শিরক হচ্ছে কিনা
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
শিরক হচ্ছে কিনা — জ্বীন-জাদু নিরাময়ের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা মানা প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার এক আত্মীয় জ্বীন-জাদু সমস্যায় আক্রান্ত। একজন হুজুর (আমিল) তাদের কিছু কাজকর্ম করতে বলেন, পানি পড়ে ব্যবহার করতে দেন। তিনি আরও বলেন যে, ২১ দিন বাসা থেকে বের না হতে এবং প্রথম তিনদিন রাত ১২টার পর মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে। এগুলো মানলে শিরক হবে কিনা — এই বিষয়ে জানতে চেয়েছেন।
উত্তর
শিরক কী?
শিরক হলো আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে শরিক করা — ইবাদত, দুআ, ভয়-ভক্তি, তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতায়। ইসলামের পরিভাষায় শিরক হলো আল্লাহর এককত্ব ও তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতায় বিশ্বাসের পরিপন্থী কোনো কাজ করা।
উল্লেখিত নির্দেশনাগুলোর পর্যালোচনা
১. ২১ দিন বাসা থেকে না বের হওয়া: এটি একটি সাধারণ নির্দেশনা। জ্বীন-জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কিছু দিন বিশ্রাম নিতে বলা, বাসায় থাকতে বলা — এটি শিরক নয়। তবে এটি শরয়ী কোনো বিধান নয়, বরং আমিলের নিজস্ব পরামর্শ। ইসলামে কোনো ব্যক্তিকে ২১ দিন বাসা থেকে না বের হওয়ার নির্দেশ নেই। তবে এটি মানলে শিরক হবে না, কারণ এতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা হয় না।
২. রাত ১২টার পর মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা: এটিও শিরক নয়। এটি একটি সাধারণ নিয়ম-কানুন বা পরামর্শ মাত্র। মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা বা না রাখার সাথে শিরকের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে প্রশ্ন হলো — এই নির্দেশনা মানা কি জরুরি? ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো মানা জরুরি নয়, তবে মানলে শিরক হবে না।
৩. পানি পড়ে ব্যবহার: কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুআ দিয়ে পানি পড়ে ব্যবহার করা ইসলামে বৈধ। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও এ ধরনের পদ্ধতি ছিল। তবে শর্ত হলো — পানি পড়ার সময় কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুআ ব্যবহার করতে হবে, কোনো শিরকী কালাম বা অজানা মন্ত্র নয়।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন, জ্বীন-জাদুর চিকিৎসায় কুরআনের আয়াত ও সহীহ দুআ দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা জায়েয। তবে কোনো শিরকী বাক্য বা অজানা মন্ত্র ব্যবহার করা জায়েয নয়।
ফাতাওয়া উসমানী-তে উল্লেখ আছে
মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) ফাতাওয়া উসমানীতে উল্লেখ করেছেন যে, জ্বীন-জাদুর চিকিৎসায় কুরআন ও সহীহ হাদীসের দুআ ব্যবহার করা জায়েয, তবে কোনো আমিল যদি এমন কাজ করতে বলে যা শরীয়তসম্মত নয়, তাহলে তা মানা জরুরি নয়।
রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, জ্বীন-জাদুর চিকিৎসায় কুরআনের আয়াত দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা জায়েয, তবে যদি কোনো আমিল এমন কিছু বলে যা শিরক বা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে তা মানা যাবে না।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উল্লেখিত নির্দেশনাগুলো মানলে শিরক হবে না। কারণ:
১. ২১ দিন বাসায় থাকা — এটি একটি সাধারণ পরামর্শ, শিরক নয়। ২. রাত ১২টার পর মোবাইল বন্ধ রাখা — এটি একটি সাধারণ নিয়ম, শিরক নয়। ৩. পানি পড়ে ব্যবহার — যদি কুরআনের আয়াত দিয়ে পড়া হয়, তাহলে তা জায়েয।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
১. এগুলো মানা জরুরি নয় — ইসলামে এ ধরনের বিধান নেই। আমিলের কথা মানা ওয়াজিব নয়। ২. আমিল যদি এমন কিছু বলেন যা কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী, তাহলে তা মানা যাবে না। ৩. আমিলের দেওয়া পানি বা বস্তু যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে তা ব্যবহার না করাই উত্তম। ৪. জ্বীন-জাদুর চিকিৎসার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম বা আমিলের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, যিনি কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চিকিৎসা করেন।
মনে রাখতে হবে: শিরক হলো আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদত করা, দুআ করা, বা আল্লাহর ক্ষমতার বাইরে কোনো ক্ষমতা বিশ্বাস করা। উল্লেখিত নির্দেশনাগুলোতে এসব কিছু নেই, তাই এগুলো শিরক নয়।
সতর্কতা: তবে যদি কোনো আমিল এমন বলেন যে, "আমার কথা না মানলে জ্বীন-জাদু আরও বাড়বে" বা "আমার নির্দেশ মানতে হবে, না মানলে উপকার হবে না" — এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করা ঠিক নয়। কারণ প্রকৃত নিরাময়কারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আমিল শুধু মাধ্যম মাত্র।
আল্লাহ তাআলাই সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী।