পরিবারের মানুষ যদি কালো জাদুর মাধ্যমে জিন দিয়ে কাজ করে তাদের সাথে কী সম্পর্ক রাখা উচিত হবে? বাবা মা যদি ছেলে মেয়েদের উপর জাদু করে তাহলে কী করব?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
কালো জাদু (জিন দিয়ে কাজ) এবং পরিবারের সাথে সম্পর্ক সম্পর্কিত ফতোয়া
প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: পরিবারের মানুষ যদি কালো জাদুর মাধ্যমে জিন দিয়ে কাজ করে, তাদের সাথে কী সম্পর্ক রাখা উচিত? বাবা-মা যদি ছেলে-মেয়েদের উপর জাদু করে তাহলে কী করব?
উত্তর
১. কালো জাদু ও জিন দিয়ে কাজ করার বিধান
কালো জাদু (সিহর) এবং জিন দিয়ে কাজ করানো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও কবিরা গুনাহ। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিন্দা এসেছে।
কুরআনের আয়াত:
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَىٰ مُلْكِ سُلَيْمَانَ ۖ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَٰكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ
"আর তারা অনুসরণ করল যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বে পাঠ করত। সুলাইমান কুফরি করেনি, বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল—তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত।" (সূরা আল-বাকারা: ১০২)
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ... وَالسِّحْرَ
"তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী কাজ থেকে বেঁচে থাকো... তার মধ্যে জাদুও রয়েছে।" (সহিহ বুখারী: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম: ৮৯)
ফাতাওয়া আলমগীরি: জাদু শেখা ও শেখানো হারাম। জাদু দ্বারা উপকার বা ক্ষতি করার চেষ্টা করা কবিরা গুনাহ। (ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫ম খণ্ড, ৩৬০ পৃষ্ঠা)
২. জাদুকারী ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের বিধান
যারা জাদু করে তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নীতিমালা প্রযোজ্য:
ক) তাদের সাথে সাধারণ লেনদেন ও আচরণ:
- জাদুকারীর সাথে সাধারণ সামাজিক সম্পর্ক রাখা যাবে, তবে তাদের কাজকে সমর্থন বা প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
- তাদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) বজায় রাখা যাবে, তবে তাদের জাদুর কাজে সহযোগিতা করা যাবে না।
খ) তাদের কাজের প্রতিবাদ:
- তাদেরকে নসীহত করা এবং জাদু থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেওয়া উচিত।
- যদি তারা তাওবা করে, তবে তাদের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখা যাবে।
গ) সম্পর্ক ছিন্ন করার বিধান:
- যদি জাদুকারী ব্যক্তি নিজের কাজ না ছাড়ে এবং তা প্রকাশ্যে করে, তবে তাকে বয়কট করা (সামাজিক ও আর্থিকভাবে) জায়েয হতে পারে।
- তবে পরিবারের সদস্য হলে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন না করে সীমিত সম্পর্ক রাখা উচিত, যাতে তাদের নসীহত করার সুযোগ থাকে।
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন: জাদুকারী ব্যক্তি যদি তাওবা না করে, তবে তার সাথে লেনদেন করা মাকরূহ এবং তাকে সম্মান করা উচিত নয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ২৭৮ পৃষ্ঠা)
৩. বাবা-মা যদি ছেলে-মেয়েদের উপর জাদু করে
এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। ইসলামে বাবা-মার মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ, কিন্তু তাদের অন্যায় কাজকে সমর্থন করা যাবে না।
ক) করণীয়: ১. আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন — নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে সূরা বাকারা, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ুন। ২. বাবা-মাকে নসীহত করুন — সম্ভব হলে তাদেরকে জাদুর কুফল ও শাস্তি সম্পর্কে জানান। ৩. আলেমের শরণাপন্ন হোন — কোনো বিশ্বস্ত আলেমের মাধ্যমে জাদু থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করুন। ৪. বাবা-মার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না — তাদের সাথে সদ্ব্যবহার চালিয়ে যান, তবে তাদের জাদুর কাজে অংশ নেবেন না।
খ) সম্পর্কের ক্ষেত্রে:
- বাবা-মার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়, এমনকি তারা জাদু করলেও।
- তবে তাদের জাদুর কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করুন এবং তাদের কাজে সহযোগিতা করবেন না।
- তাদের সাথে কথা বলা, খাওয়া-দাওয়া, সেবা-শুশ্রূষা চালিয়ে যান, কিন্তু তাদের জাদুর কাজকে সমর্থন করবেন না।
গ) নিজেকে রক্ষার উপায়:
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়ুন
- সূরা বাকারা নিয়মিত তিলাওয়াত করুন
- সকাল-সন্ধ্যার যিকির ও দোয়া পড়ুন
- আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস নিয়মিত পড়ুন
হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ قَرَأَ الْبَقَرَةَ فِي بَيْتِهِ لَمْ يَدْخُلْهُ الشَّيْطَانُ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ
"যে ব্যক্তি নিজ ঘরে সূরা বাকারা পড়ে, তিন দিন পর্যন্ত শয়তান তার ঘরে প্রবেশ করে না।" (মুসনাদ আহমাদ: ২৩৪৩)
৪. জাদু থেকে মুক্তির ইসলামিক পদ্ধতি
ক) রুকইয়াহ (দোয়া দ্বারা চিকিৎসা):
- বিশ্বস্ত আলেম বা হাফেজের মাধ্যমে কুরআন দ্বারা রুকইয়াহ করানো
- সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারার শেষ অংশ পড়া
খ) বৈধ চিকিৎসা:
- জাদুর প্রভাব দূর করার জন্য বৈধ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা
- কোনো অবস্থাতেই অন্য জাদুকরের কাছে যাওয়া যাবে না
গ) তাওবা ও ইস্তিগফার:
- নিজের গুনাহের জন্য তাওবা করা
- নিয়মিত ইস্তিগফার পড়া
৫. গুরুত্বপূর্ণ নসীহত
১. ধৈর্য ধারণ করুন — জাদুর প্রভাব থেকে মুক্তি পেতে সময় লাগতে পারে। ২. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — আল্লাহই সর্বশক্তিমান এবং তিনিই একমাত্র মুক্তিদাতা। ৩. বাবা-মার সাথে সদ্ব্যবহার চালিয়ে যান — তাদের অন্যায় সত্ত্বেও তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন না। ৪. গোপনীয়তা রক্ষা করুন — পরিবারের এই সমস্যা অন্যদের কাছে প্রকাশ না করাই ভালো। ৫. আলেমের পরামর্শ নিন — কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করে ব্যবস্থা নিন।
সূত্র:
- সূরা আল-বাকারা: ১০২
- সহিহ বুখারী: ২৭৬৬
- সহিহ মুসলিম: ৮৯
- ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫ম খণ্ড
- রদ্দুল মুহতার, ৬ষ্ঠ খণ্ড
- ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড