Tafweez right
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
তাফওয়ীজের অধিকার (Tafweez Right) সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
উত্তর
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি হানাফি মাযহাবের আলোকে বিস্তারিতভাবে উত্তর প্রদান করছি।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ
১. বিবাহের সময় ইজাব-কবুলের পূর্বে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে খালি কাবিননামায় সাইন করেন। ২. কাজী স্বামীর অনুমতি ছাড়াই কাবিননামা পূরণ করেন এবং ১৮ নং ঘরে স্ত্রীকে শর্তসাপেক্ষ তাফওয়ীজের অধিকার দেন। ৩. বিবাহের ৬ মাস পর স্ত্রী স্বামীকে জানান যে তিনি তাফওয়ীজের অধিকার বর্জন করছেন এবং তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ৪. স্বামী বলেন, "আমি অধিকারটি স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিলাম।"
হানাফি ফিকহের আলোকে বিধান
১. তাফওয়ীজের সংজ্ঞা ও শর্ত
তাফওয়ীজ অর্থ হলো স্ত্রীকে তালাকের অধিকার প্রদান করা। ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, তালাকের ক্ষমতা মূলত স্বামীর হাতে থাকে। তবে স্বামী ইচ্ছা করলে নিজ স্ত্রীকে এ অধিকার দিতে পারেন। এটি বৈধ।
কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে:
"وَإِنْ مَلَّكَهَا طَلَاقَ نَفْسِهَا فَقَالَتْ: طَلَّقْتُ نَفْسِي وَقَعَ ذَلِكَ"
"যদি স্বামী স্ত্রীকে নিজের তালাকের অধিকার দেয় এবং স্ত্রী বলে, 'আমি নিজেকে তালাক দিলাম' তবে তা কার্যকর হবে।"
(আল-হিদায়া, কিতাব আত-তালাক)
২. কাজীর কর্তৃক কাবিননামা পূরণের বিধান
কাজী কর্তৃক স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাবিননামায় তাফওয়ীজের শর্ত যোগ করা সঠিক নয় এবং তা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। কারণ তালাকের অধিকার স্বামীর ইচ্ছা ও সম্মতির উপর নির্ভরশীল। স্বামীর সম্মতি ব্যতীত কেউ তাকে এ অধিকার দিতে পারে না।
রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"لَا يَصِحُّ تَفْوِيضُ الطَّلَاقِ إِلَّا بِرِضَا الزَّوْجِ وَاخْتِيَارِهِ"
"স্বামীর সন্তুষ্টি ও ইচ্ছা ব্যতীত তালাকের তাফওয়ীজ সহীহ নয়।"
(রদ্দুল মুহতার, ৩/৪৫৬)
৩. স্ত্রীর কর্তৃক অধিকার বর্জন
স্ত্রী যদি তাফওয়ীজের অধিকার বর্জন করে এবং তা স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়, তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে তা গ্রহণযোগ্য। কারণ তাফওয়ীজ একটি অধিকার, যা স্ত্রী ইচ্ছা করলে বর্জন করতে পারে।
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"إِذَا مَلَّكَهَا طَلَاقَ نَفْسِهَا فَلَهَا أَنْ تَرُدَّهُ عَلَيْهِ"
"যদি স্বামী স্ত্রীকে নিজের তালাকের অধিকার দেয়, তবে স্ত্রী তা স্বামীর নিকট ফিরিয়ে দিতে পারবে।"
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪৫০)
৪. স্বামীর পুনরায় অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া
স্বামী যখন বলেন, "আমি অধিকারটি স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিলাম", তখন প্রশ্ন হলো—এই ফিরিয়ে দেওয়া কি শর্তসাপেক্ষ হবে নাকি শর্তহীন?
এখানে মূল বিষয় হলো:
ক. কাজী কর্তৃক যোগ করা শর্তটি স্বামীর সম্মতি ব্যতীত হওয়ায় তা মূলত স্বামীর উপর বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই ঐ শর্তটি স্বামীকে মানতে হবে না।
খ. স্বামী যখন স্ত্রীকে অধিকার ফিরিয়ে দেন, তখন তিনি নিজ ইচ্ছায় দেন। তাই তিনি চাইলে নতুন শর্তে দিতে পারেন অথবা শর্তহীনভাবে দিতে পারেন।
গ. তবে প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতিতে স্বামী সাধারণভাবে বলেছেন, "আমি অধিকারটি স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিলাম।" এক্ষেত্রে স্ত্রী পূর্বের শর্তসাপেক্ষ অধিকারই ফিরে পাবে বলে মনে করা হবে না; বরং স্বামী যদি নতুন করে কোনো শর্ত না দেন, তবে তা শর্তহীন তাফওয়ীজ হিসেবে গণ্য হবে।
৫. গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা
ক. তাফওয়ীজের অধিকার স্বামীর ইচ্ছা ও সম্মতির উপর নির্ভরশীল। স্বামীর অজান্তে বা অনুমতি ছাড়া কেউ তা দিতে পারে না।
খ. কাজী কর্তৃক স্বামীর অনুমতি ছাড়া যোগ করা শর্তটি স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
গ. স্ত্রী কর্তৃক অধিকার বর্জন বৈধ এবং তা স্বামী গ্রহণ করতে পারেন।
ঘ. স্বামী পুনরায় অধিকার দিলে তা নতুন করে দান হিসেবে গণ্য হবে এবং স্বামী চাইলে নতুন শর্ত দিতে পারবেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে:
১. কাজী কর্তৃক স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাবিননামায় তাফওয়ীজের শর্ত যোগ করা বৈধ নয় এবং তা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
২. স্ত্রী কর্তৃক অধিকার বর্জন ও স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়া বৈধ হয়েছে।
৩. স্বামী পুনরায় অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ায় তা নতুন করে তাফওয়ীজ হিসেবে গণ্য হবে।
৪. যেহেতু স্বামী নতুন করে কোনো শর্ত উল্লেখ করেননি, তাই স্ত্রী শর্তহীনভাবে তাফওয়ীজের অধিকার পাবেন। তবে স্বামী যদি চান, তিনি নতুন শর্তে দিতে পারতেন।
৫. কাজীর লিখিত পূর্বের শর্তটি স্বামীর সম্মতি ব্যতীত হওয়ায় তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: তাফওয়ীজের অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের স্পষ্ট সম্মতি থাকা আবশ্যক। কোনো প্রকার জোরাজুরি বা প্রতারণার মাধ্যমে এ অধিকার দেওয়া বা নেওয়া শরীয়তে সমর্থনযোগ্য নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যদি সন্তুষ্ট থাকেন এবং বিষয়টি নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব না থাকে, তবে তা গ্রহণযোগ্য। তবে ভবিষ্যতে জটিলতা এড়াতে স্থানীয় কোনো আলেম বা মুফতির নিকট বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা উত্তম।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।