পারিবারিক প্রব্লেম ও আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন সম্পর্কে জানতে চাই।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার স্বামীর বড়ভাইয়ের স্ত্রী কয়েকদিন পরপরেই তার চাহিদামতো কিছু না করলেই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, যোগাযোগ করতে গেলেও দুরব্যাবহার করে। এইভাবে স্বামী স্ত্রির মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে, স্ত্রীর মানসিক সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, নিজেদের দৈনন্দিন জিবনের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। এক্ষেত্রে স্ত্রী কি তার দিক থেকে তার স্বামীর বরভাইয়ের স্ত্রির সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে পারবে নাকি স্ত্রী জাহান্নামি হয়ে যাবে
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়ার পর, আপনার জন্য একটি স্পষ্ট এবং যুক্তিসঙ্গত উত্তর দেওয়া হলো। আপনি যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তা সত্যিই কষ্টদায়ক এবং পারিবারিক শান্তি বিঘ্নিত করার মতো। ইসলাম কখনোই কারো দ্বারা অন্যায় ও কষ্ট সহ্য করতে বাধ্য করে না।
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো, আপনি আপনার দিক থেকে আপনার স্বামীর বড় ভাবির (জা-এর) সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে পারবেন এবং এর জন্য আপনি জাহান্নামি হবেন না। বরং, যে ব্যক্তি অকারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং অন্যদের কষ্ট দেয়, সে নিজেই ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহগার হবে।
এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হলো:
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার নিষেধাজ্ঞা: ইসলামে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের (যেমন: ভাই, বোন, চাচা, ফুফু) সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু আপনার স্বামীর ভাইয়ের স্ত্রী আপনার বা আপনার স্বামীর রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় নন। তিনি হলেন "আত্মীয়" (যেমন: শাশুড়ি, দেবর, জা-এর সাথে সম্পর্ক) যারা বিবাহের মাধ্যমে সম্পর্কিত হন। এই সম্পর্কগুলো বজায় রাখা উত্তম এবং সওয়াবের কাজ, তবে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের মতো কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক নয়। যদি এই সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে আপনার ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো ক্ষতি হয়, অথবা আপনার ও আপনার স্বামীর মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়, তাহলে সেই সম্পর্ক থেকে দূরত্ব বজায় রাখা বৈধ হবে।
২. ক্ষতি দূর করা: ইসলামের একটি মূলনীতি হলো, "লা দারারা ওয়া লা দিরার" অর্থাৎ "নিজের ক্ষতিও করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৩৪১)। আপনার শাশুড়ি (জা) আপনার প্রতি যে আচরণ করছেন, তাতে আপনার মানসিক শান্তি নষ্ট হচ্ছে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে এবং দাম্পত্য জীবনেও অশান্তি তৈরি হচ্ছে। এই অবস্থায় নিজেকে রক্ষা করার জন্য এবং আপনার সংসারের শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তার সাথে যোগাযোগ সীমিত করা বা বন্ধ করা সম্পূর্ণ বৈধ। এটি কোনো গুনাহ নয়, বরং নিজের এবং নিজের পরিবারের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি জরুরি পদক্ষেপ।
৩. সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
"আর তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরকে সাহায্য করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
আপনার জা-এর আচরণ আপনার দাম্পত্য জীবনে বিভেদ সৃষ্টি করছে, যা একটি গুরুতর পাপ। এই পাপের কাজে আপনিও যদি নীরব থেকে তাকে সহযোগিতা করেন, তাহলে আপনিও গুনাহের অংশীদার হবেন। তাই তার অন্যায় আচরণের সাথে আপস না করে, তাকে তার কাজের পরিণতি বুঝিয়ে বলা এবং প্রয়োজন হলে তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা আপনার জন্য উত্তম।
৪. উত্তম পন্থা অবলম্বন: যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ না করে, আপনি চেষ্টা করতে পারেন:
- প্রথমে তাকে ভালোভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে তার আচরণে আপনার সংসারে সমস্যা হচ্ছে।
- সম্ভব হলে আপনার স্বামী এবং তার স্বামী (আপনার বড় শ্বশুর) উভয়ের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন, যাতে তারা মধ্যস্থতা করেন।
- যদি তবুও তার আচরণের কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে আপনি শালীনতা বজায় রেখে তার সাথে যোগাযোগের মাত্রা কমিয়ে দিন। অর্থাৎ, প্রয়োজনীয় বিষয়ে কথা বলবেন, কিন্তু তার ইচ্ছামতো আচরণ করা বা তার সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বজায় রাখা আপনার জন্য জরুরি নয়।
তবে দেখা সাক্ষাৎ হলে অবশ্যই সালাম বিনিময় করবেন।
সারসংক্ষেপ: আপনি জাহান্নামি হবেন না। বরং, আপনার জা-এর আচরণই ইসলামসম্মত নয়। আপনার কর্তব্য হলো নিজের সংসার ও মানসিক শান্তি রক্ষা করা। তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখা বা সীমিত করা আপনার জন্য বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। তবে চেষ্টা করবেন, কোনো রকম ঝগড়া বা কলহ না করে, নীরবে এবং শালীনভাবে দূরত্ব বজায় রাখতে। আপনার স্বামীকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন, কারণ দাম্পত্য জীবনে স্বামীর সমর্থনই সবচেয়ে বড় শক্তি।
তবে দেখা সাক্ষাৎ হলে অবশ্যই সালাম বিনিময় করবেন।
আল্লাহ তায়ালা আপনার সংসারে শান্তি বজায় রাখুন এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের তাওফিক দান করুন। (আমিন)
প্রাসঙ্গিক কিতাবের রেফারেন্স:
- সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ২৩৪১ (লা দারারা ওয়া লা দিরার)।
- সূরা আল-মায়িদা: আয়াত ২ (সৎকর্মে সহযোগিতা, পাপে নয়)।
- ফতোয়ায়ে উসমানি: আত্মীয়তার সম্পর্ক ও ক্ষতি দূরীকরণের নীতিমালা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।