বিয়ে কখন হারাম,কখন সুন্নত, কখন ফরজ?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4985
Questioner: Shahriar Musfik
Question Asked: 05 Sep 2026, 07:52 AM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 07:57 AM
Views: 11
Tokens: 3,657
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ে কখন হারাম,কখন সুন্নত, কখন ফরজ?

Answer

বিয়ে কখন হারাম, কখন সুন্নত, কখন ফরজ?

ভূমিকা

বিয়ে (নিকাহ) ইসলামী জীবনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, বিয়ের হুকুম (আহকাম) ব্যক্তির শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক অবস্থার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. বিয়ে ফরজ (অবশ্য কর্তব্য) কখন?

বিয়ে তখন ফরজ হয় যখন:

  • ব্যক্তির মধ্যে প্রবল যৌনক্ষুধা থাকে এবং যিনার (ব্যভিচারের) আশঙ্কা প্রবল হয়।
  • ব্যক্তি নিয়মিত নামাজ, রোজা ইত্যাদি পালনে সক্ষম এবং স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য রাখে।
  • ব্যক্তি নিশ্চিতভাবে জানতে পারে যে, বিবাহ না করলে সে নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হয়ে পড়বে।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ۝ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ "আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, তবে নিজেদের স্ত্রী বা মালিকানাধীন দাসীদের ব্যাপারে ছাড়া।" (সূরা আল-মু'মিনুন: ৫-৬)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ "হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা সামর্থ্য রাখে, তারা যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।" (সহিহ বুখারী: ৫০৬৬, সহিহ মুসলিম: ১৪০০)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যার মধ্যে যৌনক্ষুধা প্রবল এবং যিনার আশঙ্কা থাকে, তার জন্য বিবাহ করা ফরজ (ওয়াজিব)। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-ও অনুরূপ মত দিয়েছেন। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/২২৯; আল-মাবসুত, ৪/১৯২)


২. বিয়ে ওয়াজিব কখন?

বিয়ে তখন ওয়াজিব হয় যখন:

  • ব্যক্তির যৌনক্ষুধা প্রবল এবং যিনার আশঙ্কা থাকে, কিন্তু স্ত্রীর ভরণপোষণের সামর্থ্য না থাকলেও কোনোভাবে সংসার চালাতে পারবে বলে আশা করে।
  • অথবা ব্যক্তির যৌনক্ষুধা প্রবল, তবে নিশ্চিত যিনার আশঙ্কা না থাকলেও প্রবল ধারণা হয়।

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যিনার আশঙ্কা প্রবল হলে বিবাহ ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৫)


৩. বিয়ে সুন্নত কখন?

বিয়ে তখন সুন্নত (মুস্তাহাব) হয় যখন:

  • ব্যক্তির যৌনক্ষুধা স্বাভাবিক থাকে এবং যিনার তেমন আশঙ্কা নেই।
  • ব্যক্তির আর্থিক ও শারীরিক সামর্থ্য রয়েছে।
  • ব্যক্তি বিবাহের মাধ্যমে সন্তান লাভে আগ্রহী এবং দ্বীনি পরিবেশে পরিবার গঠন করতে চায়।

দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي "বিয়ে আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নতের উপর আমল করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৬)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ "আর তোমরা বিবাহ দাও তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের এবং তোমাদের সৎ দাস-দাসীদের।" (সূরা আন-নূর: ৩২)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: যে ব্যক্তি বিবাহ না করেও পবিত্র থাকতে পারবে বলে নিশ্চিত এবং যার যৌনক্ষুধা স্বাভাবিক, তার জন্য বিবাহ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৫)


৪. বিয়ে হারাম কখন?

বিয়ে তখন হারাম হয় যখন:

  • ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য নেই এবং স্ত্রীর ভরণপোষণ (খোরপোষ) দিতে অক্ষম হবে বলে নিশ্চিত ধারণা হয়।
  • ব্যক্তি শারীরিকভাবে অক্ষম (যেমন: পুরুষত্বহীন) এবং স্ত্রীর হক আদায় করতে পারবে না বলে নিশ্চিত জানে।
  • ব্যক্তি নিশ্চিত জানে যে, বিবাহ করলে সে স্ত্রীর উপর অত্যাচার/নির্যাতন করবে বা স্ত্রীর হক নষ্ট করবে।
  • বিবাহের মাধ্যমে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে (যেমন: স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য হারাম উপার্জন করতে বাধ্য হবে)।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ "আর যারা বিবাহের সামর্থ্য পায় না, তারা যেন পবিত্র থাকে, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেন।" (সূরা আন-নূর: ৩৩)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: যে ব্যক্তির ভরণপোষণের সামর্থ্য নেই এবং বিবাহ করলে স্ত্রীর হক নষ্ট হবে বলে নিশ্চিত ধারণা হয়, তার জন্য বিবাহ হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৫)


৫. বিয়ে মাকরুহ (অপছন্দনীয়) কখন?

বিয়ে তখন মাকরুহ (তাহরিমি) হয় যখন:

  • ব্যক্তির যৌনক্ষুধা নেই (যেমন: বৃদ্ধ, দুর্বল) এবং সন্তানের প্রতি আগ্রহ নেই।
  • ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য সীমিত এবং স্ত্রীর হক আদায়ে অপারগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে নিশ্চিত নয়।

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: যে ব্যক্তির যৌনক্ষুধা নেই এবং সন্তানও চায় না, তার জন্য বিবাহ মাকরুহ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫)


৬. বিয়ে মুবাহ (জায়েয) কখন?

বিয়ে তখন মুবাহ (জায়েয) হয় যখন:

  • ব্যক্তির যৌনক্ষুধা নেই, কিন্তু সন্তান লাভের ইচ্ছা আছে।
  • অথবা ব্যক্তির যৌনক্ষুধা আছে, কিন্তু বিবাহ না করলেও যিনার আশঙ্কা নেই এবং বিবাহ করলেও বিশেষ কোনো উপকার নেই।

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি: যে ব্যক্তির যৌনক্ষুধা নেই কিন্তু সন্তান লাভের ইচ্ছা আছে, তার জন্য বিবাহ মুবাহ। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫)


সারসংক্ষেপ (তালিকাভুক্ত):

| অবস্থা | হুকুম | |--------|-------| | যৌনক্ষুধা প্রবল + যিনার আশঙ্কা + ভরণপোষণের সামর্থ্য | ফরজ | | যৌনক্ষুধা প্রবল + যিনার আশঙ্কা (কিন্তু সামর্থ্য সীমিত) | ওয়াজিব | | স্বাভাবিক যৌনক্ষুধা + সামর্থ্য + দ্বীনদারিতা রক্ষার ইচ্ছা | সুন্নত | | ভরণপোষণের সামর্থ্য নেই + স্ত্রীর হক নষ্টের আশঙ্কা | হারাম | | যৌনক্ষুধা নেই + সন্তানের ইচ্ছা নেই | মাকরুহ | | যৌনক্ষুধা নেই + সন্তানের ইচ্ছা আছে | মুবাহ |


গুরুত্বপূর্ণ নোট:

১. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যিনার আশঙ্কা প্রবল হলে বিবাহ ফরজ এবং আশঙ্কা না থাকলে সুন্নত। (আল-মাবসুত, ৪/১৯২)

২. ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, যিনার আশঙ্কা প্রবল হলে বিবাহ ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/২২৯)

৩. ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মতে, যিনার আশঙ্কা প্রবল হলেও বিবাহ সুন্নত, ফরজ নয়। তবে হানাফি মাজহাবে উক্ত মত গ্রহণযোগ্য নয়।

৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া-তে বলা হয়েছে: "যে ব্যক্তি যিনার আশঙ্কায় রয়েছে, তার জন্য বিবাহ ওয়াজিব; আর যে ব্যক্তি যিনার আশঙ্কায় নেই, তার জন্য বিবাহ মুস্তাহাব (সুন্নত)।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/২৭৫)

৫. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর রদ্দুল মুহতার-এ বলেন: "বিবাহের হুকুম ব্যক্তির অবস্থা অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়—কারো জন্য ফরজ, কারো জন্য ওয়াজিব, কারো জন্য সুন্নত, কারো জন্য হারাম, কারো জন্য মাকরুহ।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫)


উপসংহার:

বিয়ের হুকুম নির্ধারণে ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক অবস্থা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের অবস্থা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। সাধারণভাবে বলা যায়:

  • যার যিনার আশঙ্কা আছে এবং সামর্থ্য আছে → তার জন্য বিবাহ ফরজ/ওয়াজিব।
  • যার স্বাভাবিক অবস্থা এবং সামর্থ্য আছে → তার জন্য বিবাহ সুন্নত।
  • যার সামর্থ্য নেই এবং স্ত্রীর হক আদায়ে অক্ষম → তার জন্য বিবাহ হারাম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনি জ্ঞান অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহ:

  • আল-কুরআন (সূরা আন-নূর: ৩২-৩৩, সূরা আল-মু'মিনুন: ৫-৬)
  • সহিহ বুখারী: ৫০৬৬
  • সহিহ মুসলিম: ১৪০০
  • সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৪৬
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন): ৩/৫
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/২৭৫
  • আল-মাবসুত (সারাখসি): ৪/১৯২
  • বাদায়েউস সানায়ে: ২/২২৯

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.