স্বামী যদি মানসিক যন্ত্রণা দেয়, এতে বাবার বাড়িতে স্বেচ্ছায় চলে যায় স্ত্রীর তবে কি গুনাহ হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4820
Questioner: Md Habib
Question Asked: 02 Sep 2026, 03:02 PM
Reviewed & Published: 02 Sep 2026, 03:06 PM
Views: 32
Tokens: 6,786
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার স্বামী বিয়ের পর থেকে জুমা ছাড়া কোনো নামাজ পড়ে না। ঠিক হয়ে যাবে ভেবে দেড় বছর অপেক্ষা করি। কিন্তু তিনি আমাকে অনেক যত্ন করলেও বাচ্চা হওয়ার পর থেকে দুদিন পরপর অনেক মানসিক যন্ত্রণা দেয়। এত পরিমাণ খোঁটা, বাজে ভাষা ব্যবহার করে যে আমি এসব নিতে পারছি না। কারণ আমার একা একা বাচ্চা পালাসহ সবকিছু করতে হয়। উনার কথা অনুযায়ী চলার জন্য আমি অনেক কিছু পরিবর্তন করেছি, কিন্তু লাভ হয় নি। কিছুর থেকে কিছু হলেই তুচ্ছ করে কথা বলে এবং আমি তার কাছে প্রত্যেকবার দোষ হলেও মাফ চাইতে হয় না হলেও চাইতে হয়। অনেক অসম্মান করে। কিন্তু উনার অনেক ভালো গুনও আছে।আমাদের অনেক খেয়াল রাখে। সম্পর্ক ভালো থাকলে আমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু উনি দুদিন পরপর যে আমার সাথে বাজে আচরণ করে এবং এতে আমি মানসিকভাবে দিনদিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। নামাজ-রোজা ঠিকভাবে পালন করতে পারছি না। উনাকে বলেছি যে আপনি যদি নিয়মিত নামাজ না পড়েন এবং আমার সাথে প্রতিনিয়ত এরকম আচরণ করেন তাহলে আপনার সাথে আমি আর থাকতে চাই না। কারণ আমি সত্যিই চার দেয়ালের মাঝে মানসিক যন্ত্রণা ভুগছি। প্রতিনিয়ত কাঁদতে হয়। তিনি বলেন তিনিও চান না। চলে গেলে চলে যেতাম,তিনি নিজেকে কোনোভাবে পরিবর্তন করবেন না! এক্ষেত্রে আমি যদি সত্যিই বাবার বাড়িতে চলে যাই তাহলে কি আমি গুনাহগার হবো? যদি তিনি বলেন আমাকে মাফ করবেন না। যদিও আমি সবকিছু আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সব ঠিক করতে চাই, কিন্তু উনি রাজি না। আর দুদিন ঠিক থাকলেও আবার আমার সাথে এসব শুরু করেন। এতে আমি তো অসুস্থ হচ্ছিই আর আমার বাচ্চার উপরও প্রভাব পড়ছে! এখন আমার করণীয় কি? আর উনি দুই পরিবারের কাউকে মানবেন না।

Answer

বাবার বাড়িতে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে ইসলামি নির্দেশনা

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনার স্বামী নামাজ পড়েন না, মানসিক নির্যাতন করেন, অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন, কিন্তু ভালো গুণও রয়েছে। আপনি বাবার বাড়িতে চলে যেতে চান—এতে কি আপনি গুনাহগার হবেন?

ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

১. স্ত্রীর অধিকার ও স্বামীর দায়িত্ব

ইসলামে স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা: ১৯)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিজি: ১১৬২)

২. নামাজ না পড়া

নামাজ ইসলামের স্তম্ভ। স্বামীর নামাজ না পড়া গুরুতর গুনাহ। তবে এটি স্ত্রীর জন্য স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার একক কারণ নয়, বরং এ জন্য দাওয়াত ও তাগিদ দেওয়া উচিত।

৩. মানসিক নির্যাতন

ইসলামে স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন করা, কটু কথা বলা, অপমান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সে-ই সর্বোত্তম যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।" (ইবনে হিব্বান)

৪. বাবার বাড়িতে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে

মৌলিক নীতি: স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘর ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া উচিত নয়, যদি না সেখানে শরীয়তসম্মত কারণে জীবনযাপন করা কঠিন হয়।

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: যদি স্বামী স্ত্রীর সাথে এমন আচরণ করে যা সহ্য করা অসম্ভব এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে, তবে স্ত্রী সাময়িকভাবে বাবার বাড়িতে যেতে পারেন। তবে এতে গুনাহ হবে না যদি উদ্দেশ্য হয় সংশোধন ও পরিস্থিতি উন্নয়ন।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: "যদি স্বামী স্ত্রীর সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং স্ত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে সে তার পরিবারের কাছে যেতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার)

৫. গুরুত্বপূর্ণ শর্ত

১. বাবার বাড়িতে যাওয়া স্থায়ী বিচ্ছেদের উদ্দেশ্যে না হওয়া উচিত ২. এটি একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হওয়া উচিত ৩. পরিবারের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত ৪. তালাকের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে নেওয়ার আগে সালিশ (মধ্যস্থতা) করা জরুরি

করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ

১. ধৈর্য ও терпение

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩)

২. সালিশ (মধ্যস্থতা)

কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের অবনতির আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন বিচারক নিযুক্ত করো। তারা উভয়ে যদি সংশোধন চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা: ৩৫)

৩. ধৈর্য সহকারে দাওয়াত

স্বামীকে নামাজের গুরুত্ব বোঝান, উত্তম পদ্ধতিতে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয় এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে বা চুপ থাকে।" (বুখারি: ৬০১৮)

৪. চরম পরিস্থিতিতে করণীয়

যদি মানসিক নির্যাতন অসহনীয় হয় এবং আপনার ধর্মীয় জীবন ও সন্তানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তবে:

১. প্রথমে পরিবারের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা করুন ২. প্রয়োজনে স্থানীয় আলেম বা মসজিদের ইমামের মাধ্যমে মধ্যস্থতা করুন ৩. যদি কোনো সমাধান না হয়, তবে সাময়িকভাবে বাবার বাড়িতে যাওয়া জায়েয হতে পারে ৪. তবে তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভালোভাবে চিন্তা করুন

ফতোয়া

হানাফি মাযহাব মতে: স্ত্রী যদি স্বামীর নির্যাতনের কারণে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয় এবং সন্তানের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তবে সে সাময়িকভাবে বাবার বাড়িতে যেতে পারবে। এতে সে গুনাহগার হবে না, যদি তার উদ্দেশ্য হয় নিজের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় দায়িত্ব রক্ষা করা।

তবে মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর নিকট অপছন্দনীয় হালাল কাজ। তাই সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে তালাককে গ্রহণ করুন।

দোয়া

"rabbana hab lana min azwajina wa zurriyyatina qurrata a'yunin waj'alna lil-muttaqina imama" (হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাধ্যমে আমাদের চোখ শীতল করুন এবং আমাদের মুত্তাকীদের ইমাম বানান।) (সূরা আল-ফুরকান: ৭৪)

আল্লাহ তাআলা আপনার সমস্যার সমাধান করুন এবং আপনার ধৈর্যের প্রতিদান দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.