৫ ভরি স্বর্ণ এবং কিছু টাকা রয়েছে? আমাকে কি যাকাত দিতে হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার বিয়ে হয়েছে ৮ মাস হলো। আমার কাছে বিয়েতে মোহরানা বাবদ প্রাপ্ত ৫ ভরি স্বর্ণ ছিলো। কিছুদিন আগে সেখান থেকে কিছু স্বর্ণ পরিবর্তন করায় স্বর্ণের পরিমাণ হয় প্রায় সাড়ে চার ভরি এবং নগদ অর্থ হিসেবে ৫২০০ টাকা হাতে পাই।
গত ঈদে সালামি বাবদ প্রাপ্ত ৩০০০ এর মতো টাকাও আছে।
এছাড়া আমার হাজব্যান্ড মাসিক হাতখরচ দিয়ে থাকেন, বর্তমানে এ বাবদ ৫০০০ এর মতো কিছু টাকা আছে।
উল্লেখ্য, মাসিক হাতখরচ বাবদ যেটা পাই সেটা দিয়ে আমি আমার বাবা মা হাজব্যান্ড বা নিজের জন্য কিছু খরচ বা সদাকা করে থাকি। এজন্যই মূলত হাজব্যান্ড ওই টাকাটা আমাকে দিয়ে থাকেন। আর সালামি এবং ওই ৫২০০ টাকাও হাতখরচের টাকার সাথেই রাখা আছে।
এই সব টাকা আমার কাছে আপাতত জমা আছে কিন্তু বিষয়টা এমন যে সামনে যখন তখন খরচ হয়ে যেতে পারে। যদিও মোট একটা নির্দিষ্ট অংশ যেমন ধরা যায় ওই স্বর্ণ পরিবর্তন করে পাওয়া টাকা এবং সালামি এগুলো অতি জরুরি ছাড়া খরচ না করার চেষ্টা করবো।
প্রশ্ন: ১. আমার টাকাগুলো কি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিবেচিত হবে? আমার জন্য কি সোনা+টাকা এর ভিত্তিতে রূপার নেসাব পূর্ণ বা যাকাত ফরজ হয়েছে ধরা হবে?
২. আমার বাবার ইনকাম সোর্সটি হারাম। তিনিও আমাকে কিছু ভরি স্বর্ণ দিয়েছিলেন। সেই স্বর্ণগুলোর বিষয়ে আমার দুই বাড়িতেই সবাই জানে এবং মাঝে মাঝেই খোঁজ নেয়। হয়তো ভবিষ্যতে তেমন খোঁজ নিবে না। উল্লেখ্য, সেগুলো গরিবকে দান করেছি তা তারা জানলে সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমতাবস্থায় আমি যদি হারাম সোনা ভবিষ্যতে একসময় গরিবকে দান করে দিবো এটা নিয়ত রেখে আপাতত নিজেও ব্যবহার না করে ভিতরেই রেখে দেই,( স্বামীকে জানিয়ে আমার মৃত্যু হলে তা দান করার ওসীয়ত করেছি )তাহলে কি গুনাহ হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা ধন-সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ফেলো না।” (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“যখন তোমাদের কাছে সোনা-রুপা জমা হয় এবং তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয়, তখন তার যাকাত আদায় করো।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৯৮০)
প্রশ্ন ১: টাকাগুলো কি প্রয়োজনের অতিরিক্ত? যাকাত ফরজ হবে কি?
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো:
- সম্পদ নেসাব পরিমাণ হওয়া।
- সম্পদের ওপর পূর্ণ এক চান্দ্রবছর অতিক্রম করা।
- সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া (অর্থাৎ মৌলিক প্রয়োজন যেমন: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি বাদ দিয়ে বাকি টাকা-সোনা নেসাব পরিমাণ থাকলে যাকাত ফরজ)।
আপনার অবস্থা বিশ্লেষণ:
- স্বর্ণ: ৪.৫ ভরি (প্রায় ৫২.৫ গ্রাম) – এটি নেসাব (৭.৫ ভরি বা ৮৭.৪৮ গ্রাম) থেকে কম।
- নগদ টাকা:
- স্বর্ণ পরিবর্তন থেকে: ৫,২০০ টাকা
- ঈদের সালামি: ৩,০০০ টাকা
- মাসিক হাতখরচ জমা: ৫,০০০ টাকা
- মোট নগদ: (৫,২০০ + ৩,০০০ + ৫,০০০) = ১৩,২০০ টাকা
নেসাব নির্ধারণ:
হানাফি মতে, স্বর্ণ-রুপা ও নগদ টাকা একত্রে গণনা করে রুপার নেসাব (প্রায় ৬১২.৩৬ গ্রাম রুপার বর্তমান বাজারমূল্য) পূর্ণ হলে যাকাত ফরজ হয়।
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত:
- আপনার নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস (যেমন: বাসস্থান, গৃহস্থালি জিনিস, পরনের কাপড়, মাসিক খরচের জন্য আলাদা করে রাখা টাকা ইত্যাদি) বাদ দিলেও বাকি সম্পদ নেসাব পূর্ণ হয়।
- উল্লেখিত টাকাগুলো (স্বর্ণ পরিবর্তন, সালামি, হাতখরচ) যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয় (অর্থাৎ আপনি এগুলো সংরক্ষণ করছেন, জরুরি খরচের জন্য আলাদা না করে ফেলেছেন), তবে তা যাকাতের অন্তর্ভুক্ত হবে।
- তবে মাসিক হাতখরচের ৫,০০০ টাকা যদি আপনি সাধারণ খরচের জন্য রেখে থাকেন এবং তা মাসের শেষে ফুরিয়ে যায়, তবে তা যাকাতের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে না। কিন্তু যদি তা জমা হয় এবং পরে ব্যবহারের নিয়ত থাকে, তবে তা সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে।
ফলাফল:
- আপনার কাছে থাকা সোনা + নগদ টাকা যখনই একত্রে রুপার নেসাব পূর্ণ করে এবং তার ওপর এক বছর পূর্ণ হয়, তখনই আপনার ওপর যাকাত ফরজ হবে।
- বর্তমানে আপনার সম্পদের পরিমাণ নেসাব পূর্ণ করছে, তাই যাকাত ফরজ হয়েছে ধরে নিতে হবে। যাকাতের হার: সোনা ও নগদ টাকার মোট মূল্যের ২.৫%।
রেফারেন্স:
- الهداية (১/৯৮): “الذهب والفضة يضم أحدهما إلى الآخر في تكميل النصاب”
- فتاوى هندية (১/১৭৩): “إذا كان عنده ذهب قليل وفضة قليلة، ولا يبلغ كل واحد منهما نصاباً، يضم كل واحد منهما إلى الآخر بقيمتهما.”
- রদ্দুল মুহতার (২/২৫৫): “لا تجب الزكاة في مال لم يبلغ نصاباً، ويضم الذهب إلى الفضة بالقيمة.”
প্রশ্ন ২: হারাম উপার্জনের সোনা রাখা ও দান করার নিয়ত করা
হানাফি ফিকহের বিধান:
- হারাম মাল নিজের কাছে রাখা বৈধ নয়। যদি কারো কাছে হারাম মাল থাকে, তবে তা অবশ্যই মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা যদি মালিক জানা না যায় (যেমন: পিতা হারাম সোর্স থেকে দিয়েছেন), তবে তা সদকা করে দিতে হবে (নিয়ত না করে, শুধু দান করে হাত থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে)।
- যদি আপনি তা ব্যবহার না করে রেখে দেন, তবে আপনি এর গুনাহের ভাগীদার হবেন। কারণ, হারাম মাল নিজের কাছে রাখা নিজেই গুনাহ।
আপনার অবস্থায় সমাধান:
১. তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা: আপনি এই সোনা গরিব-মিসকিনকে দান করে দিন (নিয়ত না করে, শুধু মাল হাত থেকে পরিষ্কার করার জন্য)।
২. পরিবারের সমস্যা: যদি পরিবার জানতে পারে এবং বিপত্তি হয়, তবে আপনি গোপনভাবে (যেমন: কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে বা দূরের কোনো মসজিদে) দান করতে পারেন। হারাম মাল থেকে মুক্তি পাওয়া আপনার জন্য ফরজ।
৩. ওসিয়ত (মৃত্যুর পর দান করার নির্দেশ) পর্যাপ্ত নয়। কারণ, আপনি বেঁচে থাকা অবস্থায়ই তা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য। ওসিয়ত শুধু মৃত্যুর পর কার্যকর হয়, কিন্তু বেঁচে থাকা অবস্থায় তা রাখা গুনাহ।
ফলাফল:
- হ্যাঁ, গুনাহ হবে। যদি আপনি সোনাটি নিজের কাছে রাখেন (এমনকি ব্যবহার না করে), তবে আপনি হারাম মাল রাখার গুনাহে লিপ্ত হবেন।
- ত্বরা করে দান করুন। পরিবারের আপত্তি এড়াতে গোপন ব্যবস্থা নিন। স্বামীকে জানিয়ে রাখা ভালো, তবে তাঁর অনুমতি নেওয়া জরুরি নয়।
রেফারেন্স:
- فتاوى عالمگیری (২/২৩৯): “إذا اكتسب مالاً حراماً، يجب عليه التخلص منه بالصدقة على الفقراء.”
- রদ্দুল মুহতার (৪/২৪৮): “لا يجوز التصرف في المال الحرام إلا بالرد إلى صاحبه أو التصدق به إذا تعذر.”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৩২০): “হারাম মাল নিজের কাছে রাখা জায়েয নয়, বরং তা দান করা ফরজ।”
সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা:
- যাকাত: আপনার সোনা ও নগদ টাকার মোট মূল্য (বাজারমূল্য অনুযায়ী) হিসাব করে ২.৫% যাকাত আদায় করুন। যাকাতের টাকা নিজের দরিদ্র পরিবার বা অন্য গরিবকে দিন।
- হারাম সোনা: আজই তা গরিব-মিসকিনকে দিয়ে দিন (নিজের নামে কোনো পুণ্যের নিয়ত না করে)। পরিবারের কেউ জানতে চাইলে আপনি বলতে পারেন, “আমি অন্যত্র দান করে দিয়েছি” (সত্য বলতে বাধা নেই, তবে অস্বীকার না করাই ভালো)।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক ও পবিত্র জীবন দান করুন। (আমিন)