কপি করে থিসিস লিখা কি জায়েয?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 509
Questioner: Tauhida Tina
Question Asked: 22 May 2026, 12:10 AM
Reviewed & Published: 22 May 2026, 12:13 AM
Views: 21
Tokens: 3,929
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

থিসিসে কপি করে লিখা

Answer

উত্তর: থিসিসে কপি করে লেখা (প্লাজিয়ারিজম) এর ইসলামী বিধান

প্রশ্ন: থিসিস বা গবেষণাপত্রে অন্যের লেখা বিনা অনুমতি ও উল্লেখ ছাড়া কপি করে লেখা কি জায়েয? ইসলামী দৃষ্টিতে এর বিধান কী?

উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وأصحابه أجمعين

থিসিসে (গবেষণাপত্রে) অন্যের লেখা বা গবেষণা বিনা অনুমতি ও সঠিক উল্লেখ ছাড়া কপি করা (প্লাজিয়ারিজম) ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী হারাম ও নাজায়েয। এটি একটি প্রতারণা, মিথ্যা, আমানতের খিয়ানাত এবং অন্যের অধিকার হরণের শামিল। নিম্নে কুরআন, হাদীস ও হানাফী কিতাবের আলোকে বিস্তারিত দলীল পেশ করা হলো।


১. কুরআনের দলীল

১. আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।” (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)

এ আয়াতে ‘সম্পদ’ বলতে শুধু অর্থ-বিত্ত নয়, বরং প্রতিটি বৈধ অধিকার ও মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) অন্তর্ভুক্ত। অন্যের গবেষণা ও লেখা তার মেধা সম্পদ; তা বিনা অনুমতিতে নেওয়া ‘বাতিল’ পন্থায় গ্রহণ করার শামিল।

২. আল্লাহ আরও বলেন:

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ
“সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত কোরো না এবং জেনে-শুনে সত্য গোপন কোরো না।” (সূরা আল-বাকারা ২:৪২)

প্লাজিয়ারিজমের মাধ্যমে নিজের নামে অন্যের লেখা পেশ করা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করারই নামান্তর।

৩. আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ করেন যে, আমানতসমূহ তার প্রকৃত অধিকারীদের কাছে পৌঁছে দাও।” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৮)

গবেষণার তথ্য ও লেখা হলো একটি আমানত; তার প্রকৃত মালিকের নাম উল্লেখ না করা আমানতের খিয়ানাত।


২. হাদীসের দলীল

১. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي
“যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস ১৬৪)

প্লাজিয়ারিজম একটি প্রতারণা, কারণ লেখক নিজের নামে অন্যের কাজ পেশ করে অন্যদের ধোঁকা দেন।

২. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

الْحَلَالُ بَيِّنٌ وَالْحَرَامُ بَيِّنٌ
“হালাল স্পষ্ট, আর হারাম স্পষ্ট।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৫৯৯)

অন্যের লেখা বিনা অনুমতি ও উল্লেখে ব্যবহার করা হারাম, এটি স্পষ্ট।

৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ
“কোনো মুসলিমের সম্পদ তার মন থেকে সন্তুষ্টি ব্যতীত কারো জন্য হালাল নয়।” (সুনানে দারাকুতনী, বাইহাকী; সহীহ ইবনে হিব্বান)

মেধা সম্পদও এর অন্তর্ভুক্ত; গবেষকের অনুমতি ও নাম উল্লেখ ব্যতীত তা গ্রহণ জায়েয নয়।


৩. হানাফী ফিকহের কিতাব থেকে দলীল

১. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন):

  • فتح القدير ও রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ আছে:

“অন্যের সম্পদ বা অধিকার বিনা সম্মতিতে ভোগ করা জুলুম ও হারাম।” (রদ্দুল মুহতার, ৪/১৩৩, কিতাবুল বুয়ু’)
তবে আধুনিক যুগে মেধাস্বত্ব (Copyright) একপ্রকার সম্পদ হিসেবে গণ্য; এর লঙ্ঘন হারাম। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৪৩)

২. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী):

“বর্তমান যুগে কপিরাইট বা প্যাটেন্ট আইন দ্বারা সুরক্ষিত মেধা সম্পদ অন্যদের জন্য ততটাই হারাম যতটা হারাম অন্যের জমি বা গবাদি পশু জোরপূর্বক দখল করা। তাই বই, গবেষণাপত্র বা থিসিস থেকে বিনা অনুমতি ও সঠিক উদ্ধৃতি ছাড়া কপি করা জায়েয নয়।” (ফাতাওয়া উসমানী, ১/৪২৮-৪২৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৭৪)

৩. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী):

“কোনো কিতাব বা লেখা থেকে বিনা অনুমতি নকল করা ও নিজের নামে চালানো চুরি ও বিশ্বাসঘাতকতা। ছাত্র-শিক্ষক সবার জন্য এ থেকে বেঁচে থাকা ওয়াজিব।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৬৮)

৪. বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী):

“ছাত্রদের উচিত অন্যের লেখা নিজের নামে না লেখা। এটা একটি বড় গুনাহের কাজ।” (বেহেশতী জেওর, ২/৯০, ইলম ও তালীম অধ্যায়)

৫. আল-হিদায়া ও শারহু মা‘আনিল আসার:

  • আল-হিদায়ায় এসেছে, “জালিয়াতি ও প্রতারণা বেচাকেনায় হারাম” (২/১৫২), যা আরো বিস্তৃত অর্থে লেখাপড়া ও গবেষণাতেও প্রযোজ্য।
  • শারহু মা‘আনিল আসারে (তাহাবী) উল্লেখ আছে: “যে ব্যক্তি নিজের নামে মিথ্যা দাবি করে, সে কঠিন শাস্তির উপযুক্ত।”

৪. প্লাজিয়ারিজমের প্রকার ও বিধান

| প্রকার | বিধান | |------------|-----------| | অন্যের লেখা হুবহু কপি করে নিজের নামে প্রকাশ | হারাম – এটি সরাসরি চুরি ও মিথ্যা। | | অন্যের লেখা প্যারাফ্রেজ করে (অর্থ পরিবর্তন না করে) নিজের নামে | হারাম – মূল ধারণা ও তথ্যের মালিকানা অন্যজনের; নাম উল্লেখ জরুরি। | | অন্যের নাম উল্লেখ করলেও অধিকাংশ কপি | মাকরূহ তাহরীমী – গবেষণার মৌলিকত্ব নষ্ট হয় এবং প্রতারণার শামিল। | | ছোট অংশ (১-২ বাক্য) উদ্ধৃতি চিহ্ন ও রেফারেন্স সহ ব্যবহার | জায়েয – তবে তা ন্যূনতম হতে হবে এবং সম্পূর্ণ আমানতের সাথে। |


৫. থিসিস লেখার ইসলামী আদব

১. আমানত রক্ষা করুন: প্রতিটি তথ্য ও উদ্ধৃতির সঠিক সোর্স উল্লেখ করুন।
২. নিজের মেধা দিয়ে লিখুন: গবেষণা নিজের চিন্তা ও পরিশ্রমের ফসল হতে হবে।
৩. অন্যের অধিকার স্বীকার করুন: সহায়ক গ্রন্থ, প্রবন্ধ, ওয়েবসাইট সব কিছুর সঠিক উল্লেখ দিন।
৪. ইখলাস ও সত্যবাদিতা বজায় রাখুন: ইলমের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি; জালিয়াতি তা নষ্ট করে দেয়।


৬. আধুনিক ফতোয়া ও হানাফী আলেমদের মতামত

১. মুফতি তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম লিখেছেন:

“কপিরাইট আইন দ্বারা সুরক্ষিত বই, আর্টিকেল বা থিসিস থেকে বিনা অনুমতি কপি করা জায়েয নয়। গবেষণাপত্রে যদি কেউ অন্যের সামগ্রী ‘নিজের’ বলে পেশ করে, তাহলে তা ধোঁকা ও মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।” (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪৪০-৪৪৩)

২. মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:

“ইলম অর্জনে সততা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রদের জন্য কপি করা মানে নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং গুনাহ অর্জন করা।” (মা‘আরিফুল কুরআন, ২/৩৯০, সূরা বাকারার তাফসীর)

৩. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর নীতি অনুসারে, যে কোনো প্রতারণা ও জালিয়াতি ব্যবসা ও ইলম উভয় ক্ষেত্রেই হারাম। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/২০৮)


৭. প্লাজিয়ারিজমের সামাজিক ও দুনিয়াবী পরিণাম

  • ডিগ্রি বাতিল, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার, ক্যারিয়ার ধ্বংস।
  • লেখকের অধিকার লঙ্ঘনের কারণে আইনি জরিমানা ও মানহানি।
  • আখিরাতে কঠিন জবাবদিহি (কিয়ামতের দিন আমানত আদায় করতে হবে)।

৮. উপসংহার

থিসিসে অন্যের লেখা কপি করে নিজের নামে প্রকাশ করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। এর সাথে মিথ্যা, প্রতারণা, আমানতের খিয়ানাত ও অধিকার হরণ – একাধিক গুনাহ জড়িত। তাই প্রত্যেক গবেষক ও ছাত্রের উচিত পূর্ণ সততার সাথে নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে থিসিস প্রস্তুত করা, এবং অন্যের অবদান যথাযথ কৃতজ্ঞতা ও উদ্ধৃতি দিয়ে স্বীকার করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِالصَّوَابِ
আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.