"যা তালাক" বলার বিধান কি? এক্ষেত্রে কয় তালাক পতিত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে আপনার উপর ২ তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে।
সুতরাং এক্ষেত্রে ইদ্দতের মধ্যেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে মৌখিক ভাবে ফিরিয়ে নিলাম বললেই হবে,অথবা তার সাথে স্বামী সুলভ দৈহিক আচরণ করলেও হবে।
আর যদি ইদ্দতকাল অতিবাহিত হওয়ার পর ফিরিয়ে নিতে চায়,সেক্ষেত্রে নতুন করে বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।
বিস্তারিত জানুনঃ-
১. "যা তালাক" বলার বিধান
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, "যা তালাক" (তালাক দিলাম) বলা স্পষ্ট (সরীহ) তালাকের অন্তর্ভুক্ত। আরবি ভাষায় "যা তালাক" অর্থ "তালাক দিলাম" — এটি তালাকের জন্য ব্যবহৃত স্পষ্ট শব্দ। স্পষ্ট শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না; শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক পতিত হয়ে যায়।
ইমাম কাসানী (রহ.) বদাইউস সানাই-এ বলেন: "السَّرِيحُ مَا لَا يَحْتَمِلُ غَيْرَ الطَّلَاقِ" অর্থাৎ, সরীহ (স্পষ্ট) তালাক হলো সেই শব্দ যা তালাক ছাড়া অন্য কোনো অর্থ বহন করে না।
২. দুইবার "যা তালাক" বললে দুই তালাক পতিত হবে
যদি কোনো ব্যক্তি দুইবার "যা তালাক" বলে, তবে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী দুই তালাক পতিত হবে। একই মজলিসে দুইবার বললেও দুই তালাকই গণনা হবে।
ফাতাওয়া হিন্দিয়্যায় (আলমগীরি) আছে: "إِذَا قَالَ لِامْرَأَتِهِ أَنْتِ طَالِقٌ طَالِقٌ طَالِقٌ، وَقَعَ ثَلَاثٌ" অর্থাৎ, যদি কেউ তার স্ত্রীকে বলে "তুমি তালাক, তালাক, তালাক" — তাহলে তিন তালাক পতিত হবে।
৩. রাগের অবস্থায় তালাক
রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তা কার্যকর হয়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "لَا طَلَاقَ وَلَا عَتَاقَ فِي إِغْلَاقٍ" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৯৩)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় হানাফি ফুকাহারা বলেন, "إغلاق" অর্থ হলো এমন রাগ যা বিবেককে নষ্ট করে দেয়, অর্থাৎ ব্যক্তি কী বলছে তা বুঝতে পারে না। কিন্তু সাধারণ রাগ যা মানুষকে বিবেকহীন করে না, তাতে তালাক পতিত হয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, রাগের তীব্রতা যদি এমন হয় যে ব্যক্তি নিজের কথা বুঝতে পারছে না, তবে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু সাধারণ রাগে তালাক দিলে তা পতিত হবে।
৪. আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে উত্তর
আপনি বলেছেন যে আপনার স্বামী বলেছিলেন "যা তালাক" দুইবার, এবং আপনি স্পষ্ট শুনেছেন। তিনি এখন অস্বীকার করছেন এবং বলছেন যে রাগের মাথায় বলেছেন, নিয়ত ছিল না।
এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয়:
১. "যা তালাক" একটি স্পষ্ট (সরীহ) তালাকের শব্দ। স্পষ্ট শব্দে তালাক দিলে নিয়তের প্রয়োজন হয় না।
২. রাগের অবস্থায় তালাক: যদি রাগ এত তীব্র হয় যে তিনি কী বলছেন বুঝতে পারছিলেন না, তবে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু যদি তিনি বুঝে বলেছেন, তবে তালাক পতিত হবে। আপনি বলেছেন "কি বলছে বুঝতে পারেনাই" — এটি যদি সত্য হয় যে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞ অবস্থায় ছিলেন, তবে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু সাধারণত মানুষ রাগে যা বলে তা বুঝেই বলে।
৩. অস্বীকার করা: তালাকের পর স্বামী অস্বীকার করলে তা তালাক বাতিল করে না। স্ত্রী সাক্ষী হিসেবে থাকলে এবং তিনি স্পষ্ট শুনে থাকলে, তালাক কার্যকর হবে।
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- স্বামী দুইবার "যা তালাক" বলেছেন
- আপনি স্পষ্ট শুনেছেন
- তিনি রাগের মাথায় বলেছেন
- তিনি এখন অস্বীকার করছেন
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, দুই তালাকে রজয়ী পতিত হয়েছে। কারণ: ১. "যা তালাক" সরীহ শব্দ, নিয়তের প্রয়োজন নেই ২. রাগ সাধারণ পর্যায়ের হলে তালাক পতিত হয় ৩. পরবর্তী অস্বীকার তালাক বাতিল করে না
তবে, যদি স্বামী সত্যিই এমন তীব্র রাগে ছিলেন যে তিনি কী বলছেন বুঝতে পারছিলেন না (যেমন: উন্মাদনার মতো অবস্থা), তাহলে বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু সাধারণ রাগ তালাক বাতিলের কারণ নয়।
৬. পরামর্শ
যেহেতু দুই তালাক পতিত হয়েছে, সুতরাং এক্ষেত্রে ইদ্দতের মধ্যেই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলে মৌখিক ভাবে ফিরিয়ে নিলাম বললেই হবে,অথবা তার সাথে স্বামী সুলভ দৈহিক আচরণ করলেও হবে।
আর যদি ইদ্দতকাল অতিবাহিত হওয়ার পর ফিরিয়ে নিতে চায়,সেক্ষেত্রে নতুন করে বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।