কতটুকু দুধপানে দুধসম্পর্ক সাব্যস্ত হবে?
Family Life · Hanafi
Question
আমি বুঝে উঠতে পারছি না কোনটা সহিহ্? এবং কোনটা মানা উচিৎ।
২) কোনো মাহাযাবে অল্প পরিমাণে দুধ পানে দুধ সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত হলে,কি মাহযাব গ্রহণ করলে বিয়ে করা যাবে! এটা কেমন ফাতাওয়া,যেখানে দিধায় পড়তে হয়।
৩)মামাতো দুধ বোনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা জায়েজ?
Answer
দুধ সম্পর্ক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
ভূমিকা
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। দুধ সম্পর্ক (রাদা'আহ) ইসলামী ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি হানাফী মাযহাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।
১) কতটুকু দুধপানে দুধসম্পর্ক সাব্যস্ত হবে?
হানাফী মাযহাবের মত:
হানাফী মাযহাবের ইমামগণের মতে, সামান্য পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যায়। তবে শর্ত হলো:
- দুধ পান করতে হবে দুই বছরের (২৪ মাস) মধ্যে (কেউ কেউ ৩০ মাস বলেছেন)
- শিশুটি সরাসরি স্তন থেকে দুধ পান করতে হবে (পাত্রে করে নয়)
- দুধ পানকালে শিশুটি জীবিত থাকতে হবে
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)-এর মতে, অল্প বা বেশি যেকোনো পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
কুরআন ও হাদীসের দলীল:
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ" "আর মাতাগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে, যদি কেউ দুধ পান করানোর মেয়াদ পূর্ণ করতে চায়।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩৩)
হাদীসে এসেছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ" "আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: 'বংশগত সম্পর্কের কারণে যা হারাম হয়, দুধ সম্পর্কের কারণেও তা হারাম হয়।'" (সহীহ বুখারী: ২৬৪৫, সহীহ মুসলিম: ১৪৪৫)
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের মত:
শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাবের মতে, পৃথকভাবে পাঁচবার দুধ পান করতে হবে। তাদের দলীল হলো:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: "كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ: عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ" "আয়েশা (রা.) বলেন: 'কুরআনে প্রথমে দশবার দুধ পান হারাম করার বিধান নাযিল হয়েছিল, পরে তা পাঁচবার দ্বারা মানসুখ (রহিত) করা হয়।'" (সহীহ মুসলিম: ১৪৫২)
সঠিক মত:
বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে হানাফী মাযহাবের দলীল হলো:
১. কুরআনে "রাদা'আহ" (দুধ পান) শব্দটি সাধারণভাবে এসেছে, কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ নেই। ২. হাদীসে "يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ" - এখানে কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। ৩. আয়েশা (রা.)-এর হাদীসটি সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেছেন, এটি "معلول" (দুর্বল) - কারণ এটি আয়েশা (রা.)-এর নিজস্ব মত ছিল, যা অন্যান্য সাহাবীদের মতের বিপরীত।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর মতে, অল্প পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়। তবে ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ)-এর মতে, অন্তত একদিন বা একরাত পরিমাণ দুধ পান করতে হবে।
আমাদের অনুসরণীয় মত: হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, সামান্য পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়ে যায়, তবে শর্ত হলো দুধ পানটি দুই বছরের মধ্যে হতে হবে এবং সরাসরি স্তন থেকে হতে হবে।
২) কোনো মাযহাবে অল্প পরিমাণে দুধ পানে দুধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে, কি মাযহাব গ্রহণ করলে বিয়ে করা যাবে?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী ফিকহের নিয়ম হলো:
তাকলীদের নিয়ম: একজন সাধারণ মুসলিমের জন্য তার নিজ মাযহাব অনুযায়ী আমল করা উচিত। তবে কোনো ব্যক্তি যদি অন্য মাযহাবের দলীল অধিক শক্তিশালী মনে করে, তবে সে সেই মাযহাব অনুযায়ী আমল করতে পারে, তবে একই বিষয়ে সুবিধাজনক মত গ্রহণ করা জায়েয নয় (তালফীক)।
বিয়ের ক্ষেত্রে: যদি কোনো ব্যক্তি হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে এবং হানাফী মতে অল্প দুধ পানেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়, তাহলে সে যদি এমন মেয়ের সাথে বিয়ে করতে চায় যাকে সামান্য দুধ পান করিয়েছে, তবে হানাফী মতে তা জায়েয হবে না। শুধুমাত্র শাফেয়ী মাযহাব গ্রহণ করে বিয়ে করা জায়েয হবে না, কারণ এটি "তালফীক" (সুবিধানুসারে মত গ্রহণ) হবে, যা নাজায়েয।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহঃ) বলেন:
"لا يجوز للعامي أن يقلد من شاء من الأئمة في كل مسألة على حدة، بل يجب عليه اتباع مذهب واحد" "সাধারণ মুসলিমের জন্য প্রতিটি মাসআলায় ইমামগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকলীদ করা জায়েয নয়; বরং তার জন্য একটি মাযহাব অনুসরণ করা আবশ্যক।" (রদ্দুল মুহতার)
সতর্কতা: দুধ সম্পর্কের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো সন্দেহ থাকে যে, দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়েছে কিনা, তবে সতর্কতামূলকভাবে বিয়ে না করাই উত্তম। কারণ দুধ সম্পর্কের কারণে বিয়ে হারাম হওয়ার পরও যদি বিয়ে করা হয়, তবে তা স্থায়ীভাবে হারাম হবে এবং পৃথক করতে হবে।
৩) মামাতো দুধ বোনের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা জায়েজ?
দুধ সম্পর্কের কারণে হারাম হওয়া ব্যক্তিরা:
দুধ সম্পর্কের কারণে যারা হারাম হন, তারা মূলত বংশগত সম্পর্কের কারণে যারা হারাম তাদের মতোই। যেমন:
- দুধ মা
- দুধ বোন
- দুধ খালা
- দুধ ফুফু
- দুধ নানী
- দুধ দাদী
মামাতো দুধ বোন:
মামাতো দুধ বোন বলতে কী বোঝানো হয়েছে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন:
১. যদি উদ্দেশ্য হয়: আপনার মামার স্ত্রী (যিনি আপনার দুধ মা নন) তার অন্য স্বামীর সন্তান - তবে এতে কোনো সম্পর্ক নেই, বিয়ে জায়েয।
২. যদি উদ্দেশ্য হয়: আপনার মামার মেয়ে, যিনি আপনার সাথে দুধ সম্পর্কের কারণে বোন হয়েছেন (অর্থাৎ আপনারা একই মহিলার দুধ পান করেছেন) - তবে তিনি আপনার দুধ বোন হিসেবে গণ্য হবেন এবং তার সাথে বিয়ে হারাম।
৩. যদি উদ্দেশ্য হয়: আপনার মামাতো বোন (মামার মেয়ে) যিনি আপনার দুধ বোন নন - তবে তার সাথে বিয়ে জায়েয, কারণ মামাতো বোনের সাথে বিয়ে ইসলামে জায়েয।
সম্পর্কচ্ছেদের বিধান:
দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হলে, সেই সম্পর্কের কারণে যেসব ব্যক্তি হারাম হন, তাদের সাথে বিয়ে করা হারাম। তবে সম্পর্কচ্ছেদ বলতে কী বোঝানো হয়েছে:
- যদি সম্পর্কচ্ছেদ অর্থ বিয়ে না করা - তবে এটি আবশ্যক, কারণ দুধ বোনের সাথে বিয়ে হারাম।
- যদি সম্পর্কচ্ছেদ অর্থ পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা - তবে এটি জায়েয নয়, কারণ ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ" "তোমরা কি তবে ক্ষমতা পেলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?" (সূরা মুহাম্মদ: ২২)
সঠিক বিধান:
১. দুধ বোনের সাথে বিয়ে হারাম - এটি মেনে চলা আবশ্যক। ২. পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয় - দুধ সম্পর্কের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। ৩. সতর্কতা: দুধ সম্পর্কের বিষয়ে সন্দেহ থাকলে, বিয়ে না করাই উত্তম, তবে পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখা আবশ্যক।
সারসংক্ষেপ:
| বিষয় | হানাফী মত | |-------|-----------| | দুধ পানের পরিমাণ | সামান্য হলেই সম্পর্ক সাব্যস্ত (ইমাম আবু হানীফা) / অন্তত একদিন-একরাত (ইমাম মুহাম্মদ) | | সময়সীমা | দুই বছর (২৪ মাস) | | শর্ত | সরাসরি স্তন থেকে পান করা | | মাযহাব পরিবর্তন | তালফীক জায়েয নয় | | দুধ বোনের সাথে বিয়ে | হারাম | | সম্পর্কচ্ছেদ | জায়েয নয় |
দলীলসমূহ:
কুরআন:
"حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُ اللَّاتِي أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ مِنَ الرَّضَاعَةِ" "তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, কন্যা, বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের কন্যা, বোনের কন্যা, তোমাদের দুধ মাতা, এবং দুধ বোন।" (সূরা আন-নিসা: ২৩)
হাদীস:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: "يَحْرُمُ مِنَ الرَّضَاعَةِ مَا يَحْرُمُ مِنَ النَّسَبِ" "বংশগত সম্পর্কের কারণে যা হারাম হয়, দুধ সম্পর্কের কারণেও তা হারাম হয়।" (সহীহ বুখারী: ২৬৪৫, সহীহ মুসলিম: ১৪৪৫)
ফিকহের কিতাব:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন): ৩/২০৮-২১৬
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৪০-৩৪২
- আল-হিদায়া: ২/৩৮০-৩৮২
- বাহিশতী যেওয়ার: ৮/২৪-২৬
উপসংহার:
১. হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, সামান্য পরিমাণ দুধ পান করলেই দুধ সম্পর্ক সাব্যস্ত হয়।
২. মাযহাব পরিবর্তন করে বিয়ে করা জায়েয নয় - এটি তালফীক হবে, যা নাজায়েয।
৩. দুধ বোনের সাথে বিয়ে হারাম, তবে পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন করা জায়েয নয়।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।