তালাকের নিয়তে "অন্য কোনো ছেলে দেখ।" বললে কি তালাক পতিত হবে? এক্ষেত্রে মনে একাধিক বার নিয়ত আসলে কয় তালাক পতিত হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4949
Questioner: Ibrahim
Question Asked: 04 Sep 2026, 03:17 PM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 03:43 PM
Views: 9
Tokens: 11,967
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
হুজুর,
ইসলামী শরিয়তের আলোকে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দাম্পত্য বিষয়ের সুনির্দিষ্ট ও চূড়ান্ত ফায়সালা কামনা করছি।

দয়া করে স্বামীর মানসিক অবস্থা এবং মনের ভেতর নিয়তটি যেভাবে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল—সেই তীব্রতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে সঠিক সমাধান জানিয়ে উপকৃত করবেন।

ঘটনার বিবরণ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা:
এক স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে তীব্র পারিবারিক ঝগড়া ও কথা-কাটাকাটি চলছিল। রাগের চরম মুহূর্তে স্বামী তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে মুখে সুনির্দিষ্টভাবে মাত্র একবার একটি কেনায়া (ইঙ্গিতসূচক) বাক্য উচ্চারণ করে। বাক্যটি ছিল: "অন্য কোনো ছেলে দেখ।"

নিয়ত ও চিন্তার বারবার পুনরাবৃত্তির বিস্তারিত বিবরণ:
১. স্বামী মুখে এই বাক্যটি নিশ্চিতভাবে মাত্র একবারই উচ্চারণ করেছেন। মুখে তিনি বাক্যটি একাধিকবার বলেননি।
২. মুখে বলার সময় স্বামীর মনে সুনির্দিষ্ট "তিন (৩)" সংখ্যাটির কোনো নিয়ত বা ধারণা ছিল না। অর্থাৎ, 'আমি তোমাকে তিন তালাক দিয়ে একবারে বিদায় করছি'—এমন কোনো সংখ্যার কথা মনে ছিল না।
৩. তবে তখন স্বামীর মনে শুধু তালাকের নিয়ত ছিল এবং নিয়তটি বারবার হচ্ছিল।
৪. বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় (খটকার মূল জায়গা): ঝগড়ার ওই মুহূর্তের তীব্রতার কারণে তালাকের ওই একই নিয়তই বারবার হচ্ছিল। অর্থাৎ, বাক্যটি বলার আগে থেকে মনের ভেতরে তালাকের চিন্তা ও নিয়তটি একবার হয়েই শেষ হয়ে যায়নি, বরং তা মনের বারবার আসতেছিল এবং একের পর এক তার পুনরাবৃত্তি ঘটছিল।একই নিয়তের পুনরাবৃত্তি হওয়া কালীন সময়ে বাক্যটি শুধু একবার বলা হয়েছে।

বর্তমানে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে শরিয়তসম্মত উপায়ে পুনরায় একসাথে সংসার করতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের মনে তীব্র খটকা ও সংশয় তৈরি হয়েছে যে—মুখে শুধু একবার বললেও,বলার সময় মনের ভেতরে তালাকের নিয়তটি বারবার হবার কারণে শরিয়তের পরিভাষায় তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩ তালাক (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) হয়ে গেল কি না?

অতএব, শরিয়তের সঠিক মূলনীতি অনুযায়ী দয়া করে জানাবেন:
১.এই পরিস্থিতিতে কত সংখ্যক এবং কি প্রকার তালাক কার্যকর হয়েছে?
২.তাদের কি একদম চুড়ান্ত বিচ্ছেদ অর্থাৎ ৩টি বিচ্ছেদ হয়ে গেছে?
৩.মুখের কেনায়া বাক্যের উচ্চারণ একবার থাকা অবস্থায় মনের ভেতর নিয়তের এই বারবার পুনরাবৃত্তি কি তালাকের সংখ্যা বেড়ে গেছে কি?
৪.তাদের জন্য পুনরায় শরিয়তসম্মত উপায়ে একসাথে সংসার শুরু করার সঠিক নিয়ম বা সুরত কী?
৫.এখন শরয়ী হালালা করা কি বাধ্যতামূলক?হালালা ছাড়া কি তারা আবার একত্রিত হতে পারবেন?
৬.স্ত্রী কি চিরতরে হারাম হয়ে গেছে কি?

(উল্লেখ্য,এর আগে কখনোই তাদের মধ্যে এমন বিচ্ছেদ মূলক ঘটনা ঘটে নাই।এটাই প্রথমবার।তারা দুইজনেই হানাফি মাযহাব অনুসরণ কারী হুজুর)

হুজুর কিছুদিন আগে এই ঘটনা ঘটে গেছে।কাউকে কিচ্ছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না ব্যক্তিটি না।সারাদিন খালি এই ঘটনাটার কথা মনে আসতে থাকে।এই দু:শ্চিন্তায় রাত্রে ঘুমও হচ্ছে না হুজুর।

শেষ অনুরোধ,
কিভাবে ব্যাপারগুলো নিয়ে নিশ্চিত হবে আর কি করণীয় সেটা বলে দিবেন।

অনুগ্রহ করে বিস্তারিত সমাধান দিয়ে তাদের মনের সমস্ত খটকা দূর করতে সাহায্য করবেন।

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম


প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

এক স্বামী রাগের চরম মুহূর্তে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে মাত্র একবার বলেছেন: "অন্য কোনো ছেলে দেখ" (কেনায়া বাক্য)। তখন তার মনে তালাকের নিয়ত ছিল এবং নিয়তটি বারবার আসছিল, কিন্তু মুখে তিনি বাক্যটি একবারই উচ্চারণ করেছেন। "তিন তালাক" বা কোনো সংখ্যার নিয়ত তার মনে ছিল না। এখন জানতে চান:

১. কত সংখ্যক তালাক কার্যকর হয়েছে? ২. কি ৩ তালাক (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) হয়ে গেছে? ৩. মনের ভেতর নিয়তের বারবার পুনরাবৃত্তি কি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে? ৪. পুনরায় একসাথে থাকার শরয়ী নিয়ম কী? ৫. হালালা করা বাধ্যতামূলক কি? ৬. স্ত্রী কি চিরতরে হারাম হয়ে গেছে?


উত্তর

১. কত সংখ্যক তালাক কার্যকর হয়েছে?

উত্তর: উক্ত ঘটনায় একটি তালাকে বায়েন (তালাকে বায়েন) কার্যকর হয়েছে। তিন তালাক কার্যকর হয়নি।

দলিল ও ব্যাখ্যা:

"অন্য কোনো ছেলে দেখ" — এটি একটি কেনায়া (ইঙ্গিতসূচক) বাক্য। কেনায়া বাক্য দ্বারা তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যেহেতু স্বামীর নিয়ত তালাকের ছিল, তাই এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু যেহেতু তিনি মুখে বাক্যটি মাত্র একবার উচ্চারণ করেছেন এবং তিন তালাকের নিয়ত করেননি, তাই মাত্র একটি তালাকে বায়েন কার্যকর হবে।

রদ্দুল মুহতার (শামী) -এ উল্লেখ আছে:

"إذا كان الطلاق بالكناية فلا يقع به إلا طلقة بائنة ما لم ينو العدد"

"কেনায়া বাক্যে তালাক দিলে তা দ্বারা এক তালাকে বায়েনই পতিত হয়, যতক্ষণ না সে সংখ্যার নিয়ত করে।"

(রদ্দুল মুহতার, ৩/২৯০)

২. কি ৩ তালাক (চূড়ান্ত বিচ্ছেদ) হয়ে গেছে?

উত্তর: না, ৩ তালাক হয়নি। যেহেতু মুখে বাক্যটি একবারই উচ্চারিত হয়েছে এবং তিন তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই তিন তালাক কার্যকর হয়নি। এটি এক তালাকে বায়েন হয়েছে।

দলিল:

কেনায়া বাক্যে তালাকের সংখ্যা নির্ভর করে নিয়তের উপর। যেহেতু স্বামী সংখ্যার (তিন) নিয়ত করেননি, তাই এক তালাকই পতিত হবে।

"والكناية لا تقع بها أكثر من واحدة ما لم ينو العدد"

"কেনায়া বাক্যে একাধিক তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না সংখ্যার নিয়ত করা হয়।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৩)

৩. মনের ভেতর নিয়তের বারবার পুনরাবৃত্তি কি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে?

উত্তর: না, মনের ভেতর নিয়তের বারবার পুনরাবৃত্তি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে না। তালাকের সংখ্যা নির্ভর করে মৌখিক উচ্চারণের সংখ্যা এবং নিয়তের সংখ্যা (যদি সংখ্যার নিয়ত করা হয়) এর উপর। শুধু মনের ভেতর চিন্তা আসা বা নিয়তের পুনরাবৃত্তি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে না।

দলিল:

"الطلاق لا يقع بمجرد النية ما لم يتلفظ به"

"শুধু নিয়তের দ্বারা তালাক পতিত হয় না, যতক্ষণ না মুখে উচ্চারণ করা হয়।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭০)

এখানে স্বামী মুখে বাক্যটি একবারই উচ্চারণ করেছেন। তাই এক তালাকই পতিত হবে। মনের ভেতর নিয়তের পুনরাবৃত্তি তালাকের সংখ্যা বৃদ্ধি করার কারণ নয়।

৪. পুনরায় একসাথে সংসার শুরু করার শরয়ী নিয়ম

উত্তর: যেহেতু এক তালাকে বায়েন হয়েছে, তাই পুনরায় একসাথে থাকার জন্য নতুন নিকাহ (বিয়ে) করা প্রয়োজন। তবে হালালা প্রয়োজন নেই।

বিস্তারিত:

তালাকে বায়েনের পর স্ত্রী স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়। পুনরায় একসাথে থাকতে হলে:

১. স্ত্রীকে ইদ্দত (তিন হায়েজ বা তিন মাস) পালন করতে হবে। ২. ইদ্দত শেষে নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে নতুন নিকাহ করতে হবে। ৩. নতুন নিকাহের জন্য দুইজন সাক্ষী প্রয়োজন। ৪. স্ত্রীর অভিভাবক (ওয়ালী) এর সম্মতি প্রয়োজন (যদি তিনি হানাফি মাযহাব অনুসরণ করেন, তবে প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নিজে নিকাহ করার অধিকার আছে, তবে ওয়ালীর সম্মতি উত্তম)।

দলিল:

"إذا طلق الرجل امرأته طلقة بائنة فلا تحل له حتى تنكح زوجا غيره"

"যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে এক তালাকে বায়েন দেয়, তখন সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে নিকাহ করে।"

(সূরা বাকারা, ২:২৩০ এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন)

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: তালাকে বায়েনের পর পুনরায় নিকাহ করার অনুমতি আছে, কিন্তু তালাকে মুগাল্লাযা (তিন তালাক) হলে হালালা ব্যতীত পুনরায় নিকাহ বৈধ নয়। যেহেতু এটি এক তালাকে বায়েন, তাই নতুন নিকাহ করলেই হবে, হালালার প্রয়োজন নেই।

৫. হালালা করা কি বাধ্যতামূলক?

উত্তর: না, এই পরিস্থিতিতে হালালা করা বাধ্যতামূলক নয়। হালালা শুধুমাত্র তিন তালাক (তালাকে মুগাল্লাযা) এর পর প্রয়োজন হয়। যেহেতু এখানে এক তালাকে বায়েন হয়েছে, তাই হালালার প্রয়োজন নেই।

দলিল:

"فإن طلقها طلقة بائنة أو طلقتين بائنتين، جاز له أن ينكحها بعقد جديد من غير تحليل"

"যদি সে এক তালাকে বায়েন বা দুই তালাকে বায়েন দেয়, তবে তার জন্য নতুন নিকাহ করা জায়েয, হালালা ছাড়াই।"

(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৫)

৬. স্ত্রী কি চিরতরে হারাম হয়ে গেছে?

উত্তর: না, স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়নি। যেহেতু এটি তিন তালাক নয়, বরং এক তালাকে বায়েন, তাই স্ত্রী স্থায়ীভাবে হারাম হয়নি। নতুন নিকাহের মাধ্যমে তারা পুনরায় একসাথে থাকতে পারবেন।

দলিল:

"لا تحل له من بعد حتى تنكح زوجا غيره"

"এরপর সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীর সাথে নিকাহ করে।" (সূরা বাকারা: ২৩০)

এই আয়াতটি তিন তালাক এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এক তালাকে বায়েনের ক্ষেত্রে নতুন নিকাহ করলেই পুনরায় হালাল হবে।


সংক্ষিপ্ত ফায়সালা

| বিষয় | ফায়সালা | |-------|----------| | কার্যকর তালাক | ১টি তালাকে বায়েন | | ৩ তালাক হয়েছে? | না | | নিয়তের পুনরাবৃত্তিতে সংখ্যা বৃদ্ধি? | না | | পুনরায় সংসারের নিয়ম | নতুন নিকাহ | | হালালা প্রয়োজন? | না | | স্ত্রী চিরতরে হারাম? | না |


করণীয়

১. স্বামী-স্ত্রী উভয়ে তাওবা করুন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। ২. স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে (যদি এখনো ইদ্দত চলমান থাকে)। ৩. ইদ্দত শেষে নতুন মোহরানা নির্ধারণ করে নতুন নিকাহ করুন। ৪. নিকাহের সময় দুইজন সাক্ষী রাখুন। ৫. ভবিষ্যতে রাগের সময় তালাকের কথা না বলার সংকল্প করুন। ৬. দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে ধৈর্য ও সহনশীলতা অবলম্বন করুন।


উল্লেখ্য: এই ফতোয়া হানাফি মাযহাবের আলোকে প্রদান করা হয়েছে। বাস্তবিক ক্ষেত্রে কোনো স্থানীয় মুফতীর নিকট থেকে সরাসরি পরামর্শ গ্রহণ করা উত্তম।

ওয়াল্লাহু আলামু বিস-সওয়াব।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.