আমি আগে ভবিষ্যৎ গণনা, হাতের রেখা দেখা ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতাম (নাউজুবিল্লাহ)। আমাকে কি পুনরায় ঈমান আনতে হবে?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 4746
Questioner: Blue
Question Asked: 01 Sep 2026, 03:27 PM
Reviewed & Published: 01 Sep 2026, 03:31 PM
Views: 34
Tokens: 8,031
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

১. আমি আগে ভবিষ্যৎ গণনা, হাতের রেখা দেখা ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতাম (নাউজুবিল্লাহ)। এখন এগুলোতে আমি নেই।

আমি আমার ঈমান ঠিক রাখতে চেষ্টা করছি, আমি অনুভব করি যে শয়তান আমাকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছে।

একটা হাদীস এমন ছিল যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যেসব জ্বিন শয়তান উপরে গিয়ে ভবিষ্যত জানার চেষ্টা করে, তারা গণকদের কাছে এসে প্রতি ১০০ টা কথায় ৯৯ টা মিথ্যা বলে, মানে বাকি ১ টা সত্য বলে।

আমি আগে যেহেতু এইসব ঘাটতাম, তাই এখন আমি জানি যে এগুলোর বেশিরভাগই মিথ্যা হয়। এটা আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে ঈমানের প্রমাণস্বরূপ। এই অভিজ্ঞতার দ্বারা যদি আমি ঈমান আনি, তাহলে কি আমার ঈমান আনা হবে? আমি কুরআন, হাদীস সবই বিশ্বাস করে ঈমান আনতে চাচ্ছিলাম, এইসব বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারা না। শুধু কুরআন, হাদীস থেকে যখন ঈমান আনি, তখন মনে হয় শয়তানের সাথে যুদ্ধ করে ঈমান অঞ্চি, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখলাম, তা কুরআন, হাদীস এর সাথে মিলে যায়, ঈমান আনতে সহজ হয়। আমি এভাবে ঈমান আনলে কি ঈমানদার হবো?

২. ঈমান যে মনে থাকে, সে মনে তো ওয়াসওয়াসা হয়। কিন্তু আমার ওয়াসওয়াসা এর সমস্যা তখন শুরু হয় যখন আমি কুফরী, শিরক ইত্যাদি সরাসরি বিশ্বাস করতে শুরু করি। এটি কীভাবে সম্ভব? সমসাময়িক সময়ে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখি স্বপ্নে। ওনার চেহারা মোবারক দেখি নাই, শুধু দেখেছিলাম যে উনি সরু এক নদীর ওপরে ভাসমান অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, (নয়তো নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঠিক মনে নেই), পানির রং পরিষ্কার ঝকঝকে নীল ছিল। আমি শুক্রবার দেখেছিলাম। আমার মনে পড়ে আমার ঈমান ছিল না ওইসময়, তাহলে কিভাবে ওয়াসওয়াসা হতো এবং আনি ওনাকে দেখতে পাই?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্ন ১: বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ঈমান আনা

আপনার প্রশ্নের উত্তর হলো—হ্যাঁ, আপনি এভাবে ঈমান আনলে ঈমানদার হবেন, ইনশাআল্লাহ।

ঈমানের মূল ভিত্তি

ঈমানের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। কুরআন ও হাদীসের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম থাকতে পারে—কেউ যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে, কেউ বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, কেউ অলৌকিক ঘটনা দেখে। মূল বিষয় হলো অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস, যে মাধ্যমেই তা অর্জিত হোক না কেন।

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ফিকহুল আকবর-এ বলেছেন:

"ঈমান হলো আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, আখিরাতের দিন এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।"

তবে মনে রাখতে হবে, বাস্তব অভিজ্ঞতা ঈমানের মূল উৎস নয়, বরং এটি একটি সহায়ক মাধ্যম মাত্র। আপনার ঈমানের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত কুরআন ও সহীহ হাদীস। বাস্তব অভিজ্ঞতা যদি সেই সত্যকে সমর্থন করে, তবে তা ঈমানকে মজবুত করতে পারে, কিন্তু ঈমানের মূল ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহই থাকা উচিত।

গণক-জ্যোতিষীদের সম্পর্কে ইসলামী বিধান

আপনি যে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন, তা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে যায় এবং সে যা বলে তা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদের উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৯০৫; মুসনাদে আহমাদ)

অন্য হাদীসে এসেছে:

"যে ব্যক্তি কোনো গণক বা জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং তাকে কিছু জিজ্ঞেস করে, তার ৪০ রাতের নামাজ কবুল হয় না।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৩০)

আপনি আগে এইসব বিশ্বাস করতেন বলে আল্লাহর কাছে তওবা করুন। আল্লাহ তা'আলা তওবা কবুলকারী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:

"বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)

প্রশ্ন ২: ঈমান থাকা সত্ত্বেও কুফরী-শিরকের ওয়াসওয়াসা

ওয়াসওয়াসার প্রকৃতি

ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ-প্রবণতা) শয়তানের একটি কৌশল। শয়তান মুমিনের ঈমান নষ্ট করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে। ঈমান থাকা সত্ত্বেও ওয়াসওয়াসা হওয়া স্বাভাবিক, এবং এটি ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং শয়তানের ঈর্ষার লক্ষণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

"শয়তান তোমাদের কারো কাছে এসে বলে, 'কে এই দুনিয়া সৃষ্টি করেছে? কে এই আকাশ সৃষ্টি করেছে?' তখন সে বলে, 'আল্লাহ।' তখন শয়তান বলে, 'তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?' যখন তোমাদের কেউ এরূপ অনুভব করে, সে যেন আল্লাহর কাছে পানাহ চায় এবং এ চিন্তা ছেড়ে দেয়।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৭৬)

ওয়াসওয়াসা বনাম বিশ্বাস

আপনি বলেছেন যে আপনার ওয়াসওয়াসা তখন শুরু হয় যখন আপনি কুফরী-শিরক সরাসরি বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। যদি আপনার অন্তরে সত্যিই কুফরী-শিরকের বিশ্বাস জন্ম নেয়, তবে তা ঈমানের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু যদি এটি শুধুমাত্র অবসেসিভ চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) হয়—যা আপনি বিশ্বাস করেন না, বরং এসব চিন্তা আপনার মনে উদয় হয় এবং আপনি তা অপছন্দ করেন—তাহলে এটি ঈমানের ক্ষতি করে না।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের পক্ষ থেকে অন্তরে নিক্ষিপ্ত এমন খারাপ চিন্তা যা মানুষ অপছন্দ করে এবং যা তার বিশ্বাসের বিপরীত। এটি ঈমানের ক্ষতি করে না, বরং এটি ঈমানের প্রমাণ, কারণ মুমিনই কেবল এসব চিন্তাকে অপছন্দ করে।"

স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখা

আপনি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছেন—এটি একটি মহান নিয়ামত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখল, সে যেন আমাকে সত্যিই দেখল। কারণ শয়তান আমার আকৃতিতে আসতে পারে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬৬)

তবে মনে রাখতে হবে, ঈমান না থাকা অবস্থায় স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখা সম্ভব কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, ঈমানদার ব্যক্তিই সাধারণত এই স্বপ্ন দেখে থাকেন, এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াতের একটি মাধ্যম হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে, এটি আল্লাহর রহমতেরই একটি নিদর্শন যে, তিনি আপনাকে এই স্বপ্ন দেখিয়ে হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন।

আপনার করণীয়

১. তওবা করুন: অতীতের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে তওবা করুন। আল্লাহ তওবা কবুলকারী।

২. ঈমান পুনর্নবীকরণ করুন: কালিমা শাহাদাত পাঠ করে ঈমান পুনর্নবীকরণ করুন।

৩. ওয়াসওয়াসা দূর করুন: ওয়াসওয়াসা এলে "আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি" বলুন এবং "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম" পড়ুন।

৪. নিয়মিত নামাজ ও যিকির করুন: নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং যিকির ঈমানকে মজবুত করে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করে।

৫. আলেমের পরামর্শ নিন: প্রয়োজনে কোনো বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।

আল্লাহ তা'আলা আপনার ঈমানকে মজবুত করুন এবং শয়তানের সকল কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন। আমীন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.