স্বামীকে অভিশাপ দেয়া সংক্রান্ত।

Family Life · Hanafi

Question No: 4732
Questioner: Noorzahan Sheemu
Question Asked: 01 Sep 2026, 01:01 PM
Reviewed & Published: 01 Sep 2026, 02:03 PM
Views: 9
Tokens: 5,935
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

, আমার হাজবেন্ড সে আমাকে শারীরিক আঘাত তো করেছেই, তার চেয়েও মানসিক আঘাত করেছে বেশি। তার মা, তার পরিবারের সামনেই সে এসব করছে, তার মায়ের কাছে এসব স্বাভাবিক।এই মানুষটা আমার মন থেকে উঠে গেছে। ঘেন্না লাগে, আমার নিজেকে ওর কাছে ভ্যালুএবেল ফিল হয়না। মনে হয় ও জাস্ট আমাকে নিজের প্রয়োজন মত ব্যবহার করছে। আমার মনের মধ্যে ওকে নিয়ে প্রচন্ড ঘৃণা আর অভিমান জমে আছে। আমি ওর ব্যবহার এর জন্য ওকে মাফ করতে পারিন, ওর নোংরা ব্যবহার, অপমান ভুলতে পারিনা। আমি রাগে একা একা প্রায়ই বলে ফেলি ও মরে না কেনো,ও যেনো মরে যায়, আল্লাহ ওর বিচার করবে।আমি চাই না ও মরে যাক, ও বেঁচে থাক, ভালো থাক। কিন্তু এসব বলা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনাএসব কথার কারণে কি অভিশাপ পতিত হয়, কোনো ক্ষতির আশংকা আছে এসব কথা বলার কারণে।নিজেকে কিভাবে এসব বলা থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

Answer

উত্তরের সূচনা

প্রশ্নকারী বোনের প্রতি আমাদের আন্তরিক সহমর্মিতা ও সমবেদনা রয়েছে। আপনার কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণা আমরা অনুভব করতে পারছি। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।


প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার

আপনার স্বামী আপনাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করেছে, তার পরিবারের সামনে আপনাকে অপমান করেছে। ফলে আপনার মনে তার প্রতি ঘৃণা ও অভিমান জমে গেছে। আপনি রাগের মাথায় একা একা বলেছেন: "ও মরে না কেনো, ও যেনো মরে যায়, আল্লাহ ওর বিচার করবে।" কিন্তু আপনি চান না সে মরে যাক। আপনার প্রশ্ন:

১. এসব কথা বলার কারণে কি অভিশাপ পতিত হয়? ২. কোনো ক্ষতির আশংকা আছে কি? ৩. নিজেকে কিভাবে এসব বলা থেকে নিয়ন্ত্রণ করবেন?


১. অভিশাপ ও ক্ষতির আশংকা প্রসঙ্গে

কুরআন ও হাদীসের আলোকে

প্রথমত: রাগের মাথায় উচ্চারিত কথা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা হলো:

"রাগ করো না" (লা তাগদাব) — [সহীহ বুখারী: ৬১১৬]

দ্বিতীয়ত: কোনো মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের মৃত্যু কামনা করা বা অভিশাপ দেওয়া উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসিকী এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।" — [সহীহ বুখারী: ৪৮; সহীহ মুসলিম: ৬৪]

তৃতীয়ত: তবে আপনার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। আপনি রাগের মাথায় বলেছেন, কিন্তু আপনার অন্তর সাক্ষ্য দিচ্ছে যে আপনি আসলে তার মৃত্যু চান না। এটি আপনার ঈমানের প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তিনটি বিষয় ঈমানের মূল: ... (তার মধ্যে) তুমি এমন কথা বলবে না যা তোমার নিজের ক্ষতি করবে।" — [মুসনাদ আহমাদ: ২৩৮২৯]

অভিশাপ পতিত হওয়ার বিষয়ে

ইসলামী নীতি: কোনো ব্যক্তির প্রতি অভিশাপ বা বদদোয়া করার অর্থ এই নয় যে, তা অবশ্যই পতিত হবে। অভিশাপ পতিত হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:

১. অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করা জায়েয আছে যদি তা ন্যায়সঙ্গত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আল্লাহ পছন্দ করেন না যে, কেউ মন্দ কথা প্রকাশ করুক, তবে যার উপর অত্যাচার করা হয়েছে সে ভিন্ন।" — [সূরা আন-নিসা: ১৪৮]

২. তবে উত্তম হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করা। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই আল্লাহ অত্যাচারিতের দোয়া কবুল করেন, যদিও তা বিলম্বে হয়।" — [সহীহ বুখারী: ৩০৫৩]

৩. আপনার ক্ষেত্রে: আপনি রাগের মাথায় বলেছেন, কিন্তু আপনার অন্তর তার মৃত্যু চায় না। এটি আপনার নিয়তের পরিচয়। ইসলামে আমলের বিচার হয় নিয়তের ভিত্তিতে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল।" — [সহীহ বুখারী: ১; সহীহ মুসলিম: ১৯০৭]

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: "যদি কোনো ব্যক্তি রাগের মাথায় এমন কথা বলে যা সে বিশ্বাস করে না, তবে তা তার ঈমানের ক্ষতি করে না, তবে তাকে তওবা করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।" — [ফিকহুল আকবর, ইমাম আবু হানীফা]

ইবনে আবেদীন (রহ.)-এর বক্তব্য

রদ্দুল মুহতার গ্রন্থে ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন: "রাগের অবস্থায় উচ্চারিত কথা তালাক বা শপথের ক্ষেত্রে গণ্য হয় না, যদি ব্যক্তি সম্পূর্ণভাবে রাগান্বিত হয় এবং নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। তবে অন্যান্য বিষয়ে তাকে তওবা করতে হবে।" — [রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫]

আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

আপনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো:

১. আপনার নিয়ত শুদ্ধ — আপনি তার মৃত্যু চান না, এটি আপনার অন্তরের সাক্ষ্য। ২. আপনি রাগের মাথায় বলেছেন — রাগের অবস্থায় উচ্চারিত কথা সাধারণত ক্ষমার যোগ্য। ৩. তবে তওবা করা উচিত — আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কথা না বলার সংকল্প করা।


২. নিজেকে নিয়ন্ত্রণের উপায়

কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনা

প্রথমত: রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সেই শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে জেতে, বরং সেই শক্তিশালী যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।" — [সহীহ বুখারী: ৬১১৪; সহীহ মুসলিম: ২৬০৯]

দ্বিতীয়ত: রাগান্বিত অবস্থায় করণীয়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যদি তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন চুপ থাকে।" — [মুসনাদ আহমাদ: ২১৩৬]

অন্য হাদীসে এসেছে:

"যদি তোমাদের কেউ দাঁড়ানো অবস্থায় রাগান্বিত হয়, তবে সে যেন বসে পড়ে। যদি তবুও রাগ না কমে, তবে সে যেন শুয়ে পড়ে।" — [সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪]

তৃতীয়ত: রাগান্বিত অবস্থায় পানির ব্যবহার

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, আর শয়তান আগুন থেকে সৃষ্ট। আগুন পানি দ্বারা নিভে যায়। সুতরাং তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন অজু করে।" — [সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৬]

ব্যবহারিক পরামর্শ

১. রাগের মুহূর্তে করণীয়:

  • চুপ থাকুন
  • বসে পড়ুন বা শুয়ে পড়ুন
  • অজু করুন
  • "আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম" পড়ুন
  • ১০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" পড়ুন

২. দীর্ঘমেয়াদী সমাধান:

  • নিয়মিত নামাজ পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ধৈর্য প্রার্থনা করুন
  • কুরআন তিলাওয়াত করুন, বিশেষ করে সূরা বাকারা
  • জিকির করুন, বিশেষ করে "লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"
  • স্বামীর ভালো দিকগুলো মনে করার চেষ্টা করুন
  • পরিবার বা বন্ধুদের সাথে কথা বলে মন হালকা করুন

৩. স্বামীর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের উপায়:

  • শান্তভাবে কথা বলার চেষ্টা করুন
  • তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করুন
  • প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মধ্যস্থতা নিন
  • ইসলামী পরামর্শক বা আলেমের সাহায্য নিন

৩. আপনার স্বামীর আচরণ সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

স্বামীর কর্তব্য

ইসলামে স্বামীর প্রতি স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করো।" — [সূরা আন-নিসা: ১৯]

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।" — [সুনানে তিরমিযী: ১১৬২]

স্ত্রীকে শারীরিক আঘাত করা নিষিদ্ধ

ইসলামে স্ত্রীকে শারীরিক আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীকে দাসীর মতো প্রহার না করে।" — [সহীহ বুখারী: ৫২০৪]

আপনার অধিকার

আপনার স্বামীর আচরণ ইসলামী আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। আপনি নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নিতে পারেন:

১. তাকে ইসলামী নির্দেশনা সম্পর্কে জানান — সম্ভব হলে কোনো আলেমের মাধ্যমে ২. পারিবারিক মধ্যস্থতা — পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করুন ৩. ইসলামী পরামর্শ — কোনো বিশ্বস্ত আলেমের কাছে পরামর্শ নিন ৪. চরম প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা — যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয়


৪. তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব

তওবার শর্ত

আপনি রাগের মাথায় যে কথা বলেছেন, তার জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করুন। তওবার শর্ত হলো:

১. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া ২. অনুতপ্ত হওয়া ৩. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প

দোয়া

আপনি নিম্নোক্ত দোয়াটি পড়তে পারেন:

"رَبِّ اغْفِرْ لِي وَارْحَمْنِي وَتُبْ عَلَيَّ" (উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলি ওয়ারহামনি ওয়া তুব আলাইয়্যা) অর্থ: "হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন এবং আমার তওবা কবুল করুন।"


৫. চূড়ান্ত পরামর্শ

১. আপনার ঈমান রক্ষা করুন — আপনার অন্তরের ভালোবাসা ও ক্ষমার মনোভাবই আপনার প্রকৃত পরিচয় ২. ধৈর্য ধারণ করুন — আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন ৩. আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করুন — আপনার স্বামীর হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন ৪. পারিবারিক সমাধান খুঁজুন — সমস্যা সমাধানে পরিবারের বড়দের সাহায্য নিন ৫. নিজের যত্ন নিন — মানসিক ও শারীরিকভাবে নিজেকে সুস্থ রাখুন


উপসংহার

আপনার রাগের মাথায় বলা কথাগুলোর কারণে অভিশাপ পতিত হওয়ার আশংকা নেই, কারণ আপনার নিয়ত শুদ্ধ এবং আপনি আসলে তার মৃত্যু চান না। তবে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা উচিত। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসরণ করুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন। আল্লাহ আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনার স্বামীকে সঠিক পথ দেখান। আমীন।


দ্রষ্টব্য: যদি পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং আপনার শারীরিক বা মানসিক নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়, তাহলে স্থানীয় ইসলামী স্কলার বা বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন। প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিতে দ্বিধা করবেন না।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.