হানাফি মাজহাবে বিয়ের আগে কোন কাজের সাথে সথ যুক্ত ডিভোর্স মাসআলা কোন ছাড় নেই কেনোহিলা কোওস
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হিলা কোওসল রেখেছে
কেউ যদি একাধিক বার বলে ফেলে জিবন নযটো হয়ে যেতে পারে তো
Answer
বিয়ের আগে তালাকের শর্ত ও হিলা (Hila) সম্পর্কিত মাসআলা
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনি জানতে চেয়েছেন: ১. হানাফি মাজহাবে বিয়ের আগে কোনো কাজের সাথে শর্ত যুক্ত তালাকের মাসআলা কী? ২. হিলা কী এবং এর বিধান কী? ৩. কেউ যদি একাধিকবার তালাক বলে ফেলে তাহলে কি জীবন নষ্ট হয়ে যেতে পারে?
উত্তর
১. বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাকের মাসআলা
বিয়ের আগে শর্তযুক্ত তালাক (তা’লীক) কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের আলোকে প্রধানত দুটি সুরত বা অবস্থায় বিভক্ত:
১. বিবাহের সাথে সম্বন্ধ করা ছাড়া সরাসরি শর্তযুক্ত করা (ইযাফত ব্যতীত তা’লীক):
- শরয়ী হুকুম: যদি কোনো বেগানা বা অপরিচিত (অবিবাহিত) মহিলাকে ভবিষ্যতের বিবাহের সাথে সম্পৃক্ত না করে সরাসরি কোনো শর্তের সাথে তালাক ঝুলন্ত করা হয় (যেমন: "তুমি যদি অমুক কাজ করো, তবে তোমার তালাক" বা "তুমি যদি অমুক জায়গায় যাও, তবে তোমার তালাক"), তবে উক্ত শর্ত ও কথাটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল ও লগু (Void) বলে গণ্য হবে। বিবাহের পর মেয়েটি সেই শর্তাধীন কাজটি করলেও দাম্পত্য জীবনে কোনো তালাক পতিত হবে না ।
- শরয়ী কারণ: হানাফী ফিকহের মৌলিক নিয়ম অনুযায়ী, তালাক প্রদান বা ঝুলন্ত করার যোগ্যতা অর্জনের জন্য মহিলার ওপর পুরুষের বৈবাহিক মালিকানা (الملك) থাকা অপরিহার্য। যেহেতু কথাটি বলার সময় মেয়েটির ওপর কোনো মালিকানা ছিল না এবং বিবাহের সাথে সংযোগও করা হয়নি, তাই তা কার্যকর হবে না।
- ভলিউম ও পৃষ্ঠা রেফারেন্স:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ২৭০-২৭১ (কাবিননামায় তাফবীযে তালাক ও বিবাহের পূর্বে শর্ত পরিচ্ছেদ — আদ্দুররুল মুখতার ও তানুযীরুল আবসার-এর বরাতে)।
২. বিবাহের সাথে সম্বন্ধ করে বা বিবাহের ইযাফত সহ শর্তযুক্ত করা (ইযাফত সহ তা’লীক):
- শরয়ী হুকুম: যদি বিবাহের কথা উল্লেখ করে বা তার সাথে সম্পৃক্ত করে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় (যেমন: "আমি যদি তোমাকে বিয়ে করি, আর তুমি যদি অমুক কাজ করো, তবে তোমার তালাক" অথবা "তোমাকে বিয়ে করার পর তুমি যদি অমুক জায়গায় যাও, তবে তোমার তালাক"), তবে এই শর্তারোপটি সহীহ ও কার্যকর হবে। বিবাহের পর স্ত্রী যদি কখনো সেই শর্তাধীন বা নিষিদ্ধ কাজটি করে, তবে সাথে সাথে তালাক পতিত হয়ে যাবে।
- শরয়ী কারণ: এখানে যদিও বিয়ের আগে শর্ত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা সরাসরি বেগানা মহিলার ওপর নয়, বরং ভবিষ্যতের বৈবাহিক মালিকানার সাথে যুক্ত করে তালাক ঝুলন্ত করার কারণে হানাফী ফিকহ অনুযায়ী তা বৈধ ও কার্যকর সাব্যস্ত হয় ।
- ভলিউম ও পৃষ্ঠা রেফারেন্স:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ২৭০-২৭১।
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা ১২১ (قاعدة : تعليق الإطلاق بالشرط صحيح... অনুচ্ছেদ)।
২. হিলা (তালাকের পর পুনরায় বিবাহের বৈধ উপায়)
হিলা অর্থ হলো: তালাকে মুগাল্লাযা (তৃতীয় তালাক) হওয়ার পর স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করার বৈধ পদ্ধতি।
বিধান:
- তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যায়।
- স্ত্রীকে পুনরায় বিবাহ করার জন্য শর্ত হলো: স্ত্রী অন্য একজন পুরুষের সাথে বৈধভাবে বিবাহ করবে, সেই বিবাহের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করবে (সহবাস করবে), তারপর সেই স্বামী তাকে তালাক দেবে অথবা মৃত্যুর মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটবে, এরপর ইদ্দত (নির্দিষ্ট সময়) পূর্ণ করার পর প্রথম স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ করতে পারবে।
কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"অতঃপর যদি সে (স্বামী) তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে তার জন্য পূর্ববর্তী স্বামী হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে। অতঃপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তবে তাদের উভয়ের (পূর্ব স্বামী-স্ত্রীর) পুনরায় মিলিত হওয়াতে কোনো গুনাহ নেই, যদি তারা আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)
হিলার শর্ত: ১. দ্বিতীয় বিবাহটি বৈধ ও স্থায়ী উদ্দেশ্যে হতে হবে। ২. দ্বিতীয় স্বামীর সাথে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক (সহবাস) স্থাপন করতে হবে। ৩. দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিলে বা মৃত্যু হলে ইদ্দত পূর্ণ করতে হবে। ৪. ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সাথে নতুন মোহরে পুনরায় বিবাহ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা:
- নিছক হিলার জন্য (শর্তসাপেক্ষে) বিবাহ করা হারাম — যদি কেউ শুধুমাত্র হিলার উদ্দেশ্যে বিবাহ করে এবং পূর্বেই চুক্তি করে যে সে তালাক দেবে, তবে এটি হারাম ও নাজায়েয।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহর অভিশাপ সেই ব্যক্তির উপর যে হিলা করে এবং যার জন্য হিলা করা হয়।" (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, যদি হিলার উদ্দেশ্যে বিবাহ হয় এবং সহবাসও হয়, তবে তালাকের পর প্রথম স্বামীর জন্য স্ত্রী হালাল হবে, তবে উভয়েই গুনাহগার হবে।
৩. একাধিকবার তালাক বললে জীবন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
হ্যাঁ, একাধিকবার তালাক বলা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ইসলামে তালাকের বিধান:
- এক তালাক (তালাকে রাজ'ঈ): স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারে ইদ্দতের মধ্যে।
- দুই তালাক: একই বিধান, ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায়।
- তিন তালাক (তালাকে মুগাল্লাযা): তৃতীয় তালাকের পর স্ত্রী সম্পূর্ণরূপে হারাম হয়ে যায়। পুনরায় বিবাহ শুধুমাত্র হিলার মাধ্যমে সম্ভব।
হাদিসের সতর্কবাণী: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা ঘৃণিত হালাল বস্তু হলো তালাক।" (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)
একাধিকবার তালাক বলার পরিণতি:
- যদি কেউ একসাথে তিন তালাক বলে দেয় (যেমন: "তুমি তালাক, তুমি তালাক, তুমি তালাক" অথবা "তোমাকে তিন তালাক"), তবে হানাফি মাজহাব মতে তিনটি তালাকই পতিত হবে এবং স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাবে।
- তবে আধুনিক প্রেক্ষাপটে অনেক ইসলামি পণ্ডিত এবং কিছু দেশের আইনে একসাথে তিন তালাককে এক তালাক গণ্য করা হয়। কিন্তু হানাফি মাজহাবের মূল মত হলো তিন তালাকই পতিত হবে।
জীবন নষ্ট না হওয়ার উপায়:
- তালাকের শব্দ উচ্চারণের আগে ১০ বার ভাবুন।
- রাগের সময় তালাক না দেওয়া — রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তালাক রাগের অবস্থায় দেওয়া হয়।" (তিরমিজি)
- তালাকের বিকল্প হিসেবে সুপারিশ: ধৈর্য ধারণ, পরামর্শ, কাউন্সেলিং।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
| বিষয় | বিধান | |-------|-------| | বিয়ের পূর্বে শর্তযুক্ত তালাক | শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে | | হিলা | তৃতীয় তালাকের পর পুনরায় বিবাহের বৈধ পদ্ধতি, তবে নিছক হিলার উদ্দেশ্যে বিবাহ হারাম | | একাধিকবার তালাক | তিন তালাক পতিত হলে স্ত্রী হারাম হয়ে যায়, হিলা ছাড়া পুনরায় বিবাহ সম্ভব নয় |
উপসংহার ও পরামর্শ
১. তালাকের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন। রাগের সময় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ২. শর্তযুক্ত তালাক দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। ৩. হিলা করা হারাম ও গুনাহের কাজ — এটি থেকে বিরত থাকুন। ৪. দাম্পত্য সমস্যা হলে আলেমের পরামর্শ নিন, তালাকের আগে মীমাংসার চেষ্টা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তালাকের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।