সালাতে সিজদার সময় স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার চিন্তা মনে এলে এবং মুখ দিয়ে বের হওয়া নিয়ে সন্দেহ হলে কি তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
সালাতে সিজদা দেবার সময় স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনটি বিচ্ছেদের তীব্র চিন্তা মনে চলে আসে,এমন সময় তো সিজদাহ এর মধ্যে ছিলাম।এখন আল্লাহ না করুক এই বিচ্ছেদের বাক্যগুলো বের হয়েছে কিনা মুখ দিয়ে যা আমি নিশ্চিত নই।
কিছুতেই নিশ্চিত হতে পারছি না এমন পরিস্থিতিতে বিচ্ছেদের সেই চিন্তার বাক্য মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল কিনা?কারণ অই সময় যেহেতু সিজদায় ছিলাম মুখ তো চলছিল।
এই পরিস্থিতিতে বিবাহ সম্পর্ক কি বহাল থাকবে?
মারাত্মক পেরেশানীতে আছি।
নিশ্চিত হব কিভাবে যে কোন কথা মুখ দিয়ে বের হয়েছে কিনা মুখ দিয়ে কারণ ওই সময় তো সিজদাহ তে ছিলাম।
হুজুর পরামর্শ ও সমাধান দেবেন।
প্রশ্ন:
১.আমাদের বিবাহের কি কোন সমস্যা হয়েছে?
২.আমাদের কি সম্পর্ক চিরতরে হারাম হয়ে গেছে?
৩.এই অবস্থায় কি করব?দাম্পত্য চালিয়ে যাব?
৪.যদি মুখে বলেও ফেলি যা সম্পর্কে আমি অনিশ্চিত,সারাজীবন যিনার গোনাহ হতে থাকবে?
পেরেশানিতে শেষ হয়ে যাচ্ছি।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। ইসলামী আইনে তালাক (বিচ্ছেদ) শুধুমাত্র তখনই কার্যকরী হয় যখন তা স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয় বা এমন শব্দ ব্যবহার করা হয় যা থেকে তালাকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায়। শুধুমাত্র মনে মনে চিন্তা করা বা অন্তরে সংকল্প করাকে তালাক হিসেবে গণ্য করা হয় না।
আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর:
১. আমাদের বিবাহের কি কোন সমস্যা হয়েছে? যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে শব্দগুলো মুখ দিয়ে বের হয়েছে কি না, এবং ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী সন্দেহের ভিত্তিতে তালাক কার্যকরী হয় না, তাই আপনার বিবাহ বহাল থাকবে। তালাক কার্যকরী হওয়ার জন্য শর্ত হলো স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা বা ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানো (যদি কেউ কথা বলতে অক্ষম হয়)। যেহেতু আপনি নিজেই নিশ্চিত নন, তাই আপনার বিবাহে কোনো সমস্যা হয়নি।
২. আমাদের কি সম্পর্ক চিরতরে হারাম হয়ে গেছে? না, সম্পর্ক হারাম হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত তালাকের শব্দ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাহ সম্পূর্ণ বৈধ থাকবে। আপনি যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে শয়তানের প্ররোচনাকে গুরুত্ব দেবেন না। শয়তান মানুষকে এমন খেয়ালী চিন্তার মাধ্যমে বিবাহ-বিচ্ছেদের দিকে ধাবিত করে।
৩. এই অবস্থায় কি করব? দাম্পত্য চালিয়ে যাব? হ্যাঁ, আপনি স্বাভাবিকভাবে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাবেন। যেহেতু তালাক কার্যকরী হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই, তাই আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধ। এই ধরনের ওয়াসওয়াসা (শয়তানি প্ররোচনা) থেকে বাঁচতে হলে:
- সালাত, যিকির এবং কুরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হোন।
- "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন।
- এই বিষয়ে বারবার চিন্তা না করে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন।
৪. যদি মুখে বলেও ফেলি যা সম্পর্কে আমি অনিশ্চিত, সারাজীবন যিনার গোনাহ হতে থাকবে? যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে মুখ দিয়ে বেরিয়েছে কি না, তাই এটি একটি সন্দেহ মাত্র। সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো গুনাহ বা তালাক কার্যকরী হয় না। ইসলামের নিয়ম হলো, নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কিছুকে প্রমাণিত ধরা যাবে না। তাই আপনি যিনার গুনাহের ভয় পাবেন না। তবে যদি ভবিষ্যতে আপনি স্পষ্টভাবে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেন, তাহলে সেটি কার্যকরী হবে এবং তখন আপনাকে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
উপসংহার: আপনার বিবাহ সম্পূর্ণ বৈধ এবং বহাল আছে। শয়তানের প্ররোচনায় ভীত না হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন। ইসলামে সন্দেহ দূর করার নিয়ম হলো, নিশ্চিত জ্ঞান না থাকলে সন্দেহকে আমলে না আনা। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এই পেরেশানি থেকে মুক্তি দান করুন।
রেফারেন্স:
- সূরা আন-নূর (২৪:৩১) - "বলুন, মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।"
- সূরা আল-বাকারা (২:২৮৬) - "আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত burdens চাপিয়ে দেন না।"
- সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৬৮ - "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে মনে যে খেয়াল আসে তা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না সে তা উচ্চারণ করে বা কাজ করে।"
- ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৫ - "তালাকের ক্ষেত্রে সন্দেহ কার্যকরী হয় না, যতক্ষণ না স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।"
- রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৪৩ - "মনে মনে তালাকের নিয়ত করলে তালাক পতিত হয় না।"