সরকারি অফিসের বরাদ্দকৃত জিনিস ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি সরকারি চাকরি করি। আমাদের অফিসের সরকারি কাজের জন্য কিছু জিনিস/সামগ্রী বরাদ্দ থাকে। এসব জিনিস অফিসের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের কাছে চাইলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (স্যার) আমাকে দেন।
আমার প্রশ্ন হলো—এই সরকারি বরাদ্দকৃত জিনিস আমি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করতে পারব কি? যেমন, অফিসের কাজের জন্য বরাদ্দকৃত কোনো জিনিস স্যার আমাকে দিলে সেটা কি আমার নিজের সম্পত্তি হয়ে যায়, নাকি সরকারি সম্পত্তি হিসেবেই থাকে?
আর যদি স্যার নিজে অনুমতি দিয়ে বলেন যে, “তুমি এটা নিয়ে যাও/ব্যবহার করো”, তাহলে সেটা ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত হবে কি? এক্ষেত্রে আমার বেতন তো সরকারি কাজ করার বিনিময়ে দেওয়া হয়।
সরকারি সম্পত্তি হওয়ার কারণে এতে আমানত, হক্কুল ইবাদ বা অন্য কোনো শরয়ি সমস্যা আছে কি না—কুরআন-হাদিস ও ফিকহের দলিলসহ বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো, সরকারি কাজের জন্য বরাদ্দকৃত জিনিস (যেমন: স্টেশনারি, জ্বালানি তেল, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য সামগ্রী) যা অফিসের প্রয়োজনে আপনাকে দেওয়া হয়, তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েজ কিনা। এমনকি উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (স্যার) যদি অনুমতি দেন, তবুও এর শরয়ী বিধান কী?
উত্তর হলো: সরকারি বরাদ্দকৃত জিনিস (যা সরকারি সম্পত্তি বা বায়তুল মালের অন্তর্ভুক্ত) ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। এটি খিয়ানত (আমানতের খিয়ানত) এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি উর্ধ্বতন কর্মকর্তা (স্যার) যদি অনুমতি দেন, তবুও তা জায়েজ হবে না, কারণ সরকারি সম্পত্তির উপর উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানা নেই; তিনি শুধুমাত্র তত্ত্বাবধায়ক। সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার তার নেই। এটি একটি গুরুতর গুনাহের কাজ।
কুরআন ও হাদিসের দলিল:
১. কুরআনুল কারিম: আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সাথে খিয়ানত করো না এবং জেনে-শুনে নিজেদের আমানতের (প্রতিশ্রুতি ও গচ্ছিত সম্পদের) খিয়ানত করো না।" (সূরা আনফাল: ২৭)
এই আয়াতে "আমানত" শব্দটি সাধারণ, যা দ্বারা সরকারি সম্পদ, অফিসের মালামাল, এমনকি যেকোনো গচ্ছিত সম্পদকেও বোঝানো হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে আপনার কাছে অর্পিত সরকারি সম্পদ একটি আমানত। তা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা এই আমানতের খিয়ানত।
২. হাদিসে রাসূল (সাঃ): রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا، فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ "আমরা যাকে কোনো কাজে নিয়োজিত করি এবং তাকে বেতন (রিজক) প্রদান করি, এরপর সে (কাজের বাইরে) যা কিছু গ্রহণ করে, তা গুলুল (খিয়ানত/আত্মসাৎ)।" (সুনানে আবু দাউদ: ২৯৪৩)
এই হাদিসটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সরকারি কাজের বিনিময়ে বেতন দেওয়া হয়। বেতনের বাইরে সরকারি সম্পদ থেকে কোনো কিছু নেওয়া বা ব্যবহার করা গুলুল (খিয়ানত) এর শামিল, যা কবিরা গুনাহ।
৩. আরেকটি হাদিস: হযরত আদী ইবনে আমিরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ مِنْكُمْ عَلَى عَمَلٍ فَكَتَمَنَا مِخْيَطًا فَمَا فَوْقَهُ، كَانَ غُلُولًا يَأْتِي بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিকে আমরা কোনো কাজে নিয়োজিত করি, সে যদি একটি সুচ (সূচ) বা তার চেয়ে ছোট জিনিসও গোপন করে (আত্মসাৎ করে), তবে তা গুলুল (খিয়ানত) হিসেবে গণ্য হবে এবং কিয়ামতের দিন সে তা (বোঝা হিসেবে) নিয়ে আসবে।" (সহীহ মুসলিম: ১৮৩৩)
ফিকহের দলিল ও হানাফি কিতাবের আলোচনা:
১. রদ্দুল মুহতার (আল-হাকিকাহ আল-মুহাম্মাদিয়্যাহ): ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ)在其著名的著作《রদ্দুল মুহতার》中明确指出,任何受委托管理公共财产(如政府资产或宗教基金)的人,都无权将这些财产用于个人目的。他写道:
وَلَيْسَ لِلْوَالِي وَلَا لِلْأَجِيرِ أَنْ يَأْخُذَا مِنْ مَالِ الْبَيْتِ شَيْئًا لِأَنْفُسِهِمَا إِلَّا بِقَدْرِ الْحَاجَةِ الضَّرُورِيَّةِ فِي الْعَمَلِ "শাসক বা কর্মচারীর জন্য বায়তুল মাল (সরকারি কোষাগার) থেকে নিজেদের জন্য কোনো কিছু নেওয়া জায়েজ নয়, তবে কাজের প্রয়োজনীয় পরিমাণ (যেমন: কাজের সরঞ্জাম) ছাড়া।"
২. ফাতাওয়া আলমগীরী (হিন্দিয়া): এই বিশ্বস্ত হানাফি ফতোয়ার গ্রন্থে বলা হয়েছে:
الْمُسْتَأْجَرُ إذَا أَخَذَ مِنْ مَالِ الْمُسْتَأْجِرِ شَيْئًا بِغَيْرِ إذْنِهِ كَانَ خَائِنًا "কর্মচারী যদি মালিকের (এখানে সরকারের) অনুমতি ছাড়া তার সম্পদ থেকে কিছু গ্রহণ করে, তবে সে খায়েন (বিশ্বাসঘাতক) হবে।"
৩. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী): মুফতি তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম)在其著作中详细讨论了政府雇员的职责。他强调,政府雇员的工资是对其工作的报酬,而政府提供的物资(如文具、燃料等)是用于完成特定任务的工具。将这些物资用于个人用途,即使得到直接上司的许可,也是不允许的,因为上司没有权力将公共财产私有化。他写道:
سرکاری ملازم کے لیے سرکاری سامان کو ذاتی استعمال میں لانا قطعاً جائز نہیں، خواہ افسر اجازت دے دے، کیونکہ افسر کو یہ اختیار نہیں کہ وہ بیت المال کا مال کسی کو ہبہ کر دے۔ "সরকারি কর্মচারীর জন্য সরকারি সামগ্রী ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ নয়, এমনকি অফিসার অনুমতি দিলেও, কারণ অফিসারের এখতিয়ার নেই যে তিনি বায়তুল মালের সম্পদ কাউকে হেবা (দান) করে দেবেন।"
৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া (মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী): এই কিতাবে উল্লেখ আছে যে, অফিসের জিনিসপত্র (যেমন: খাতা, কলম, এমনকি কাগজ) ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হারাম এবং এটি খিয়ানত। যদি কেউ এমনটি করে থাকে, তবে তার জন্য তওবা করা এবং যতটুকু সম্ভব তার মূল্য আদায় করা বা ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি।
৫. বাহিশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ) তার বিখ্যাত বই "বাহিশতী জেওর"-এ চাকরিজীবীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন:
"যে ব্যক্তি সরকারি বা অফিসের কাজে নিয়োজিত, তার জন্য অফিসের জিনিস (যেমন: কাগজ, কলম, খাম) নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা জায়েজ নয়। এটি একটি বড় গুনাহ এবং আমানতের খিয়ানত।"
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
১. সরকারি বরাদ্দকৃত জিনিস ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা যাবে কি?
- না, কখনোই যাবে না। এটি সরকারি সম্পত্তি (বায়তুল মালের মাল)। এটি ব্যবহার করা আপনার জন্য হারাম। এটি আপনার কাছে আমানত হিসেবে রয়েছে, মালিকানা হিসেবে নয়। তাই এটি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করলে আপনি খিয়ানতকারী হবেন।
২. স্যার (উর্ধ্বতন কর্মকর্তা) দিলে সেটা কি আমার নিজের সম্পত্তি হয়ে যাবে?
- না, হবে না। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরকারি সম্পদের মালিক নন; তিনি শুধুমাত্র একজন তত্ত্বাবধায়ক বা ব্যবস্থাপক। সরকারি সম্পদ কাউকে দান বা হেবা করার এখতিয়ার তার নেই। তাই তিনি আপনাকে জিনিসটি দিলেও সেটা আপনার বৈধ সম্পত্তি হবে না। আপনি যদি তা গ্রহণ করেন এবং ব্যবহার করেন, তবে আপনি এবং তিনি উভয়েই গুনাহগার হবেন।
৩. স্যার যদি অনুমতি দেন, তাহলে কি ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত হবে?
- না, হবে না। কারণ, যে ব্যক্তির মালিকানা নেই, তার অনুমতি দেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। শুধুমাত্র সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান (বা তার পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ) এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সাধারণ অফিসারের এই ক্ষমতা নেই। তাই তার অনুমতি শরয়ী দৃষ্টিতে অগ্রাহ্য।
৪. এতে কি আমানত, হক্কুল ইবাদ বা অন্য কোনো শরয়ি সমস্যা আছে?
- অবশ্যই আছে। এটি একটি গুরুতর শরয়ি অপরাধ। এর মধ্যে রয়েছে:
- আমানতের খিয়ানত: সরকারি সম্পদ আপনার কাছে আমানত, তা আত্মসাৎ করা খিয়ানত।
- হক্কুল ইবাদ: সরকারি সম্পদ实质上是所有纳税人的财产। এটি ব্যবহার করা জনগণের অধিকার নষ্ট করা।
- গুলুল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আত্মসাৎ): হাদিসে একে গুলুল বলা হয়েছে, যা কবিরা গুনাহ।
করণীয় ও তওবার নিয়ম:
১. তওবা করা: আপনি যদি অতীতে এমনটি করে থাকেন, তবে এখনই আন্তরিকভাবে তওবা করুন। আল্লাহ তাআলা তওবা কবুল করেন। ২. ক্ষতিপূরণ: যেসব জিনিস ব্যবহার করেছেন, তার মূল্য হিসাব করে সরকারি কোষাগারে (বা অফিসের তহবিলে) জমা দেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি সম্ভব না হয়, তবে অন্তত ভবিষ্যতে বিরত থাকুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ৩. সতর্কতা: ভবিষ্যতে অফিসের কোনো জিনিস (এমনকি একটি কাগজ বা কলমও) ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। প্রয়োজনে নিজের টাকায় ব্যক্তিগত জিনিস কিনে ব্যবহার করুন।
উপসংহার:
সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে আপনার বেতন হলো আপনার কাজের বিনিময়। সরকারি বরাদ্দকৃত জিনিস (যেমন: স্টেশনারি, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি) শুধুমাত্র অফিসের কাজ সম্পাদনের জন্য। এগুলো ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হারাম, গুনাহ এবং খিয়ানত। উর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি এটাকে হালাল করতে পারে না। তাই সর্বদা সতর্ক থাকুন এবং আল্লাহর ভয় রাখুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিকের তাওফিক দিন। আমিন।