দ্বীনের পথে থাকা,হালাল হারাম মেনে চলা সহ বিবিধ প্রশ্ন

Family Life · Hanafi

Question No: 4726
Questioner: Nahida Nodi
Question Asked: 01 Sep 2026, 12:01 PM
Reviewed & Published: 01 Sep 2026, 12:04 PM
Views: 13
Tokens: 16,948
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকা তুহ।

সম্মানিত মুফতি সাহেব, আমার কিছু প্রশ্ন ছিলো। আমার বর্তমানে কি করনীয় তা আমি বুঝতে পারছি না। আমাকে অনুগ্রহ করে সঠিক দিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন ইন শা আল্লাহ।

আল্লাহর রহমতে ২৪ সালে আমি হেদায়েতের সন্ধান পাই। এরপর পর্দা আরও বেসিক ইসলামের যেসব জিনিস রয়েছে সেগুলোকে যথাসাধ্য আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় আছি।
আমার পরিবার, কাছাকাছি আত্মীয়দের মধ্যে কারোরই সঠিক দ্বীনের বুঝ নেই। হালাল-হারাম, মাহরাম-নন মাহরাম তেমনভাবে কেউ মানেন না। পরিবারে, আত্নীয়স্বজনদের মধ্যে কোনো আলেম, মুফতিও নেই।

দ্বীনের পথে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই আমার পরিবর্তনটাকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। অনেক লড়াই করতে হয়েছে পর্দার জন্য। পরিস্থিতি এখন কিছুটা অনুকূলে রয়েছে।

আমার এডমিশন টাইমে আল্লাহ আমাকে হেদায়েত দেন, তাই ভার্সিটির পরিবেশে নিজের ঈমান টিকবে না ভেবে পাবলিক ভার্সিটির জন্য গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করিনি। পরিবারকে বুঝ দেওয়ার জন্য এবং নিজের ঈমানকে সেভ রাখার জন্য একটা ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হয়ে আছি। এজন্য মেসে থাকি বাসা থেকে দূরে। মূলত এটা বাহিরে থাকার জন্য এটা একটা অজুহাত বললেও চলে।

আমার বাসায় যেহেতু বেশিরভাগই ইসলাম প্রাক্টিস করেন না, তাদের পরিভাষায় ইসলাম বলতে নামাজ, রোজা, পর্দা এতটুকুই এর বাহিরে আর কিছু নেই। পর্দা করে সব করা যায় এমন মনোভাব তাদের।
চাকরিও করা যাবে, এবং আমাকে চাকরি করতে হবে।
তো আমি বাসায় বিভিন্ন কারণে থাকি না, সেখানে থাকলে রবের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক দুর্বল হয়ে যায়, নামাজ পড়লেও সেখানে খুশুখুজু থাকে না। পরিবেশের সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারি না, নিজের ঈমান অনেক দুর্বল হয়ে যায়। আবার যেহেতু আমি আইওএম এর ছাত্রী, তাই ক্লাস, মাশক, তামরীন এগুলো করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। বাসা থেকে সাপোর্ট করে না।
বাবা তো আমাকে একদিন এভাবে বলেছি আলেমা হবে, আলিম হওয়া তোমার....দিবে। ইত্যাদি ইত্যাদি ভাষা খারাপ করে কথা বলেছিলেন। আমার এখনও আত্মা কেঁপে উঠে বাবার মুখে ওমন কথা শুনে, আগে আমাকে ভাষা খারাপ করে গালি দেননি, কিন্তু ইসলামে ফিরে, ইসলামের সাথে নিজেকে পরিপূর্ণ যুক্ত করতে গেলে বাসায় তা কিছুতেই সম্ভব না। যদি না আল্লাহ খুব দয়া করেন, আমার পরিবারকে হেদায়েত না দেন।
তাই নিজের সুবিধার জন্য, নিজের ঈমান, আখলাককে, নিজের তাকওয়া অনেক উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে দূরে থাকা দরকার। কারণ দ্বীনী বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে, আল্লাহকে জানতে হবে, নয়তো সেইটা কিভাবে সম্ভব? বাসায় বেশিসময় নিয়ে সালাত পড়লে সেটা নিয়েও কথা শুনতে হয় কেন এতো সময় লাগে সালাতে, ঘন ঘন কুরআন তেলওয়াত করলে বলে সারাদিন ধর্ম নিয়েই পরে থাকি, জেনারেল পড়াশোনা করি কখন? এসব নিয়েই সারাদিন নাকি পড়ে থাকি! ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা বলে বাবা মা। আইওএম এর ক্লাস, মাশক এগুলো তো তাদের থেকে লুকিয়েই করার চেষ্টা করি। তাও মাঝে মাঝে দেখে ফেললে বলি, আমার কুরআন তেলওয়াত তো শুদ্ধ নয়, তাই শুদ্ধ করে পড়ার চেষ্টা করছি। এজন্যই ক্লাস করি। যেহেতু আমাদের ১ম,২য় সেমিস্টারে তাজবিদ আছে তাই তার দোহাই দেই। কিন্তু তাতেও তারা অসন্তুষ্ট।

তাই তাদের থেকে দূরে থাকাই উচিত বলে মনে করি। মাঝে মাঝে বাসায় গিয়ে তাদের খেদমত করার চেষ্টা করি, ফোনে প্রতিদিন সুন্দরভাবে কথা বলে তাদের হক আদায়ের চেষ্টা করি। আর বুঝাই পড়াশোনা নিয়ে অনেক ব্যস্ত। নয়তো আমাকে বাসায় যেতে বলবে।

তো এই হলো বাসার পরিস্থিতি। এখন মামা, নানা,নানী, বাবা, মা সবাই বলে চাকরির পড়াশোনা পাশাপাশি চাকরির প্রিপারেশন নিতে বলছেন। চাকরির জন্য পড়াশোনা করতে, কোচিং করতে, চাকরির বিভিন্ন রকমের পরীক্ষা দিতে।
আমাকে তারা মাদ্রাসায় চাকরি করতে দিবে না। অনেক বড় বড় চাকরি করতে হবে। সেখানে ছেলে মেয়ে একসাথে থাকলেও সমস্যা নেই। তারা এটাকে স্বাভাবিকই মনে করে। জীবনে সফল হতে হবে। আত্মীয়স্বজনদের সংঙ্গা দেন আমাকে উনাদের মতো হতে হবে, উনারা আমাদের আইডল। উনি সফল ব্যক্তি। আমি যে সুন্দরভাবে বুঝাবো তারও উপায় নেই। এটা যে হারাম সেটাও বুঝানো যাবে না। বুঝালেও বুঝে না বলে, এতো মানলে কি জীবন চলবে?
আবার বুঝালেই বলবে পড়াশোনা করতে হবে না তাহলে বাসায় এসে বসে থাকো। বিয়ে করতে চাই। সেখানেও সমস্যা। বিয়ে দিবেন, যিনি অনেক বড় চাকরি করেন সরকারি চাকরি হতে হবে, নামাজী এমন। তবে সরকারি চাকরি দ্বীনদার দুটোই হতে হবে।
রবের কাছে দু'আ করি তিনি যেন খুব দ্রুত আমাকে উত্তম মাহরাম মিলিয়ে দেন।

এখন আমি কি করতে পারি? আমাকে চাকরির জন্য পড়াশোনা করতে বলে, চাকরির পরীক্ষা দিতে বলে। মানে ধর্মও মেইনটেইন করতে হবে আবার চাকরিও করতে হবে, নিজের পরিচয় গড়ে তুলতে হবে। অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। সন্তানও মানুষ করতে হবে, সংসারও সামলাতে হবে পাশাপাশি নিজের পরিচয়ের জন্য একটা চাকরি থাকা লাগবে।

আর বাংলাদেশে এমন তো মেয়েদের জন্য চাকরি দেখি না, যেখানে ফ্রি মিক্সিং ছাড়া আছে। সেখানেই যাবো সেখানে নারী পুরুষ উভয় একসাথে চাকরি করে। যা শরীয়াহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। মেয়েদের জন্য এটা জায়েজ হবে না।
এখন আমার করনীয় কি? আমি কি করবো? আমি যে কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। অনুগ্রহ করে আমার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন।

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমি নিম্নোক্ত পরামর্শ প্রদান করছি:

আপনার করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ:

১. দ্বীনি শিক্ষা অব্যাহত রাখা:

আপনি ইতিমধ্যে একটি ন্যাশনাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন এবং আইওএম এর ছাত্রী হিসেবে দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছেন—এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দ্বীনি ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ: ২২৪)

২. পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক:

পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া জায়েয নয়, তবে তাদের এমন কোনো আদেশ মানা জায়েয নয় যা শরীয়তের পরিপন্থী। পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন করা জরুরি, কিন্তু আল্লাহর নাফরমানিতে পিতা-মাতার আনুগত্য নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)

তবে আপনার উচিত পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করা, তাদের খেদমত করা এবং সম্ভব হলে নম্রভাবে দ্বীনের কথা বোঝানোর চেষ্টা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا "আর দুনিয়ায় তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা লোকমান: ১৫)

৩. চাকরির বিষয়ে:

নারীদের জন্য চাকরি করা মূলত জায়েয আছে, তবে শর্ত হলো:

  • ফ্রি-মিক্সিং (পুরুষ-নারীর অবাধ মেলামেশা) থেকে মুক্ত পরিবেশ
  • পর্দার পূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ
  • বৈধ উপার্জন

তবে যদি চাকরির পরিবেশ শরীয়তসম্মত না হয় (যেমন ফ্রি-মিক্সিং থাকে), তাহলে সেই চাকরি করা জায়েয হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)

৪. বাসা থেকে দূরে থাকা:

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, বাসায় থাকলে আপনার ঈমান দুর্বল হয়ে যায় এবং দ্বীনি শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যদি বাসা থেকে দূরে থাকা আপনার দ্বীন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হয় এবং আপনি পিতা-মাতার সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখেন, তবে এটি জায়েয হতে পারে। তবে খেয়াল রাখবেন, এটি যেন পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ না হয়।

৫. বালিকা/নারীদের জন্য দ্বীনি পরিবেশ:

আপনি বর্তমানে যে কলেজে আছেন এবং আইওএম-এর সাথে যুক্ত আছেন—এটি আপনার জন্য উত্তম। দ্বীনি পরিবেশে থাকা ঈমান রক্ষার জন্য সহায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।" (সূরা তাওবা: ১১৯)

৬. বিবাহের বিষয়ে:

আপনি উত্তম মাহরামের জন্য দু'আ করছেন—এটি খুবই ভালো। বিবাহ দ্বীনের অর্ধেক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তখন তাকে বিবাহ দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৪)

আপনার উচিত আল্লাহর কাছে উত্তম স্বামীর জন্য দু'আ করা এবং পিতা-মাতাকে বোঝানোর চেষ্টা করা যে, দ্বীনদার ও চরিত্রবান ব্যক্তিই উত্তম জীবনসঙ্গী।

৭. চাকরির প্রস্তুতি:

আপনি যদি চাকরির প্রস্তুতি নেন, তবে এমন চাকরির সন্ধান করুন যা শরীয়তসম্মত পরিবেশে করা যায়। যেমন:

  • মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা
  • মহিলাদের জন্য আলাদা পরিবেশে কাজ
  • হোম-ভিত্তিক কাজ (যদি বৈধ হয়)
  • মহিলাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত কোনো সংস্থায় কাজ

যদি কোনো চাকরিতে ফ্রি-মিক্সিং বা অন্য কোনো শরীয়তবিরোধী বিষয় থাকে, তাহলে সেই চাকরি করা জায়েয হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)

চূড়ান্ত পরামর্শ:

১. দ্বীনি শিক্ষা অব্যাহত রাখুন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ২. পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করুন এবং তাদের হক আদায় করুন, তবে দ্বীনের সাথে আপোষ করবেন না। ৩. চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে পারেন, তবে শর্ত হলো তা শরীয়তসম্মত পরিবেশে হতে হবে। ৪. বাসা থেকে দূরে থাকা যদি আপনার দ্বীন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় হয় এবং পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক বজায় থাকে, তবে তা জায়েয। ৫. বিবাহের জন্য দু'আ করতে থাকুন এবং উত্তম জীবনসঙ্গীর সন্ধান করুন। ৬. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন—তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)

আল্লাহ তাআলা আপনার দ্বীনি শিক্ষাকে বরকতময় করুন, আপনার ঈমানকে মজবুত করুন এবং আপনাকে উত্তম জীবনসঙ্গী দান করুন। আমীন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.