দেয় না—বিশেষত যখন শ্বশুরালয়ে গায়রে মাহরাম (ভাসুর) এর উপস্থিতি রয়েছে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৮৯)
৪. ভাসুরের উপস্থিতি: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"ভাসুর (দেবর) তো মৃত্যু।" (অর্থাৎ তার সাথে নির্জনে থাকা বা অবাধ মেলামেশা অত্যন্ত বিপজ্জনক) — (সহীহ বুখারী: ৫২৩২, সহীহ মুসলিম: ২১৭২)
আপনার ভাসুরের চারিত্রিক ত্রুটির কথা জানা আছে। এমন অবস্থায় একই ফ্ল্যাটে তার সাথে থাকা আপনার জন্য শরীয়তসম্মতভাবে নিরাপদ নয়। স্বামী যদি আপনাকে সেখানে থাকতে বাধ্য করে, তবে তা তার দায়িত্বে অবহেলা।
সিদ্ধান্ত: স্বামী বিদেশে থাকাকালীন আপনি বাবার বাসায় থাকতে পারেন। স্বামীর "না" বলা ইসলামী আইনের দাবি নয়; বরং আপনার নিরাপত্তা ও দ্বীনের হেফাজতের স্বার্থে বাবার বাসায় থাকা জায়েয বরং কর্তব্য।
প্রশ্ন ২: শাশুড়ির খেদমতে আমি কি বাধ্য?
উত্তর: না, শাশুড়ির খেদমত আপনার উপর শরীয়তসম্মতভাবে বাধ্যতামূলক (ফরজ বা ওয়াজিব) নয়। এটি ইহসান ও সওয়াবের কাজ, যা আপনার সামর্থ্য ও স্বেচ্ছার উপর নির্ভরশীল।
দলিল:
১. কুরআন:
"আর তোমরা পিতা-মাতার সাথে ইহসান (সদাচরণ) করো।" (সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)
এই আয়াত সন্তানদের নিজ পিতা-মাতার প্রতি ইহসানের নির্দেশ দেয়। পুত্রবধূর উপর শাশুড়ির খেদমতের কোনো বাধ্যবাধকতা কুরআনে নেই।
২. হাদীস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক দায়িত্বশীলকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।" (সহীহ বুখারী: ৮৯৩)
এখানে স্বামী তার স্ত্রীর অধিকার রক্ষার জন্য দায়ী। স্ত্রী শাশুড়ির খেদমতের জন্য দায়ী নয়।
৩. হানাফী ফিকহ:
- আল-হিদায়া: "স্ত্রীর উপর শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা ওয়াজিব নয়।" (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামী): "স্ত্রীকে শ্বশুরালয়ের কাজকর্মে বাধ্য করা জুলুম। সে শুধু স্বামীর খেদমত করতে বাধ্য, তাও সামর্থ্য অনুযায়ী।" (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৫৭৪)
- ফাতাওয়া আলমগীরী: "পুত্রবধূর উপর শাশুড়ির খেদমত ফরজ নয়।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, খণ্ড ১, পৃ. ৫৬৪)
- বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.): "স্ত্রীর দায়িত্ব শুধু স্বামীর খেদমত। শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা তার জন্য আবশ্যক নয়।" (বাহিশতী জেওর, নিকাহ অধ্যায়)
৪. ফাতাওয়া উসমানী:
"পুত্রবধূ শাশুড়ির খেদমত করতে বাধ্য নয়। হ্যাঁ, যদি স্বেচ্ছায় করে তবে সওয়াব পাবে। কিন্তু স্বামী বা শাশুড়ি জোর করতে পারে না।" (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃ. ৩৩৫)
৫. ইমদাদুল ফাতাওয়া:
"শাশুড়ির সেবা করা পুত্রবধূর উপর لازم নয়। এটি নফল ইবাদতের মতো—করলে সওয়াব, না করলে গুনাহ নেই।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ২৯০)
আপনার করণীয়:
| বিষয় | বিধান | |------|------| | শাশুড়ির খেদমত | বাধ্যতামূলক নয় (ইহসান/নফল) | | স্বামীর খেদমত | সামর্থ্য অনুযায়ী কর্তব্য | | নিজ পিতা-মাতার খেদমত | কর্তব্য (স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে) | | গায়রে মাহরাম (ভাসুর) থেকে পর্দা | ফরজ | | পড়াশোনার সুযোগ | বিয়ের পূর্বে প্রতিশ্রুতি থাকলে তা নৈতিক দায়িত্ব |
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও সতর্কতা
১. পর্দা লঙ্ঘনের বিষয়টি গুরুতর
আপনার স্বামী আপনাকে হিজাব-নিকাব পরে রান্নাঘরে কাজ করতে বলছেন—এটি অসম্ভব ও অমানবিক। কারণ:
- রান্নাঘরে আগুন, গরম পানি, তেল—নিকাবসহ কাজ করা বিপজ্জনক।
- ভাসুর একই ফ্ল্যাটে থাকলে পর্দা রক্ষা করা কঠিন।
- সমাধান: ভাসুরের সাথে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অথবা আপনি বাবার বাসায় চলে যাওয়া।
২. মানসিক নির্যাতন
শাশুড়ির কথা শোনানো, স্বামীর চাপ—এগুলো ইসলামী দৃষ্টিতে জুলুম। আল্লাহ বলেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদেরকে হিদায়াত দেন না।" (সূরা আল-মায়িদা: ৫১)
৩. স্বামীর সাথে আলোচনা
স্বামীকে বিনয়ের সাথে বুঝান:
- আপনার নিরাপত্তা ও দ্বীনের হেফাজত তার দায়িত্ব।
- শাশুড়ির খেদমত ফরজ নয়—এটি ইহসান।
- আপনার পড়াশোনার অধিকার বিয়ের পূর্বে প্রতিশ্রুত ছিল।
- ভাসুরের কারণে পর্দার সমস্যা—আলাদা বাসস্থান প্রয়োজন।
৪. প্রয়োজনে হক্কানী আলেমের শরণাপন্ন হোন
স্থানীয় বিশ্বস্ত মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে পারিবারিক সালিশের ব্যবস্থা করুন।
৫. ধৈর্য ও দুআ
"হে ঈমানদারগণ! ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |------|------| | ১. স্বামী বিদেশে থাকাকালীন বাবার বাসায় থাকা কি ইসলামী আইনের বিপরীত? | না, বিপরীত নয়। বরং নিরাপত্তা ও পর্দার স্বার্থে বাবার বাসায় থাকা জায়েয ও কর্তব্য। স্বামীর "না" বলা শরীয়তসম্মত দাবি নয়। | | ২. শাশুড়ির খেদমতে আমি কি বাধ্য? | না, বাধ্য নন। এটি ইহসান ও নফল। স্বামী বা শাশুড়ি জোর করতে পারে না। |
উপসংহার: আপনার উপর শাশুড়ির খেদমত ফরজ নয়। স্বামী বিদেশে থাকলে এবং শ্বশুরালয়ে গায়রে মাহরামের উপস্থিতি থাকলে আপনি বাবার বাসায় থাকতে পারেন। স্বামীর উচিত আপনার নিরাপত্তা, দ্বীন ও পড়াশোনার অধিকার রক্ষা করা। আল্লাহ আপনার সমস্যা সহজ করে দিন এবং উত্তম সমাধান দান করুন। আমীন।
ওয়াল্লাহু আ'লাম বিস-সওয়াব