ফেসবুক, ইউটিউব, ই-কমার্স ওয়েবসাইটের বিভিন্ন কাজ ও ইনকাম হালাল নাকি হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 478
Questioner: Istiyak Ahmed
Question Asked: 21 May 2026, 12:52 PM
Reviewed & Published: 21 May 2026, 01:04 PM
Views: 36
Tokens: 5,076
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার নিম্নোক্ত কয়েকটি বিষয়ে জানা প্রয়োজন। শ্রদ্ধেয় ওস্তাদগন শরীয়তের দৃষ্টিতে এই বিষয়গুলির সমাধান দিলে অনেক উপকৃত হই।

১) ফেসবুকে বা ইউটিউবে নিজের যেকোনো হালাল প্রোডাক্ট মার্কেটিং করার প্রয়োজনে নিজেকে বা অন্য কোন পুরুষ ব্যক্তিকে প্রোডাক্টের সাথে ভিডিওতে উপস্থিত করা , যেমন আম এবং খেজুর গুড় বা আখের গুড় বিক্রি করার সময় যার ব্যবসা সে যে ওই আমবাগান বা ঐ খেজুরের এলাকা বা ঐ আখের ক্ষেতে আছে তা ক্রেতাকে বিশ্বাস করানোর জন্য পুরুষ সেলার ভিডিওতে আসে, এমন ভিডিও বানানো জায়েজ হবে কিনা এবং সেই ভিডিও প্রোডাক্ট সেলস এর স্বার্থে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচার করা জায়েজ হবে কিনা ?

২) ইউটিউবে যে সকল প্লাম্বিং কোম্পানি, এসি রিপেয়ার কোম্পানি, ইলেকট্রিক রিপেয়ার কোম্পানি, হাউস রিপেয়ার কোম্পানি শুধুমাত্র পুরুষের মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করা থাকে ওই সকল কোম্পানির ইউটিউব ভিডিও SEO -র কাজ করা জায়েজ কিনা?

৩) আর যদি ওই ইউটিউব ভিডিওতে নারী উপস্থিত থাকে কিন্তু নারী কন্ঠস্বর ও মিউজিক না থাকে সে ক্ষেত্রে ওই ইউটিউব ভিডিওতে SEO করা জায়েজ হবে কিনা?

৪) বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইটে পুরুষ, বেপর্দা মহিলা, শিশু এবং বিভিন্ন হালাল প্রোডাক্ট এর ছবি থাকে এক্ষেত্রে আমি যদি ওই ওয়েবসাইটের SEO করার কাজ করি, সে ক্ষেত্রে SEO-র মাধ্যমে গুগল সার্চের প্রথম পেজে আসার কারণে অনেক মানুষ ঐ ওয়েবসাইট ভিজিট করবে। সে ক্ষেত্রে বেপর্দা নারীদের ছবি থাকার কারণে যেহেতু আমি ঐ ওয়েবসাইটকে SEO -র মাধ্যমে গুগল সার্চ পেইজে উপরের দিকে আনার কারণে অনেক বেশি মানুষ ঐ ওয়েব সাইটে গিয়ে পুরুষ, বেপর্দা মহিলা, শিশু এবং বিভিন্ন হালাল প্রোডাক্ট দেখবে। যেহেতু SEO -র মাধ্যমে আমি ওই ওয়েবসাইটের রেঙ্ক বাড়ানোর কাজ করব এবং ইউজার গিয়ে যদি বেপর্দা নারী দেখে সে ক্ষেত্রে সহযোগিতা করায় আমি গুনাহগার হবো কিনা এবং এই ওয়েবসাইটের SEO-র কাজ করা আমার জন্য জায়েজ হবে কিনা ?

৫) ই-কমার্স ওয়েবসাইটের বিভিন্ন হালাল প্রোডাক্ট হাতে নিয়ে নারী অথবা পুরুষ ওই প্রোডাক্ট রিপ্রেজেন্ট করছে এমন ছবি থাকে। যদিও ওই ছবিতে মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে ওই হালাল প্রোডাক্ট।
সে ক্ষেত্রে আমি ওই পুরুষ অথবা মহিলার ছবি সম্বলিত হালাল প্রোডাক্টটি অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং এর মাধ্যমে সেল করা জায়েজ হবে কিনা এবং ওই ছবি যুক্ত হালাল প্রোডাক্ট সেল করে যে সেলস কমিশন পাব তা হালাল হবে কিনা?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
উত্তর প্রদানে: ফাতাওয়া ওসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া, রদ্দুল মুহতার, বেহেশতী জেওর, মা‘আরিফুল কুরআন, ফাতাওয়া আলমগীরী, হিদায়াহ, শারহু মা‘আনিল আসার, উসূলুশ শাশী প্রভৃতি হানাফী কিতাবের আলোকে।

প্রশ্নসমূহের উত্তর নিম্নরূপ:


১) নিজের হালাল প্রোডাক্ট মার্কেটিংয়ে পুরুষ সেলারকে ভিডিওতে দেখানো ও প্রচার করা

উত্তর: যদি ভিডিওতে শুধুমাত্র পুরুষ ব্যক্তি থাকে, তার পোশাক শারঈ পর্দার মধ্যে (সতর ঢাকা) হয়, এবং ভিডিওতে কোনো নারী, গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা হারাম বিষয় না থাকে, তাহলে এই ধরনের ভিডিও বানানো ও প্রচার করা জায়েজ। কারণ এটি ব্যবসায়িক স্বার্থে একটি বৈধ পদ্ধতি। তবে শর্ত হলো, ভিডিওতে কোনো মিথ্যা বা ধোঁকা না থাকা।
হাদীসে এসেছে: «إنما البيع عن تراض» অর্থাৎ "নিশ্চয়ই ক্রয়-বিক্রয় পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে হয়" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২১৮৫)। এখানে সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা জরুরি।
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/৪২৫)-এ বলা হয়েছে: ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনে সত্য ও বৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করলে তা জায়েজ।


২) ইউটিউবে পুরুষদের মাধ্যমে তৈরি প্লাম্বিং/এসি রিপেয়ার ইত্যাদি ভিডিওর SEO করা

উত্তর: যেহেতু এই ভিডিওতে শুধুমাত্র পুরুষ এবং তাদের কাজের প্রকৃত চিত্র রয়েছে (কোনো নারী, মিউজিক বা অশ্লীলতা নেই), তাই এসব ভিডিওর SEO করা জায়েজ। তবে পুরুষদের পোশাক সতর ঢাকা কিনা নিশ্চিত হতে হবে।
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৮৫)-এ উল্লেখ আছে: উপকারী ও বৈধ বিষয়ের প্রচার করা জায়েজ, যদি তাতে কোনো হারামের সহযোগিতা না থাকে।


৩) ভিডিওতে নারী উপস্থিত থাকলে কিন্তু নারী কণ্ঠস্বর ও মিউজিক না থাকলে SEO করা

উত্তর: যদি ভিডিওতে নারী শারঈ পর্দার মধ্যে থাকে (অর্থাৎ সম্পূর্ণ দেহ ঢাকা, মেকআপ ও সাজসজ্জা ছাড়া), এবং তার উপস্থিতি যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি না করে, তবে এমন ভিডিওর SEO করা জায়েজ হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ বাস্তবতায় এ ধরনের ভিডিওতে নারীরা যথাযথ পর্দা করে না। তাই সাধারণত একে জায়েজ বলা কঠিন
রদ্দুল মুহতার (৬/৩৬৮)-এ বলা হয়েছে: নারীর সাথে দেখা-দেখি ও তার সৌন্দর্য প্রকাশের মাধ্যম তৈরি করা হারাম।
সুতরাং যদি নারীর পর্দা লঙ্ঘন হয়, তবে তার ভিডিও প্রচার করা বা SEO করে আরও বেশি লোকের কাছে পৌঁছে দেওয়া না জায়েজ


৪) বেপর্দা নারী, পুরুষ ও শিশুর ছবিসহ ই-কমার্স সাইটের SEO করা

উত্তর: এটি স্পষ্টতই না জায়েজ। কারণ:

  • সাইটে বেপর্দা নারীর ছবি থাকলে তা হারাম দৃশ্য
  • আপনি SEO-র মাধ্যমে সাইটের র‍্যাংক বাড়িয়ে লাখো মানুষের কাছে সেই হারাম দৃশ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। এটি গুনাহের সহযোগিতা
    কুরআন: «وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ» (সূরাহ মায়েদাহ: ২) – "তোমরা পুণ্য ও তাকওয়ার মধ্যে সহযোগিতা করো, আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের মধ্যে সহযোগিতা করো না।"
    ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৭৮)-এ উল্লেখ: যে কোনো হারাম কাজের মাধ্যম সরবরাহ করা বা সুযোগ করে দেওয়া গুনাহের কাজ।
    এমতাবস্থায় এই SEO কাজ করা হারাম এবং আয়ও হারাম হবে।

৫) পুরুষ বা নারীর ছবিসম্বলিত হালাল প্রোডাক্টের অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও কমিশন

উত্তর:

  • যদি ছবিতে পুরুষ থাকে, এবং তার পোশাক শারঈ সীমার মধ্যে হয়, তাহলে সেই প্রোডাক্টের অ্যাফিলিয়েট লিংক প্রচার করা জায়েজ এবং কমিশন হালাল।
  • যদি ছবিতে বেপর্দা নারী থাকে (অর্থাৎ নারীর সতর অথবা সৌন্দর্য প্রকাশিত), তাহলে সেই ছবিসহ প্রোডাক্ট প্রচার করা হারাম এবং কমিশনও হারাম। কারণ এটি অশ্লীলতার সঙ্গে জড়িত।
  • যদি নারী পর্দা করে থাকে (শুধু হাত-মুখ দেখা যায়, যেটা কঠিনভাবে প্রয়োজনীয়), তাহলে তার ছবি ব্যবহার করায় ভিন্ন মত থাকলেও, শ্রেষ্ঠ হলো পরিহার করা। তবে প্রোডাক্টটি যদি সম্পূর্ণ হালাল হয় এবং ছবি নিছক প্রোডাক্ট চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয় (সৌন্দর্য প্রদর্শন নয়), তাহলে অধিকাংশ হানাফী ফকীহের মতে তা জায়েজ। তবে শর্ত হলো যে ছবিটি নারীর পর্দা লঙ্ঘন না করে এবং তা কোনো ফিতনার কারণ না হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৭০)

সারকথা: পুরুষের স্বাভাবিক ছবি জায়েজ; বেপর্দা নারীর ছবি হারাম। আর এই ছবি সম্বলিত প্রোডাক্টের অ্যাফিলিয়েট করার ক্ষেত্রে কমিশনের হালাল-হারাম নির্ভর করে ছবিটি জায়েজ কি না তার ওপর।


সতর্কতা ও পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা

১. যেকোনো বিজ্ঞাপন বা মার্কেটিং পদ্ধতিতে মিথ্যা, অতিরঞ্জন, ধোঁকা, অশ্লীলতা, গান-বাজনা, নারীর অবৈধ উপস্থিতি থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য।
২. SEO কাজ করার সময় ক্লায়েন্টের কন্টেন্ট সম্পূর্ণরূপে যাচাই করুন। যদি হারাম কন্টেন্ট থাকে, তবে তা পরিষ্কার করার শর্তে কাজ করুন; অন্যথায় কাজ না করাই উত্তম।
৩. নারী ও পুরুষের ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে শারঈ পর্দা (বিশেষত নারীদের জন্য পূর্ণ আবরণ) বজায় আছে কিনা নিশ্চিত হোন।
৪. সহযোগিতার নীতি: আল্লাহ বলেন: «وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَىٰ وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّىٰ وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ» (সূরাহ নিসা: ১১৫) – অর্থাৎ কেউ যদি সত্য প্রকাশের পর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং মুমিনদের পথ ছেড়ে চলে, তবে আমরা তাকে তার পথেই ছেড়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।

তাই প্রশ্নোক্ত পাঁচটি বিষয়ের ক্ষেত্রে: ১ ও ২ নং জায়েজ; ৩ নং শর্তসাপেক্ষে জায়েজ হতে পারে (যদি নারী পর্দায় থাকে ও ফিতনা না হয়); ৪ নং সম্পূর্ণ হারাম; ৫ নং – পুরুষের ছবি জায়েজ, বেপর্দা নারীর ছবি হারাম, পর্দাকারী নারীর ছবি সহিহ হলে আলিমের পরামর্শ নিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.