ওনাদের থেকে চিকিৎসা নেয়া যাবে?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
ওনাদের থেকে চিকিৎসা নেওয়া প্রসঙ্গে
প্রশ্ন: একজনের সাথে কথা হয়েছে। তিনি বললেন, শুধু রুকইয়াহ করলে হবে না, তদবির করতে হবে। রাক্বীরা এসব বোঝে না, মানসিক শারীরিক চাপ হয় রুকইয়াহ করলে। জিজ্ঞাসা করলাম তদবির কী কুরআন হাদিস অনুযায়ী? তিনি বললেন, জী অবশ্যই। উনি কী সন্দেহজনক? আরেকজন বললো বিভিন্ন মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা করবে। আবার উনি বললেন, জিন্নাত-যাদু এই শব্দ—ওনাদের থেকে চিকিৎসা নিতে পারি?
উত্তর
১. রুকইয়াহ ও তদবির সম্পর্কে ইসলামী নির্দেশনা
রুকইয়াহ (কুরআন ও সহীহ দু'আ দ্বারা ঝাড়ফুঁক) ইসলামসম্মত একটি পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও রুকইয়াহ করেছেন এবং সাহাবীদের অনুমতি দিয়েছেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"لَا بَأْسَ بِالرُّقَى مَا لَمْ يَكُنْ فِيهِ شِرْكٌ" "যতক্ষণ পর্যন্ত রুকইয়াহতে শিরক না থাকে, ততক্ষণ তাতে কোনো দোষ নেই।" (সহীহ মুসলিম: ২২০০)
তবে "তদবির" শব্দটি দ্বারা যদি এমন কিছু বুঝানো হয় যা কুরআন-সুন্নাহর আলোকে প্রমাণিত নয়, যেমন—কোনো বিশেষ ব্যক্তির কাছ থেকে বিশেষ আমল বা বিশেষ কিছু লিখে দেওয়া ইত্যাদি, তবে তা সন্দেহজনক। ইসলামে প্রতিটি আমলের ভিত্তি হতে হবে কুরআন ও সহীহ হাদিস।
২. জ্বিন-যাদু থেকে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান
জ্বিন-যাদুর প্রভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য ইসলামসম্মত চিকিৎসা হলো:
- রুকইয়াহ (কুরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক)
- দু'আ ও যিকির দ্বারা চিকিৎসা
- হালাল ও বৈধ ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা
তবে যারা জ্বিন-যাদু নিরাময়ের নামে কুসংস্কার, শিরক বা অজ্ঞতাপূর্ণ কার্যকলাপ করে, তাদের থেকে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয নয়। ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি জ্বিন-যাদু নিরাময়ের দাবি করে কিন্তু তার পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয়, তার কাছে যাওয়া জায়েয নয়।"
৩. সন্দেহজনক ব্যক্তি সম্পর্কে সতর্কতা
যে ব্যক্তি বলে "শুধু রুকইয়াহ করলে হবে না, তদবির করতে হবে" এবং তদবিরকে কুরআন-হাদিসসম্মত বলে দাবি করে কিন্তু তার পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয়, সে সন্দেহজনক। কারণ:
১. রুকইয়াহ ইসলামসম্মত এবং এটি দ্বারা অনেক ক্ষেত্রে আরোগ্য লাভ হয়। ২. "তদবির" নামে যদি কোনো বিশেষ পদ্ধতি থাকে যা কুরআন-সুন্নাহয় নেই, তবে তা বিদ'আত হতে পারে। ৩. যারা জ্বিন-যাদু নিরাময়ের নামে মানুষের কুসংস্কারকে কাজে লাগায়, তাদের থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
৪. ইসলামী পদ্ধতিতে চিকিৎসা
ইসলামে চিকিৎসার দুটি পদ্ধতি স্বীকৃত:
ক. রুকইয়াহ ও দু'আ দ্বারা চিকিৎসা:
- সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস ইত্যাদি দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা।
- সহীহ দু'আসমূহ পাঠ করা।
খ. বৈধ ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা:
- ইসলামে বৈধ ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েয। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً" "তোমরা চিকিৎসা করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার ওষুধ দেননি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫)
৫. ফাতাওয়া ও হানাফি কিতাবের আলোকে
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যাহ (আলমগীরী) তে বলা হয়েছে:
"যাদুগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য কুরআন দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা এবং বৈধ ওষুধ ব্যবহার করা জায়েয। তবে যাদুকর বা গণকের কাছে যাওয়া জায়েয নয়।"
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) এ বলা হয়েছে:
"যাদু নিরাময়ের জন্য কুরআন ও সহীহ দু'আ দ্বারা চিকিৎসা করা মুস্তাহাব। কিন্তু যে ব্যক্তি যাদু নিরাময়ের নামে শিরক বা কুসংস্কার করে, তার কাছে যাওয়া হারাম।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া তে আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"যাদু-টোনার চিকিৎসার জন্য কুরআন-সুন্নাহর বর্ণিত পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। কোনো অজ্ঞ ব্যক্তির কাছে গিয়ে অন্ধভাবে নির্দেশনা নেওয়া উচিত নয়।"
৬. আপনার করণীয়
১. আপনি যদি জ্বিন-যাদু বা কোনো রোগে আক্রান্ত হন, তবে প্রথমে বৈধ চিকিৎসক দেখান। ২. রুকইয়াহ করুন—নিজে করুন বা কোনো বিশ্বস্ত আলেম থেকে করান। ৩. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও যিকির-আযকারে থাকুন। ৪. সন্দেহজনক ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকুন যারা কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনো পদ্ধতি বলে। ৫. আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পড়ুন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
যে ব্যক্তি বলেছে "শুধু রুকইয়াহ করলে হবে না, তদবির করতে হবে" এবং তদবিরকে কুরআন-হাদিসসম্মত বলে দাবি করছে কিন্তু তার পদ্ধতি শরীয়তসম্মত নয়, সে সন্দেহজনক। ইসলামে রুকইয়াহ এবং বৈধ ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা জায়েয। তবে যারা জ্বিন-যাদু নিরাময়ের নামে কুসংস্কার বা শিরকী পদ্ধতি অবলম্বন করে, তাদের থেকে চিকিৎসা নেওয়া জায়েয নয়। আপনার উচিত কুরআন-সুন্নাহসম্মত পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা এবং সন্দেহজনক ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।