খুলার পর ৩৯ দিনের গর্ভাবস্থা ও গর্ভপাতের শরয়ি হুকুম

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4804
Questioner: Umme Ahmad
Question Asked: 02 Sep 2026, 07:43 AM
Reviewed & Published: 02 Sep 2026, 08:10 AM
Views: 22
Tokens: 10,276
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

মুহতারাম মুফতি সাহেব, আমার কিছু জরুরি মাসআলা জানার প্রয়োজন। আমার স্বামী আমার সঙ্গে প্রতারণা করে বিয়ে করেছেন। বিয়ের আগে তিনি তাঁর আগের স্ত্রী, সন্তান ও পারিবারিক পরিস্থিতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে গোপন করেছিলেন। আমি এসব বিষয় জানতাম না এবং জানলে এই বিয়েতে রাজি হতাম না।

পরবর্তীতে বিষয়গুলো জানার পর আমাদের মধ্যে অনেক সমস্যা ও কষ্টের সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের খুলা হয়ে গেছে। বর্তমানে আমার যাবতীয় দায়িত্ব আমার কাকা নিয়েছেন।

আজ জানতে পেরেছি যে আমি গর্ভবতী এবং বর্তমানে গর্ভের বয়স প্রায় ৩৯ দিন।

এখন আমার কিছু প্রশ্ন—

১। আমাদের খুলা সম্পন্ন হওয়ার পর জানতে পারলাম যে আমি গর্ভবতী। এ অবস্থায় আমার ইদ্দতের হুকুম কী এবং কতদিন ইদ্দত পালন করতে হবে?

২। খুলা হয়ে যাওয়ার পর গর্ভবতী হওয়ার কারণে আমার সাবেক স্বামীর ওপর আমার বা গর্ভের সন্তানের কী কী শরয়ি অধিকার ও দায়িত্ব থাকবে?

৩। আমার স্বামী যেহেতু প্রতারণা করে বিয়ে করেছেন এবং বিয়ের আগে তাঁর আগের স্ত্রী ও সন্তানের বিষয়গুলো আমার কাছে গোপন করেছেন, আর বর্তমানে আমার দায়িত্ব আমার কাকা নিয়েছেন—এই পরিস্থিতিতে গর্ভের সন্তানটি রাখার ব্যাপারে শরিয়তের দৃষ্টিতে কী করণীয়?

৪। আমি বর্তমানে সন্তানটি রাখতে চাই না। আজ জানতে পেরেছি যে গর্ভের বয়স প্রায় ৩৯ দিন। এই অবস্থায় গর্ভপাত করানো কি শরিয়তসম্মত হবে? সন্তান না রাখলে কি আমার গুনাহ হবে?

৫। স্বামীর প্রতারণা, বৈবাহিক জীবনের জটিলতা, তাঁর পক্ষ থেকে আমার দায়িত্ব না নেওয়া এবং বর্তমানে আমার কাকার ওপর আমার দায়িত্ব থাকার বিষয়গুলো কি গর্ভপাতের ক্ষেত্রে শরয়ি ওজর হিসেবে গণ্য হতে পারে?

৬। যদি এই অবস্থায় গর্ভপাত করা নাজায়েজ হয়, তাহলে আমাকে কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাতে হবে? আর যদি কোনো শর্তে জায়েজ হয়, তাহলে সেই শর্তগুলো কী?

দয়া করে আমার পুরো পরিস্থিতি বিবেচনা করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহের কিতাবের রেফারেন্সসহ বিস্তারিত হুকুম জানাবেন। পরামর্শ দিন শায়েখ আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি

Answer

ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। জবাব,

বোন, আপনার এই কঠিন, প্রতারণাপূর্ণ দাম্পত্য বিচ্ছেদ ও গর্ভধারণজনিত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত পরিস্থিতিতে আল্লাহ তা'আলা আপনাকে সবর এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক দান করুন। আপনার প্রশ্নগুলোর হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত পেশ করা হলো:


১. খুলা সম্পন্ন হওয়ার পর গর্ভ প্রকাশ পেলে ইদ্দতের হুকুম ও সময়সীমা:

  • শরয়ী হুকুম: খুলা বা যেকোনো তালাক সম্পন্ন হওয়ার পর যদি জানা যায় যে স্ত্রী গর্ভবতী, তবে তার ইদ্দত বা অপেক্ষার সময়কাল সাধারণ মাস বা হায়েযের হিসাবে হবে না । হানাফী ফিকহের সর্বসম্মত ফয়সালা অনুযায়ী, সন্তান প্রসব (Delivery) হওয়া পর্যন্তই উক্ত গর্ভবতী নারীর ইদ্দতকাল বহাল থাকবে । সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথেই তাঁর ইদ্দত শেষ হবে, এর পূর্বে নয় ।
  • দলীল: পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন—

    "আর গর্ভবতীদের ইদ্দতকাল হলো তাদের সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত।" (সূরা আত-তালাক: ৪)

  • কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা নং ১৬২ (কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ) এবং পৃষ্ঠা নং ১৭০ (ইদ্দতের বিবরণ)।
    • তালাকের শরয়ী মাসায়েল ও বিধান: পৃষ্ঠা নং ১৮২ (ইদ্দতের অধ্যায়)।

২. সাবেক স্বামীর ওপর গর্ভবতী স্ত্রীর ও গর্ভের সন্তানের শরয়ী অধিকার:

  • স্ত্রীর নাফাকা (খোরপোশ ও বাসস্থান): গর্ভবতী অবস্থায় ইদ্দত চলাকালীন সময়ে সাবেক স্ত্রীর যাবতীয় নাফাকা (খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও নিরাপদ বাসস্থান) দেওয়ার পূর্ণ দায়িত্ব সাবেক স্বামীর ওপর ন্যস্ত । খুলা বা বাযেন তালাকের পর সাধারণ স্ত্রীর নাফাকা থাকে না, কিন্তু স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত স্বামী নাফাকা দিতে সম্পূর্ণ বাধ্য ।
  • সন্তানের নাফাকা ও দায়িত্ব: সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে তার সাবালিকা বা সাবালক হওয়া পর্যন্ত বাচ্চার যাবতীয় ব্যয়ভার (খাদ্য, পোশাক, চিকিৎসা, লালন-পালন) বহন করা একমাত্র পিতার (আপনার সাবেক স্বামীর) ওপর শরীয়ত নির্ধারিত ওয়াজিব দায়িত্ব। পিতা কোনোভাবেই এই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না এবং মা বা কাকা সাবেক স্বামী থেকে আইনত এটি দাবি করতে পারেন।
  • কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা নং ১৭০ (কুরআনের আয়াত: "ফাইন কুন্না উলাতি হামলিন ফাআনফিকূ আলাইহিন্না হাত্তা ইয়াদ্বা’না হাম লাহুন্না" - যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তান প্রসব পর্যন্ত তাদের খোরপোশ দাও) ।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ৩৩১ (সন্তানের দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়ার বিবরণ) এবং পৃষ্ঠা নং ২৫৪-২৫৬ (সংসারে স্ত্রীর দায়িত্ব ও নাফাকা অধ্যায়)।

৩. স্বামীর প্রতারণা ও কাকার আশ্রয়ে থাকার পরিস্থিতিতে সন্তানটি রাখার শরয়ী বিধান:

  • শরয়ী হুকুম: স্বামীর মিথ্যাচার বা প্রতারণা করে বিয়ে করা অনেক বড় গুনাহের কাজ । কিন্তু এই প্রতারণার কারণে বা আপনি কাকার অধীনে থাকার কারণে নিষ্পাপ গর্ভস্থ সন্তানকে ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা শরী'আতের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়।
  • ইসলাম মানুষের জীবনের সম্মান ও বংশ রক্ষার সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছে । স্বামী প্রতারক হলেও সন্তানটি নিষ্কলঙ্ক এবং বংশীয়ভাবে সে সাবেক স্বামীর ঔরসজাত হিসেবেই গণ্য হবে । সন্তানটি জন্ম দেওয়ার পর সাবেক স্বামী তার পূর্ণ খরচ দিতে বাধ্য । অতএব, শরী'আতের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সন্তানটি রাখা এবং সুস্থভাবে জন্ম দেওয়া আপনার নৈতিক ও শরয়ী দায়িত্ব
  • কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ১৫৯ (বংশ সংরক্ষণের গুরুত্ব), পৃষ্ঠা নং ১৬১ (নসবের গুরুত্ব) এবং পৃষ্ঠা নং ১৭৩ (কৃত্রিম বা যান্ত্রিকভাবে বীর্য জরায়ুতে পৌঁছালেও নসব সাব্যস্ত হওয়ার মাসআলা)।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ২৭৭ (গর্ভধারণের সাধারণ হুকুম)।

৪. ৩৯ দিন বয়সে গর্ভপাত করানো কি শরীয়তসম্মত? সন্তান না রাখলে কি গুনাহ হবে?

  • শরয়ী হুকুম: ৩৯ দিন বয়সে বাচ্চার কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রকাশ পায় না এবং রূহ বা প্রাণও সঞ্চারিত হয় না (সাধারণত ১২০ দিনে রূহ আসে)। তবে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, রূহ আসার পূর্বেও কোনো উপযুক্ত শরয়ী ওজর বা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া গর্ভপাত করা কঠোরভাবে মাকরূহে তানযীহী এবং বড় গুনাহের কাজ। কোনো ওজর ছাড়া ৩৯ দিনের মাথায় গর্ভপাত করালে আপনি গুনাহগার হবেন এবং এটি তাকওয়া পরিপন্থী কাজ
  • কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ২৭৭ (রূহ আসার পূর্বে গর্ভপাতের হুকুম) পৃষ্ঠা নং ২৭৭-২৭৮ (অঙ্গ প্রকাশ পাওয়ার পূর্বে হুকুম) এবং পৃষ্ঠা নং ২৮০ (গর্ভপাত সংক্রান্ত চূড়ান্ত সারকথা)।

৫. স্বামীর প্রতারণা, দায়িত্ব না নেওয়া ও কাকার দায়িত্বে থাকা কি গর্ভপাতের 'শরয়ী ওজর' (Excuse) হিসেবে গণ্য?

  • শরয়ী হুকুম: না, স্বামীর প্রতারণা, বৈবাহিক জীবনের জটিলতা বা কাকার আশ্রয়ে ভরণপোষণের সমস্যাগুলো গর্ভপাতের জন্য গ্রহণযোগ্য শরয়ী ওজর বা ওজরে শরয়ী হিসেবে গণ্য হবে না
  • হানাফী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, রূহ আসার পূর্বে গর্ভপাতের জন্য এমন বাস্তব ওজর থাকতে হবে যা মায়ের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি তৈরি করে (যেমন: স্তন্যদানকারী মা গর্ভবতী হলে তার বুকের দুধ শুকিয়ে যায়, অথচ বাচ্চার বিকল্প দুধের ব্যবস্থা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য পিতার না থাকায় পূর্বের বাচ্চার মৃত্যুর নিশ্চিত আশঙ্কা তৈরি হওয়া) । স্বামীর প্রতারণা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও তা জীবননাশের মতো চিকিৎসা সংক্রান্ত ওজর নয়। তাছাড়া, দরিদ্রতা বা ভবিষ্যৎ কষ্ট ও খরচের আশঙ্কায় গর্ভপাত বা সন্তান ধ্বংস করা শরী'আতে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ।
  • কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ২৭৬-২৭৭ (আযল ও জন্মনিয়ন্ত্রণের বিবরণ এবং দরিদ্রতার আশঙ্কায় ভ্রূণ নষ্ট করার নিষেধাজ্ঞা)।
    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা নং ২৭৮ (ওজরের সঠিক রূপরেখা ও বিবরণ) এবং পৃষ্ঠা নং ২৭৯-২৮০ (জরুরতের সীমানা বিশ্লেষণ)।

৬. পরিস্থিতি সামলানোর উপায় এবং গর্ভপাত জায়েয হওয়ার বিশেষ শর্তাবলী:

যদি কাকার মনোভাব পরিবর্তন ও সাবেক স্বামী থেকে সন্তানের ভরণপোষণ আদায় করতে জটিলতা দেখা দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে, তাহলে যেহেতু সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানকে নিয়ে অন্যত্র বিয়ে বসাও সম্ভব হবে না , বিধায় ইস্তেগফারের সাথে গর্ভপাত বৈধ হবে। কোনো গোনাহ হবে না।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনার সকল দুশ্চিন্তা ও মানসিক অস্থিরতা দূর করে দিন এবং আপনার কাকা ও আপনাকে এই কঠিন পরিস্থিতি ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করার তাওফীক দান করুন।

আল্লাহই ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.