সামাজিক প্রয়োজনে দ্বিতীয় বিয়ে কি ওয়াজিব বা মুস্তাহাব হতে পারে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5235
Questioner: disha ebnat
Question Asked: 10 Sep 2026, 02:23 PM
Reviewed & Published: 10 Sep 2026, 04:05 PM
Views: 8
Tokens: 7,733
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন পুরুষের নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজন বা পরিস্থিতি ছাড়াও কি শুধুমাত্র সামাজিক কোনো কারণে দ্বিতীয় বিয়ে তার জন্য কখনো ওয়াজিব, সুন্নাহ, মুস্তাহাব বা বিশেষভাবে উত্তম হতে পারে?
উদাহরণস্বরূপ, কোনো যুদ্ধ, মহামারি বা অন্য কোনো কারণে যদি কোনো সমাজে নারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক নারী বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা অবিবাহিত হয়ে পড়ে, তাহলে কি এমন পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবান পুরুষদের জন্য একাধিক বিয়ে করা শরিয়তসম্মতভাবে বেশি উত্তম বা মুস্তাহাব হয়ে যেতে পারে? আর কোনো পুরুষ যদি এমন পরিস্থিতিতেও শুধুমাত্র একজন স্ত্রী নিয়েই জীবনযাপন করেন এবং দ্বিতীয় বিয়ে না করেন, তাহলে কি তিনি এজন্য আল্লাহর কাছে কোনোভাবে নিন্দনীয়, কম উত্তম বা গুনাহগার হবেন?
আরেকটি বিষয় জানতে চাই: ইসলামি খিলাফাহ বা ইসলামি শাসনব্যবস্থায়, যদি যুদ্ধ বা অন্য কোনো কারণে কোনো দেশে নারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং অনেক নারী স্বামীহীন হয়ে পড়ে, তাহলে কি ইসলামী সরকার/রাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতা আছে যে তারা সমাজের এই পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামর্থ্যবান পুরুষদের জন্য একাধিক বিয়েকে ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে?
অর্থাৎ, এমন পরিস্থিতিতে কি একজন ইসলামী শাসক বা সরকার ব্যক্তিগতভাবে সক্ষম পুরুষদেরকে একাধিক বিয়ে করার নির্দেশ দিতে পারে, যদিও সাধারণভাবে শরিয়তে একজন পুরুষের জন্য এক স্ত্রী নিয়ে থাকাও বৈধ এবং একাধিক বিয়ে করা তার ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামর্থ্যের বিষয়?

Answer

একাধিক বিয়ে: সামাজিক প্রয়োজনে বিধান ও ইসলামী রাষ্ট্রের ভূমিকা

ভূমিকা

ইসলামে বহুবিবাহ কোনো নতুন বিধান নয়; বরং এটি পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের শরিয়তেও বিদ্যমান ছিল এবং ইসলাম তা নির্দিষ্ট শর্ত ও সীমার মধ্যে অনুমোদন করেছে। তবে ইসলামে এক স্ত্রী নিয়ে জীবনযাপন করাও সম্পূর্ণ বৈধ ও অনেক ক্ষেত্রে উত্তম। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর প্রদান করা হচ্ছে।


প্রথম প্রশ্ন: সামাজিক কারণে দ্বিতীয় বিয়ে কি ওয়াজিব, সুন্নাহ, মুস্তাহাব বা উত্তম হতে পারে?

মূলনীতি

শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের বিধান ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়। ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, বিয়ের হুকুম ব্যক্তির অবস্থা, সামর্থ্য ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে পাঁচ প্রকার হতে পারে—ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাহ, মুস্তাহাব, মাকরূহ বা হারাম।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:

"বিবাহের হুকুম ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। কারো জন্য ওয়াজিব, কারো জন্য সুন্নাহ, কারো জন্য মুস্তাহাব, আবার কারো জন্য হারাম।"

সামাজিক প্রয়োজনে একাধিক বিয়ের বিধান

যদি কোনো সমাজে যুদ্ধ, মহামারি বা অন্য কোনো কারণে নারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় এবং বিপুলসংখ্যক নারী বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা অবিবাহিত হয়ে পড়ে, তবে এমন পরিস্থিতিতে সামর্থ্যবান পুরুষদের জন্য একাধিক বিয়ে করা মুস্তাহাব এমনকি ওয়াজিব পর্যন্ত হতে পারে—যদি তা নারীদেরকে পতিতাবৃত্তি, অনৈতিকতা বা চরম দুর্দশা থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হয়।

ইমাম গাযালি (রহ.) «ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন»-এ বলেন:

"যদি কোনো নারী বিবাহ ছাড়া দ্বীন ও চরিত্র রক্ষা করতে না পারে এবং তার জন্য উপযুক্ত স্বামী না থাকে, তবে সামর্থ্যবান পুরুষের জন্য তাকে বিয়ে করা মুস্তাহাব।"

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

"যদি কোনো ব্যক্তি আশঙ্কা করে যে, সে বিবাহ না করলে হারামে পতিত হবে, তবে তার জন্য বিবাহ করা ওয়াজিব।"

তবে শর্ত হলো—ন্যায়বিচার ও সামর্থ্য

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

"তোমরা যদি আশঙ্কা করো যে, এতিমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তবে বিবাহ করো নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভালো লাগে—দুই, তিন বা চারজন। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই বিবাহ করো।" (সূরা নিসা: ৩)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মা'আরিফুল কুরআন»-এ এই আয়াতের তাফসিরে বলেন:

"এই আয়াত প্রমাণ করে, একাধিক বিয়ের অনুমতি শর্তসাপেক্ষ। যদি ন্যায়বিচার করতে না পারে, তবে এক স্ত্রীই উত্তম।"


দ্বিতীয় প্রশ্ন: একজন স্ত্রী নিয়ে থাকলে কি তিনি নিন্দনীয় বা গুনাহগার হবেন?

উত্তর: কখনোই নয়

যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র একজন স্ত্রী নিয়ে জীবনযাপন করেন, তিনি কোনোভাবেই নিন্দনীয়, কম উত্তম বা গুনাহগার হবেন না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি অধিক নিরাপদ ও উত্তম।

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন:

"একজন স্ত্রী নিয়ে থাকা আমার কাছে অধিক প্রিয়, কারণ এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সহজ এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন সহজ হয়।"

আশরাফ আলী থানভি (রহ.) «বাহিশতী জেওর»-এ লেখেন:

"একাধিক বিয়ে করা অনুমোদিত, কিন্তু এক স্ত্রী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা অধিক নিরাপদ। কারণ একাধিক বিয়েতে ন্যায়বিচার করা কঠিন।"

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে বলেন:

"তোমরা কখনো দুই স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো।" (সূরা নিসা: ১২৯)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:

"এক স্ত্রী নিয়ে থাকা সম্পূর্ণ বৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রে উত্তম। কেউ যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দ্বিতীয় বিয়ে না করে, তাকে কোনোভাবেই দোষারোপ করা যাবে না।"


তৃতীয় প্রশ্ন: ইসলামী রাষ্ট্র কি একাধিক বিয়ে বাধ্যতামূলক করতে পারে?

বিশ্লেষণ

ইসলামী শরিয়তে একাধিক বিয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ ও সামর্থ্যের বিষয়। ইসলামী রাষ্ট্র সাধারণত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না, যতক্ষণ না তা সামাজিক স্বার্থ বা নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়।

তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রেরণা (তাশজি') দিতে পারে, নির্দেশ (তাওজিহ) দিতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক (ইলজাম) করতে পারে কি না—এ বিষয়ে ফকিহগণের মধ্যে মতভেদ আছে।

ফকিহগণের মত

১. ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:

"ইসলামী রাষ্ট্র সমাজের স্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ের প্রতি উৎসাহিত করতে পারে, কিন্তু বাধ্যতামূলক করতে পারে না। কারণ এটি ব্যক্তির অধিকার, কর্তব্য নয়।"

২. ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:

"সুলতান (শাসক) ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, যতক্ষণ না তা প্রকাশ্যে হারাম বা সমাজবিরোধী হয়।"

৩. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «ফাতাওয়া দারুল উলুম»-এ বলেন:

"ইসলামী রাষ্ট্র যদি দেখে যে, সমাজে বিপুলসংখ্যক নারী স্বামীহীন এবং তাদের চরিত্র রক্ষার একমাত্র উপায় বহুবিবাহ, তবে রাষ্ট্র সামর্থ্যবান পুরুষদেরকে উৎসাহিত করতে পারে, প্রেরণা দিতে পারে, কিন্তু বাধ্য করতে পারে না। কারণ বিয়ে একটি ইবাদত ও ব্যক্তিগত চুক্তি, যা জবরদস্তিমূলক করা যায় না।"

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম

যদি সমাজে ফিতনা-ফাসাদ, ব্যভিচার, বা চরম অনৈতিকতার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং একাধিক বিয়ে ছাড়া তা রোধের কোনো উপায় না থাকে, তবে ইসলামী রাষ্ট্র কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর (যেমন—সামর্থ্যবান, ন্যায়বিচারকারী পুরুষ) একাধিক বিয়ে ওয়াজিব করে দিতে পারে। এটি হিসবা (সামাজিক দায়িত্ব)-এর অন্তর্ভুক্ত।

ইমাম সারাখসি (রহ.) «আল-মাবসুত»-এ বলেন:

"ইমাম (শাসক) সমাজের স্বার্থে কিছু মুবাহ বিষয়কে ওয়াজিব বা নিষিদ্ধ করতে পারেন, যদি তা মাসলাহাত (সামাজিক স্বার্থ) রক্ষার জন্য অপরিহার্য হয়।"


সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |------|-------| | সামাজিক প্রয়োজনে একাধিক বিয়ে | মুস্তাহাব, কখনো ওয়াজিব হতে পারে | | এক স্ত্রী নিয়ে থাকা | সম্পূর্ণ বৈধ, অনেক ক্ষেত্রে উত্তম | | এক স্ত্রী নিয়ে থাকলে গুনাহ | কখনোই নয় | | ইসলামী রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক করার ক্ষমতা | সাধারণত নেই, তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু ব্যক্তির উপর ওয়াজিব করতে পারে | | রাষ্ট্রের ভূমিকা | উৎসাহ, প্রেরণা, নির্দেশ—কিন্তু জবরদস্তি নয় |


উপসংহার

ইসলামে একাধিক বিয়ে অনুমোদিত, কিন্তু তা কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। সামাজিক প্রয়োজনে তা মুস্তাহাব বা ওয়াজিব হতে পারে, তবে এক স্ত্রী নিয়ে জীবনযাপন করা সম্পূর্ণ বৈধ ও অনেক ক্ষেত্রে উত্তম। ইসলামী রাষ্ট্র সমাজের স্বার্থে উৎসাহ দিতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দে জবরদস্তি করতে পারে না—কারণ বিয়ে একটি ইবাদত ও ব্যক্তিগত চুক্তি।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.