তোমার এত শখ, দাঁড়াও আমি তোমার শখ আমি পূরণ করতেছি, তোমার বাপের সাথে কথা বলতেছি, তোমার বাপ নাম্বার দাও, তোমার বাহাদুরি আমি দেখাইতেছি, এদ্বারা কি তালাক হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4937
Questioner: Md. Yousuf Ali
Question Asked: 04 Sep 2026, 10:51 AM
Reviewed & Published: 04 Sep 2026, 11:15 AM
Views: 31
Tokens: 7,244
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্ত্রী বিভিন্ন সময় এরকম কথা বলে, যে অমুক মেয়ের সাথে কথা বললে আমার বাপে বাড়ি চলে যাবো, অমুক মেয়ের সাথে কথা বললে বাড়ি থেকে চলে যাবো। তো এইসব কথা আমি তাকে বারবার বলতে নিষেধ করি কারণ আমি ভাবি যে এসব কথা বললেও সমস্যা হবে। তো আমি বারবার তাকে এসব কথা বলতে নিষেধ করি। তো একদিন আমি খুব রেগে যাই। রেগে গিয়ে বলি যে তুমি বারবার এরকম কথা বলো কেন? আমি তো তোমাকে এই সমস্ত কথা বলতে নিষেধ করেছি, তারপরও তুমি বারবার কথা বলো কেন? তোমার এত শখ, দাঁড়াও আমি তোমার শখ আমি পূরণ করতেছি, তোমার বাপের সাথে কথা বলতেছি, তোমার বাপ নাম্বার দাও, তোমার বাহাদুরি আমি দেখাইতেছি, তোমার বাপের নাম্বার দাও, তোমার বাপের সাথে কথা বলি, তোমার বাহাদুরি আমি ছুটাইতেছি। তারপর একটু পরে বলেছি দাও আমার বাড়িতে আমার আব্বা বাবা মা যে আছে তার হাতে তোমার ফোনটা দাও, আমার আব্বা বাবা মার সাথে কথা বলব। তোমার বাহাদুরি আজকে আমি দেখে দিছি, বাহাদুরি দূর করছি, আগে ওদের কাছে ফোন দাও, কথা বলব।তারপর ও আমার আব্বাকে ফোনটা দেয় । আমি আমার আব্বাকে বলি, আব্বা আমার স্ত্রীর সাথে আমার সংসার করা তো খুব কষ্ট হইতাছে । এই খালি এরকম এরকম কথা বলে । আমি তো ওর সাথে সংসার করতে পারতেছি না । তা আব্বা বলে পরের কথা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া কইরো না । আমি বলছি যে একটা সামাজিকতা বলি তো একটা কথা আছে । মানুষের সাথে তো কথাটা তো বলা লাগে । দেখা হইলেও তো অনেক সময় কথা বলে, এসব শর্ত দেওয়া কি ঠিক? হ্যাঁ । তো আব্বা বলে যে পরের কথা নিয়ে আর মাথা ঘামানোর দরকার নেই । তুমি ফোন রেখে দাও । তারপর আমি ফোন রেখে দিছি ।

Answer

উত্তরের সূচনা

প্রশ্নকারী ভাইয়ের উদ্দেশ্যে আমাদের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে—আপনার স্ত্রী বারবার এমন কথা বলেন যা আপনার মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে আপনি রেগে গিয়ে কিছু কথা বলেছেন। এখন আপনার জানার বিষয় হলো—আপনার স্ত্রীর এই ধরনের কথা বলা এবং আপনার রাগের মুহূর্তে বলা কথাগুলোর শারঈ বিধান কী?


১. স্ত্রীর কথাগুলোর শারঈ বিধান

আপনার স্ত্রী যে বলেছেন, "অমুক মেয়ের সাথে কথা বললে আমার বাপের বাড়ি চলে যাবো" বা "বাড়ি থেকে চলে যাবো"—এ ধরনের কথা কি তালাক বা জিহার বা কোনো শারঈ প্রভাব ফেলে?

উত্তর: না, এ ধরনের কথা দ্বারা তালাক পতিত হয় না। কারণ তালাকের জন্য স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে হয় (যেমন: তালাক, আমি তোমাকে তালাক দিলাম) অথবা এমন শব্দ যা প্রেক্ষাপটে তালাকের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্ত্রীর "বাড়ি চলে যাবো" বা "বাপের বাড়ি যাবো" বলা তালাকের শব্দ নয়, বরং এটি একটি হুমকি বা অভিমান প্রকাশ মাত্র। এতে কোনো শারঈ প্রভাব পড়ে না।

তবে এটি একটি খারাপ অভ্যাস এবং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। ইসলামী দৃষ্টিতে স্ত্রীর উচিত স্বামীর সাথে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করা এবং এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকা যা সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে।


২. রাগের সময় আপনার বলা কথাগুলোর বিধান

আপনি রেগে গিয়ে বলেছেন: "তোমার বাপের সাথে কথা বলতেছি", "তোমার বাহাদুরি আমি দেখাইতেছি", "তোমার বাপের নাম্বার দাও" ইত্যাদি। এতে কি তালাক পতিত হয়েছে?

উত্তর: না, এতে তালাক পতিত হয়নি। কারণ আপনি তালাকের কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি। আপনি শুধু রাগের বশবর্তী হয়ে স্ত্রীকে ধমক দিয়েছেন এবং তার পরিবারের সাথে কথা বলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এটি তালাক নয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়া। ইসলামী আইনে রাগের তীব্রতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে:

  • যদি রাগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, মানুষ যা বলছে তা বুঝতে পারছে না এবং নিজের কথার উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে সেই অবস্থায় দেওয়া তালাক পতিত হয় না।
  • কিন্তু যদি রাগ থাকে তবুও মানুষ তার কথা বুঝতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে সেই অবস্থায় দেওয়া তালাক পতিত হয়।

আপনার ক্ষেত্রে আপনি যা বলেছেন তা তালাকের শব্দ নয়, তাই তালাক পতিত হওয়ার প্রশ্নই আসে না।


৩. স্ত্রীকে শর্ত দেওয়া বা সীমাবদ্ধ করা

আপনি স্ত্রীকে বলেছেন যে, "তুমি অমুক মেয়ের সাথে কথা বলবে না" বা "এসব কথা বলবে না"—এ ধরনের শর্ত দেওয়া কি ঠিক?

উত্তর: ইসলামী দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ভালোবাসার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। স্ত্রীকে অন্যের সাথে কথা বলা থেকে সম্পূর্ণ নিষেধ করা ইসলামসম্মত নয়, যদি তা বৈধ বিষয় হয়। তবে স্ত্রীর উচিত স্বামীর অনুভূতির প্রতি খেয়াল রাখা এবং এমন বিষয় এড়িয়ে চলা যা স্বামীর মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" (তিরমিজি: ৩৮৯৫)

স্ত্রীর উচিত স্বামীকে সম্মান করা এবং এমন কথা না বলা যা স্বামীর মনে কষ্ট দেয়। অন্যদিকে স্বামীরও উচিত স্ত্রীর সাথে নম্রভাবে কথা বলা এবং রাগের মুহূর্তে কঠোর ভাষা ব্যবহার না করা।


৪. আপনার আব্বার পরামর্শ

আপনার আব্বা আপনাকে বলেছেন, "পরের কথা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া কোরো না" এবং "ফোন রেখে দাও"—এটি একটি উত্তম পরামর্শ। ইসলাম সবসময় সম্পর্কের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে উৎসাহিত করে এবং অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকতে বলে।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (ধর্মকে) দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)


৫. সামাজিকতা ও মানুষের সাথে কথা বলা

আপনি বলেছেন যে, মানুষের সাথে কথা বলা তো লাগে, এটা সামাজিকতা। এটি সঠিক। ইসলামে মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার ও কথা বলার নির্দেশ আছে। তবে স্ত্রীর উচিত স্বামীকে এমন বিষয়ে উদ্বিগ্ন না করা এবং স্বামীর উচিত স্ত্রীকে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা দেওয়া, তবে ইসলামী সীমার মধ্যে।


৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার প্রশ্নের সারমর্ম হলো—এই ঘটনায় কোনো শারঈ সমস্যা (তালাক, জিহার ইত্যাদি) হয়েছে কিনা। আমাদের স্পষ্ট উত্তর হলো:

না, এই ঘটনায় কোনো শারঈ সমস্যা হয়নি। আপনার স্ত্রীর কথায় তালাক পতিত হয়নি এবং আপনার রাগের সময় বলা কথাগুলোতেও তালাক পতিত হয়নি।

তবে আপনাদের উভয়ের উচিত: ১. পরস্পরের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো ২. রাগের মুহূর্তে কঠোর কথা না বলা ৩. সম্পর্কের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা ৪. অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে ঝগড়া না করা ৫. প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের পরামর্শ নেওয়া


৭. দলিল ও রেফারেন্স

১. সূরা আন-নিসা (৪:১৯): "আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।"

২. সূরা আত-তালাক (৬৫:১): "হে নবী! তোমরা যখন স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে তালাক দাও।" — এ থেকে বোঝা যায়, তালাকের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ ও নিয়ম আছে।

৩. রদ্দুল মুহতার (৫/৪৭৫): তালাকের শব্দ স্পষ্ট হতে হবে অথবা প্রেক্ষাপটে তালাকের জন্য ব্যবহৃত হতে হবে।

৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া (১/৩৫০): রাগের অবস্থায় তালাক দেওয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আছে।

৫. সুনানে আবু দাউদ (২১৯৪): রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তিন প্রকার তালাক আছে... এক. স্পষ্ট ভাষায় তালাক, দুই. শর্তসাপেক্ষ তালাক, তিন. ইশারায় তালাক।"


৮. উপসংহার

আপনার স্ত্রীর সাথে আপনার সম্পর্কের উন্নতির জন্য আপনাদের উভয়কে ধৈর্য ধরতে হবে এবং একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। ইসলামী জীবনধারা অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও বোঝাপড়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের সম্পর্কে বরকত দান করুন এবং আপনাদের মধ্যে ভালোবাসা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.