মনে মনে কুফরি বাক্য বললে ঈমান নষ্ট হয় কি?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5128
Questioner: Nazmul Rahman
Question Asked: 08 Sep 2026, 06:31 AM
Reviewed & Published: 08 Sep 2026, 06:48 AM
Views: 8
Tokens: 3,747
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আজানের সময় কালিমার বাক্য বলার সময়ই একটি মানুষ যদি মনে কোন কুফরি বাক্য বলে কিন্তু মুখে কোন উচ্চারন করেনি মুখ বন্ধ করে এক ধরনের আওয়াজ করেছে, এতে কি কোন সমস্যা হবে? কোন হুজুরের কাছ থেকে উত্তর চাচ্ছি।এ আই এর উত্তর এর চাইতে হুজুরের উত্তরটা বেশি চাচ্ছি

Answer

উত্তর

আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি দলিল-প্রমাণসহ হানাফি মাযহাবের আলোকে উত্তর প্রদান করছি।

সংক্ষিপ্ত উত্তর:

মনে মনে কুফরি চিন্তা করা বা কুফরি বাক্য মনে মনে বলা তা বিশ্বাস না করলে কুফরি হয় না ঈমান নষ্ট করে না এবং কুফরি হিসেবে গণ্য হয় না, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারিত হয়। তবে এটি গুনাহের কাজ এবং তওবা করা আবশ্যক।


বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা:

১. কুফরি শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই হয়:

কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঈমান ও কুফরের সম্পর্ক রয়েছে উচ্চারণ ও বিশ্বাসের সাথে। মনে মনে কোনো চিন্তা আসা বা মনে মনে কোনো বাক্য বলা কুফরি গণ্য হয় না, যদি না তা মুখে উচ্চারিত হয় এবং অন্তর তা বিশ্বাস করে।

কুরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে:

وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ "আর যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, তারা অবশ্যই বলবে, আমরা তো কেবল কথার কথা বলছিলাম এবং খেলাধুলা করছিলাম। আপনি বলে দিন, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলের সাথে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা ওজর পেশ করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।" (সূরা আত-তাওবাহ: ৬৫-৬৬)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মুখে উচ্চারণ করার কারণেই তারা কুফরি করেছে। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে কুফরি হতো না।

২. হাদিসে এসেছে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে মনে যে কথা আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কাজে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।" (সহিহ বুখারি: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম: ১২৭)

এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, মনে মনে কোনো কথা বললে বা চিন্তা করলে তা আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন, যতক্ষণ না তা মুখে উচ্চারণ করা হয় বা কাজে পরিণত করা হয়।

৩. হানাফি ফিকহের আলোকে:

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, কুফরি শুধু মুখে উচ্চারণ এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করার মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। শুধু মনে মনে চিন্তা করা কুফরি নয়।

ফতোয়ায়ে আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:

وَالْكُفْرُ عِبَارَةٌ عَنْ تَكْذِيبِ الرَّسُولِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ فِيمَا جَاءَ بِهِ مَعَ الْعِلْمِ بِأَنَّهُ جَاءَ بِهِ "কুফর হলো রাসূল ﷺ যা নিয়ে এসেছেন তা জেনে শুনে মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করা।" (ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ২:২৫৫)

৪. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) এর বক্তব্য:

রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন:

وَلَا يَكْفُرُ بِمَا يَخْطِرُ بِقَلْبِهِ مِنْ غَيْرِ اعْتِقَادٍ وَلَا بِمَا يَجْرِي عَلَى لِسَانِهِ مِنْ غَيْرِ قَصْدٍ "অন্তরে খেয়াল খেয়াল মনে যা আসে তা বিশ্বাস না করলে কুফরি হয় না। আর মুখে অনিচ্ছাকৃতভাবে যা উচ্চারিত হয় তাও কুফরি নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৪:২৩৬)

৫. শুধু আওয়াজ করা বা মুখ বন্ধ করা:

আপনি বলেছেন, ব্যক্তিটি মুখ বন্ধ করে এক ধরনের আওয়াজ করেছে। এটি কোনো শব্দ বা বাক্য নয়, তাই এটি কোনো কুফরি বাক্য হিসেবে গণ্য হবে না। কুফরি হওয়ার জন্য স্পষ্টভাবে এমন শব্দ উচ্চারণ করতে হবে যা কুফরি হিসেবে গণ্য।

ফতোয়ায়ে উসমানিতে উল্লেখ আছে:

কুফরি শব্দ মুখে উচ্চারণ না করলে এবং অন্তর দিয়ে বিশ্বাস না করলে কুফরি হয় না। শুধু মনে মনে চিন্তা করলে ঈমান নষ্ট হয় না।


তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:

১. মনে মনে কুফরি চিন্তা করা ঈমান নষ্ট না করলেও এটি খারাপ কাজ এবং শয়তানের প্ররোচনা। এতে অন্তরে অস্বস্তি ও পেরেশানি সৃষ্টি হয়।

২. আজানের সময় কালিমা বলার সময় মনে কুফরি চিন্তা আসা শয়তানের কুমন্ত্রণা। শয়তান মানুষকে আজানের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করতে চায়।

৩. তওবা করা আবশ্যক: এমন চিন্তা মনে এলে সাথে সাথে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়তে হবে।

৪. মনে মনে কুফরি বাক্য বলা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়, তবে তা গুনাহ।

ফতোয়া:

১. মনে মনে কুফরি বাক্য বলা বা চিন্তা করা ঈমান নষ্ট করে না। ২. মুখে উচ্চারণ না করলে কুফরি গণ্য হবে না। ৩. মুখ বন্ধ করে আওয়াজ করা কোনো বাক্য নয়, তাই এটি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। ৪. তবে এটি শয়তানের প্ররোচনা, তাই তওবা করা এবং শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। ৫. আজানের সময় এমন চিন্তা এলে তা শয়তানের কুমন্ত্রণা হিসেবে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শয়তানের প্ররোচনা থেকে হিফাজত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.