মায়ের সাথে উঁচু গলায় কথা বলা
Family Life · Hanafi
Question
উস্তাজ আমার আম্মুর সাথে মাঝে মধ্যে আমার একটু কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। আমি খুব করে চাই মা বাবার বাধ্য হতে। কিন্তু চিৎকার করা হয়ে যায় মাঝে মধ্যে। সমস্যা হচ্ছে যে মাফ চাইতে গেলে আম্মু আরো রাগ করে। এখন এই অবস্থায় যদি আমি কিছু আমল করে আম্মুর জন্য পৌঁছে দেই তাহলে কি কাফফারা হবে?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই/বোন,
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: মায়ের সাথে মাঝে মধ্যে কথা কাটাকাটি ও চিৎকার হয়ে যায়। মাফ চাইতে গেলে মা আরও রাগান্বিত হন। এই অবস্থায় কিছু আমল (নেক কাজ) করে মায়ের জন্য পৌঁছে দিলে তা কি কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর
প্রথমত, আপনাকে জানতে হবে যে, মা-বাবার সাথে চিৎকার করা বা উঁচু গলায় কথা বলা মারাত্মক গুনাহের কাজ। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا "আর তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে 'উফ' বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এমনকি "উফ" বলতেও নিষেধ করেছেন, যা অত্যন্ত তুচ্ছ শব্দ। চিৎকার করা তো এর চেয়েও অনেক বড় অন্যায়।
দ্বিতীয়ত, কাফফারা হিসেবে আমল করার বিধান
মা-বাবার সাথে খারাপ ব্যবহারের জন্য ইসলামে নির্দিষ্ট কোনো 'কাফফারা' (প্রায়শ্চিত্ত) নেই যেমনটি সিয়াম ভঙ্গ বা শপথ ভঙ্গের ক্ষেত্রে রয়েছে। এটি একটি গুনাহ, যার জন্য প্রয়োজন:
- তওবা (Tawbah): আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
- ক্ষমা প্রার্থনা: মা-বাবার কাছে ক্ষমা চাওয়া।
আপনি যা করতে পারেন:
- নেক আমল ও দান-সদকা: আপনার মায়ের জন্য নেক আমল করা, দান-সদকা করা এবং দোয়া করা একটি অত্যন্ত উত্তম কাজ। এটি আপনার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তবে শুধুমাত্র আমল করলেই যে গুনাহ মাফ হয়ে যাবে এবং মায়ের ক্ষমা প্রয়োজন হবে না, এমনটি নয়। এটি একটি অতিরিক্ত নেকি হবে, যা আল্লাহর কাছে আপনার তওবার সাথে সাথে গুনাহ মাফের মাধ্যম হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
- ক্ষমা প্রার্থনার বিকল্প পদ্ধতি: যেহেতু সরাসরি মাফ চাইতে গেলে মা আরও রাগান্বিত হন, তাই আপনি কিছু সময় অপেক্ষা করুন। যখন মায়ের মেজাজ ভালো থাকবে, তখন বিনয়ের সাথে ক্ষমা চান। যদি সরাসরি বলা কঠিন হয়, তবে চিঠি লিখে, মেসেজ দিয়ে বা উপহারের সাথে একটি ছোট্ট নোট দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন। এটি অনেক সময় কার্যকর হয়।
তৃতীয়ত, হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার -এ উল্লেখ আছে যে, পিতা-মাতার অবাধ্যতা (উকুক) কবিরা গুনাহ। এর কাফফারা হলো তওবা এবং পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, পিতা-মাতার সাথে খারাপ ব্যবহারের পর তাদের ক্ষমা না পাওয়া পর্যন্ত গুনাহ মাফ হবে না। তবে যদি তারা ক্ষমা না করেন, তাহলে সন্তানকে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে এবং তাদের সেবা করে যেতে হবে।
ফাতাওয়া উসমানি -তেও উল্লেখ আছে যে, পিতা-মাতার সাথে দুর্ব্যবহারের প্রায়শ্চিত্ত হলো তাদের সেবা করা এবং তাদের রাগ দূর করার চেষ্টা করা। তাদের জন্য দোয়া ও ইস্তিগফার করা সন্তানের কর্তব্য।
চতুর্থত, করণীয় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা
- আত্মনিয়ন্ত্রণ: রাগ উঠলে সাথে সাথে চুপ হয়ে যান এবং সেখান থেকে সরে যান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমাদের কেউ রাগান্বিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলে সে যেন বসে পড়ে, তবুও রাগ না গেলে সে যেন শুয়ে পড়ে।" (সুনানে আবু দাউদ)
- দোয়া: বেশি বেশি দোয়া করুন, যেন আল্লাহ আপনার মায়ের হৃদয় নরম করেন এবং আপনাকে ধৈর্য দেন।
- সেবা: মায়ের সেবা করার মাধ্যমে তার ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করুন। তার পছন্দের জিনিস এনে দিন, তার কাজে সাহায্য করুন।
- আমল ও দান: আপনার মায়ের জন্য নিয়মিত দোয়া করুন এবং তার পক্ষ থেকে দান-সদকা করুন। এটি আপনার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং গুনাহ মাফের একটি অসিলা (উপায়) হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
উপসংহার
মা-বাবার সাথে চিৎকার করা একটি কবিরা গুনাহ। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো কাফফারা নেই; বরং আন্তরিক তওবা এবং মায়ের ক্ষমা অর্জন করাই মূল পথ। আপনি যদি মায়ের জন্য নেক আমল করেন, দান-সদকা করেন এবং দোয়া করেন, তাহলে এটি একটি উত্তম কাজ এবং আপনার তওবার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের একটি অসিলা হতে পারে। তবে মায়ের ক্ষমা প্রার্থনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যখনই সুযোগ পাবেন, বিনয়ের সাথে ক্ষমা চাইবেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনার মা-বাবার সাথে আপনার সম্পর্ক সুন্দর করুন। আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।