বিয়ের আগে ডিভোর্সের মাসআলা সম্পর্কে জানতে চাই?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4796
Questioner: Zxc
Question Asked: 02 Sep 2026, 06:47 AM
Reviewed & Published: 02 Sep 2026, 08:27 AM
Views: 6
Tokens: 3,589
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

হানাফি মাজহাবে বিয়ের আগে কোন কাজের সাথে সথ যুক্ত ডিভোর্স মাসআলা কোন ছাড় নেই কেন হিলা কোওসল আলেম গন রেখেছে ঠিকি কিন্তু কেউ যদি একাধিক বার বলে ফেলে সেই ছাড় কেন দেওয়া নেই ইসলাম তো কারো ওপর বছা চাপিয়ে দেই নি তখন

Answer

বিয়ের আগে ডিভোর্সের মাসআলা ও হিলা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

আপনি জানতে চেয়েছেন: হানাফি মাজহাবে বিয়ের আগে ডিভোর্সের সাথে সম্পর্কিত মাসআলায় কোনো ছাড় (রুখসাত) নেই কেন? হিলা (তালাকপ্রাপ্তা নারীকে পূর্ব স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ের বৈধতা দেওয়ার পদ্ধতি) সম্পর্কে আলেমগণ কেন কঠোরতা রেখেছেন? কেউ যদি একাধিকবার তালাক বলে ফেলে, তবে কেন সেই ছাড় দেওয়া হয়নি? ইসলাম কি কারো উপর বোঝা চাপিয়ে দেয়?

উত্তর

১. তালাকের মাসআলায় কঠোরতার কারণ

ইসলামে তালাক একটি বৈধ কিন্তু অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ। আল্লাহ তাআলা তালাককে হালাল করেছেন কিন্তু এর প্রতি গভীর অপছন্দ প্রকাশ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"আল্লাহর নিকট সর্বাপেক্ষা অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।" (আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০১৮)

তালাকের মাসআলায় কঠোরতা রাখার কারণ হলো:

  • তালাক একটি গুরুতর সিদ্ধান্ত, যা পরিবার ও সমাজকে ভেঙে দেয়
  • এটি একবার বললেই ফিরে নেওয়ার সুযোগ থাকে (রাজ'ঈ তালাক)
  • দুইবার তালাকের পরও ফিরে আসার সুযোগ থাকে
  • কিন্তু তৃতীয়বার তালাকের পর আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না

২. তিন তালাকের পর হিলার বিধান

যখন কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তখন সে স্ত্রী তার জন্য চিরতরে হারাম হয়ে যায়। পুনরায় বিয়ে করার জন্য শর্ত হলো:

"যদি সে (স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তবে সে তার জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। অতঃপর যদি সে (দ্বিতীয় স্বামী) তাকে তালাক দেয়, তবে তাদের উভয়ের (প্রথম স্বামী ও স্ত্রীর) পুনরায় মিলিত হওয়াতে কোনো গুনাহ নেই, যদি তারা আল্লাহর সীমারেখা বজায় রাখতে পারে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)

এই আয়াতের ভিত্তিতেই হিলার বিধান এসেছে। হিলা হলো: স্ত্রী অন্য একজন পুরুষকে বিয়ে করবে, তার সাথে বৈধ দাম্পত্য জীবন যাপন করবে, অতঃপর সে তালাক দিলে বা মৃত্যু হলে ইদ্দত শেষে পূর্ব স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে করতে পারবে।

৩. হিলায় কঠোরতার কারণ

হিলার ক্ষেত্রে কঠোরতা রাখার কারণ হলো:

ক. কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ: কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, তিন তালাকের পর স্ত্রী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ব স্বামীর জন্য হালাল হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে। এটি একটি শর্ত, যা পূরণ করতেই হবে।

খ. তালাকের গুরুত্ব বোঝানো: এই কঠোরতার মাধ্যমে ইসলাম বোঝাতে চায় যে, তালাক কোনো খেল-তামাশার বিষয় নয়। তিনবার তালাক দেওয়ার অর্থ হলো সম্পর্কটি সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা।

গ. হিলার অপব্যবহার রোধ: যদি সহজে হিলার অনুমতি দেওয়া হতো, তবে মানুষ তালাককে হালকাভাবে নিত এবং বারবার তালাক দিয়ে আবার হিলার মাধ্যমে ফিরে আসত। এটি তালাকের গুরুত্বকে নষ্ট করত।

৪. "ইসলাম কারো উপর বোঝা চাপিয়ে দেয় না" - এই প্রসঙ্গে

আপনার প্রশ্নের শেষ অংশে আপনি বলেছেন, "ইসলাম তো কারো উপর বোঝা চাপিয়ে দেয় না।" এটি সঠিক যে, ইসলাম কারো উপর অসহনীয় বোঝা চাপায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব দেন না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কোনো বিধানই কঠোর হবে না। ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের কল্যাণের জন্য। তালাকের ক্ষেত্রে কঠোরতা রাখার মাধ্যমে ইসলাম মূলত তালাককে নিরুৎসাহিত করছে, যাতে মানুষ তালাককে হালকাভাবে না নেয়।

৫. একাধিকবার তালাক বললে কেন ছাড় নেই?

যদি কেউ একাধিকবার তালাক বলে ফেলে, যেমন: "তালাক, তালাক, তালাক" - এক সাথে তিন তালাক দিয়ে দেয়, তবে হানাফি মাজহাব মতে তা তিন তালাকই গণনা হবে এবং স্ত্রী চিরতরে হারাম হয়ে যাবে। এখানে কোনো ছাড় নেই।

এর কারণ হলো:

  • রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এবং আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে এক সাথে তিন তালাককে এক তালাক গণনা করা হতো
  • কিন্তু উমর (রা.)-এর খিলাফতে তিনি এক সাথে তিন তালাককে তিন তালাক গণনার নির্দেশ দেন, কারণ মানুষ তখন তালাককে খেলাচ্ছলে ব্যবহার করছিল
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-সহ অধিকাংশ সাহাবা ও তাবেয়ীন এই মত গ্রহণ করেছেন

ইমাম তহাবী (রহ.) বর্ণনা করেন:

"উমর (রা.) যখন দেখলেন যে, লোকেরা তালাককে খেলাচ্ছলে ব্যবহার করছে, তখন তিনি এক সাথে তিন তালাককে তিন তালাক গণনার নির্দেশ দিলেন।" (শারহু মা'আনিল আসার, ৩/৯৯)

৬. হানাফি মাজহাবের দলিল

হানাফি মাজহাবে তিন তালাক এক সাথে দিলে তা তিন তালাকই গণনা হয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে:

"যে ব্যক্তি এক সাথে তিন তালাক দেয়, তার স্ত্রী তার জন্য হারাম হয়ে যায় এবং হিলা ছাড়া পুনরায় বিয়ে বৈধ নয়।" (বাদায়েউস সানায়ে, ৩/১০০; আল-হিদায়া, ২/৩৫৫)

৭. হিলার শর্তাবলী

হিলা বৈধ হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:

১. স্ত্রী দ্বিতীয় স্বামীকে প্রকৃত অর্থে বিয়ে করবে (মুহাল্লিলের নিয়তে নয়) ২. দ্বিতীয় স্বামীর সাথে প্রকৃত দাম্পত্য জীবন যাপন করবে ৩. দ্বিতীয় স্বামী তালাক দেবে বা মৃত্যুবরণ করবে ৪. ইদ্দত পূরণ করবে ৫. এরপর পূর্ব স্বামীর সাথে নতুন করে বিয়ে করতে পারবে

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"আল্লাহর অভিশাপ সেই ব্যক্তির উপর, যে হিলা করে এবং যার জন্য হিলা করা হয়।" (আবু দাউদ, হাদিস: ২০৭৬; তিরমিজি, হাদিস: ১১২০)

তবে যদি কেউ প্রকৃত অর্থে বিয়ে করে এবং পরে তালাক হয়, তবে তা বৈধ হবে এবং পূর্ব স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে করা জায়েজ হবে।

৮. উপসংহার

ইসলাম তালাকের বিষয়ে কঠোরতা রেখেছে মূলত তালাককে নিরুৎসাহিত করার জন্য। তিন তালাকের পর হিলার বিধান কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ। এটি কোনো বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং তালাকের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। ইসলাম কখনোই অসহনীয় বোঝা চাপায় না, বরং প্রতিটি বিধানের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণই কামনা করে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.