মেয়েদের হিজরত ও পরিবার ত্যাগ করার বিধান কি?
Family Life · Hanafi
Question
পরিবারের সবার আমাকে অপছন্দ করে,,আমাকে দাম কম দেয়,,ছোট করে এই জন্য আমিও রেগে যাই,, অনেক ঝামেলা হয়,,আমি একজন মেয়ে।আমার বয়স ২৭। আমার বিয়ে হচ্ছে না।বাড়ি থেকে চায় আমি এতো পর্দা না করি জব করতে বলে,,,আমার বিয়েও সহজে হবে না কারণ আমার শ্বেতি রোগ আছে।পরিবারে দ্বিন মানতে কষ্ট হয়,,মাদ্রাসায় ক্লাস করা পছন্দ করে না,,,তিলাওয়াত, আমাকে যত ভাবে সম্ভব ছোট করে আমার পরিবারের লোকজন। এই অবস্থায় আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া যাবে?আমার যাওয়ার জায়গা নাই।
Answer
মেয়েদের হিজরত ও পরিবার ত্যাগ করার বিধান
উত্তর
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পারিবারিক সমস্যা ও কষ্টের কথা জানতে পেরে আমরা সত্যিই দুঃখিত। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন। আমিন।
হিজরতের শর্তাবলী
ইসলামে হিজরত বলতে সাধারণত এমন একটি স্থান ত্যাগ করে অন্য স্থানে চলে যাওয়াকে বোঝায় যেখানে দ্বীন পালনে বাধা থাকে। তবে মেয়েদের জন্য হিজরত বা পরিবার ত্যাগ করার ক্ষেত্রে ইসলামী বিধান অত্যন্ত সতর্কতামূলক।
মেয়েদের জন্য হিজরতের শর্ত:
১. মাহরাম পুরুষের সঙ্গী থাকা আবশ্যক - হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, একজন মহিলার জন্য দূরপাল্লার সফর (প্রায় ৭৮ কিলোমিটারের বেশি) মাহরাম পুরুষ ছাড়া জায়েয নয়। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৪)
২. নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া - গন্তব্য স্থানে নিরাপত্তা ও দ্বীন পালনের পরিবেশ থাকতে হবে।
৩. বৈধ কারণ থাকা - দ্বীন পালনে চরম বাধা বা জীবন-সম্পদের ভয় থাকতে হবে।
আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
আপনি উল্লেখ করেছেন:
- পরিবারের লোকজন আপনাকে অপছন্দ করে ও ছোট করে
- পর্দা না করার জন্য চাপ দেয়
- মাদ্রাসায় ক্লাস করতে বাধা দেয়
- আপনার শ্বেতি রোগের কারণে বিয়ে নিয়ে চিন্তা আছে
- আপনার যাওয়ার জায়গা নেই
ইসলামী নির্দেশনা
১. ধৈর্য ধারণ করা:
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করতে চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন।" (সহীহ বুখারী, ১৪৬৯)
২. পরিবার ত্যাগ করার পূর্বশর্ত:
যেহেতু আপনার যাওয়ার জায়গা নেই এবং মাহরাম সঙ্গীও নেই, তাই বর্তমান অবস্থায় ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়া উচিত হবে না। কারণ:
- এটি আপনার জন্য অধিকতর ক্ষতির কারণ হতে পারে
- নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে
- ইসলাম নারীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়
৩. বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ:
- দ্বীনী পরিবেশ তৈরি করুন: নিজের ঘরেই নামাজ, তিলাওয়াত, জিকিরের মাধ্যমে দ্বীনী পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করুন
- ভালো বান্ধবী তৈরি করুন: দ্বীনদার বান্ধবীদের সাথে সম্পর্ক রাখুন
- স্থানীয় আলেমের সাথে যোগাযোগ: আপনার এলাকার কোনো আলেম বা দ্বীনদার পরিবারের সাথে পরামর্শ করুন
- অনলাইন দ্বীনী শিক্ষা: মাদ্রাসায় যেতে না পারলে অনলাইনে দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করুন
৪. পর্দার ব্যাপারে:
পর্দা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। পরিবারের চাপে পর্দা ত্যাগ করা জায়েয নয়। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে পর্দা পালনের চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন।
গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহঃ) বলেছেন: "যখন কোনো মুসলিম নারী দ্বীন পালনের জন্য ঘর ত্যাগ করতে চায়, তখন তাকে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে না এবং সে কোনো ফিতনার সম্মুখীন হবে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৬০৪)
সর্বশেষ পরামর্শ
১. বর্তমানে ঘর ত্যাগ করবেন না, কারণ আপনার যাওয়ার নিরাপদ জায়গা নেই ২. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন ৩. নিজের দ্বীনী আমল জোরদার করুন - নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির ৪. বিয়ে নিয়ে হতাশ হবেন না - শ্বেতি রোগ কোনো বাধা নয়, আল্লাহর কাছে দুআ করুন ৫. স্থানীয় দ্বীনদার পরিবার বা আলেমের সাহায্য নিন যারা আপনাকে দ্বীন পালনে সহযোগিতা করতে পারেন
আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তম পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য, সাহস ও উত্তম সমাধান দান করুন। আমিন।
উত্তর প্রদানে: দারুল ইফতা, দারুল উলুম দেওবন্দের নীতিমালা অনুসরণে এবং হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে।