কোন একটি ঘটনা শোনার প্রেক্ষিতে ঈমান চলে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাই।
Faith and Belief · Hanafi
Question
***কিন্তু আমি ইসলামি বক্তা আহমেদ দিদাত এর বলার ধরণ হিসেবে বলেছি আল্লাহ তো এও কথে শুনে কেঁদে দয়ে বলেছে আমিন্তোনামার পিত্র যীশুকেই বাঁচাঅতে পারিনি আপজার নাতিকে কিভাবে বাঁচাবো। আমার মনে এমন কোন খেয়াল ও আসে নি শিরক নিয়ে। এটা জাস্ট বলার জন্য বলা, শেষে তওবা ও নাউজুবিল্লাহ ও বলছি। আমার কি ইমান শেষ? আমার স্ত্রী বৈধ আছে? আমার আগের সওয়াব গুলো কি ঠীক থাকবে, আমার দোয়া কি কবুল হবে?? এই ঘটনা কি পরবর্তীতে শেয়ার যোগ্য?
(https://www.heritagetimes.in/interaction-between-a-christian-missionary-and-shah-abd-al-aziz-of-delhi)ফলাফল: এই বাস্তব ও বুদ্ধিবৃত্তিক পাল্টা যুক্তির সামনে ওই খ্রিস্টান মিশনারি সম্পূর্ণ নিরূপায় ও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তিনি পরাজয় স্বীকার করেন এবং শর্ত অনুযায়ী মেটকাফকে দুই হাজার রুপি পরিশোধ করেন। এই চমৎকার ঐতিহাসিক ঘটনাটি ‘কালামাত-ই-আজিজ’ গ্রন্থে সংরক্ষিত রয়েছে। [1] (
Answer
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশ্নকারী ভাই/বোনের জন্য আমাদের দোয়া রয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করুন এবং তার ঈমান ও আমলসমূহকে হিফাজত করুন। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যা করেছেন বা বলেছেন, তা নিয়ে আপনার মনে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক। আমরা আশা করি, নিচের বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও ফতোয়া আপনার উদ্বেগ দূর করবে, ইনশাআল্লাহ।
১. আপনার ঈমানের অবস্থা ও তওবা:
আপনি আহমেদ দিদাতের বক্তব্যের ধরন অনুকরণ করে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে একটি অশোভন ও ভুল বাক্য ব্যবহার করেছেন। এটি একটি গুনাহের কাজ। তবে, ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, ভুলবশত বা চিন্তা-ভাবনা না করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এমন কোনো কথা, যা মনে আনা হয়নি এবং যা বিশ্বাস করা হয়নি, তা ঈমান নষ্ট করে না। আপনি নিজেই বলেছেন, "আমার মনে এমন কোনো খেয়াল আসে নি শিরক নিয়ে। এটা জাস্ট বলার জন্য বলা।"
যেহেতু আপনি এটি অন্তর থেকে বিশ্বাস করে বলেননি, বরং শুধুমাত্র একটি বিতর্কের জবাব দেওয়ার কৌশল হিসেবে বলেছেন, এবং সাথে সাথে আপনি "তওবা ও নাউজুবিল্লাহ"ও বলেছেন, তাই আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি। তবে এটি একটি মারাত্মক গুনাহ ছিল, যা থেকে আপনাকে অবশ্যই তওবা করতে হবে।
তওবার শর্ত: তওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে: ১. গুনাহ থেকে সাথে সাথে বিরত থাকা। ২. কাজটির জন্য অনুতপ্ত হওয়া (অনুশোচনা করা)। ৩. দৃঢ় সংকল্প করা যে, ভবিষ্যতে এ কাজে ফিরে যাব না।
আপনি ইতিমধ্যেই অনুতপ্ত ও ভীত। তাই এখন শুধু দৃঢ় সংকল্প করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ "বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)
২. আপনার স্ত্রী বৈধ আছে কি?
হ্যাঁ, আপনার স্ত্রী আপনার জন্য বৈধ আছেন। যেহেতু আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি এবং আপনি ইসলাম থেকে বের হননি, তাই আপনার বিবাহ বাতিল হওয়ার কোনো কারণ নেই। বিবাহ বাতিল হওয়ার জন্য শিরক বা কুফরি এমন পর্যায়ে পৌঁছানো প্রয়োজন যা ঈমানকে ধ্বংস করে। আপনার ঘটনাটি যেহেতু ভুলবশত ও বাক্যতঃ, অন্তর বিশ্বাসী থাকায় তা ঈমান নষ্টের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই আপনার স্ত্রী আপনার জন্য সম্পূর্ণ বৈধ।
৩. পূর্বের সওয়াব ও দোয়া কবুল:
আপনার পূর্বের সকল নেক আমল ও সওয়াব ঠিক থাকবে। ইসলামী আকীদা মতে, গুনাহ করলে পূর্বের নেক আমল বিনষ্ট হয় না, যতক্ষণ না কেউ কুফরি বা শিরকে লিপ্ত হয়। যেহেতু আপনার ঈমান অটুট আছে, তাই আপনার পূর্বের সকল নেক আমল, নামাজ, রোজা, দান-সদকা ইত্যাদি ঠিকই সংরক্ষিত আছে। গুনাহের জন্য তওবা করলে তা ক্ষমা হয়ে যায় এবং পূর্বের নেক আমলগুলো অক্ষুণ্ণ থাকে।
আপনার দোয়াও কবুল হবে। আল্লাহ তাআলা তওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং তার দোয়া কবুল করেন। তবে, দোয়া কবুলের জন্য তওবা করা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকা জরুরি। আপনি তওবা করলে আপনার দোয়া কবুলের পথ সুগম হবে, ইনশাআল্লাহ।
৪. ঘটনাটি শেয়ার করা যাবে কি?
এই ঘটনাটি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ: ১. এতে আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অশোভন বাক্য ব্যবহারের একটি নমুনা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। ২. ইসলামী বক্তা আহমেদ দিদাতের বক্তব্যের ধরনটি এখানে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং, শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মূল বক্তব্যটি ছিল অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ও সম্মানজনক। তিনি খ্রিস্টান পাদ্রীকে তার নিজের ধর্মগ্রন্থের বিশ্বাস (ঈসা (আ.)-কে ঈশ্বরের পুত্র মনে করা) দিয়েই জবাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আহমেদ দিদাতের বক্তব্যের ধরনে আল্লাহকে কাঁদানো বা "বাঁচাতে পারিনি" জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ইসলামী আদবের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং আল্লাহর শানে বেয়াদবি।
সুতরাং, এই ধরনের ঘটনা বা বক্তব্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। কেননা, এটি অন্যদের জন্য ফিতনার কারণ হতে পারে। যদি কেউ এই বিতর্কের ঐতিহাসিক দিকটি জানতে চায়, তবে তাদেরকে শাহ আবদুল আজিজ (রহ.)-এর মূল যুক্তিটি সঠিক ও সম্মানজনক ভাষায় উপস্থাপন করা উচিত, আহমেদ দিদাতের বক্তব্যের ধরনটি নয়।
৫. সংশোধন ও দিকনির্দেশনা:
আপনি যে কাজটি করেছেন, তা ছিল একটি গুরুতর ভুল। ইসলামে আল্লাহ তাআলার শান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাঁর সম্পর্কে কোনো প্রকার অশোভন কথা বলা, এমনকি রসিকতা বা বিতর্কের ছলেও, মারাত্মক গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ الْعَبْدَ لَيَتَكَلَّمُ بِالْكَلِمَةِ مِنْ سَخَطِ اللَّهِ لَا يَلْقِي لَهَا بَالًا يَهْوِي بِهَا فِي جَهَنَّمَ "নিশ্চয়ই বান্দা এমন একটি কথা বলে ফেলে, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ, সে বিষয়ে সে ভাবেও না, অথচ এর কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪৭৮)
তাই, ভবিষ্যতে কোনো বিতর্ক বা আলোচনায় অংশ নেওয়ার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকবেন। ধর্মীয় বিষয়ে বিতর্ক করার সময় কুরআন-হাদিসের সঠিক জ্ঞান ও ইসলামী আদব-কায়দা মেনে চলা জরুরি। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন।
উপসংহার ও ফতোয়া:
১. আপনার ঈমান নষ্ট হয়নি এবং আপনি ইসলামের গণ্ডির মধ্যেই আছেন। ২. আপনার স্ত্রী আপনার জন্য বৈধ আছেন। ৩. আপনার পূর্বের সকল নেক আমল ও সওয়াব ঠিক থাকবে। ৪. আপনার দোয়া কবুল হবে, যদি আপনি আন্তরিকভাবে তওবা করেন। ৫. এই ঘটনাটি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। ৬. আপনার উপর ওয়াজিব (আবশ্যক) হলো, উক্ত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা। সাথে সাথে দু'রাকাত নামাজ পড়ে তওবা করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করুন। আমিন।