গুনাহ হয়ে গেছে মনে হলে কী করণীয়?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
আমার বারবার মনে হয় গুনাহ হয়ে গেলো কিনা গুনাহ করে ফেললাম কিনা। যেমন
১।গতকাল রাতে আমি আমার স্বামীকে একটা কথা বলবো বলে বলছিলাম না সে বারবার জিজ্ঞেস করায় আমি বলছিলাম পরে বলবো একপর্যায়ে বলে ফেলি কি বলতে চেয়েছিলাম তা ভুলে গেছি এতে কি আমার মিথ্যা বলার গুনাহ হয়েছে??। এ সন্দেহে আমার খুব ভয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থা হয় আর ছটফট লাগতে থাকে গুনাহ হয়েছে মনে করে।
২।আবার পরীক্ষায় এ প্লাস পাওয়া নিয়ে গল্প করার মধ্যে বলে ফেলি আমার বান্ধবীদের সঙ্গে আমার সীট পড়েনি তাই এ প্লাস পেয়েছি ওদের সঙ্গে সিট পড়লে ওরা জ্বালাতো এতে আমার সময় নষ্ট হতো। এগুলো বলার পর ভয় হচ্ছে গীবতের গুনাহ করে ফেলেছি। আসলেই কি গীবতের গুনাহ হয়েছে??
৩।মোবাইলে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলে কোন পুরুষের ছবির দিকে নজর গেলে মনে হয় গুনাহ হয়েছে তাওবা করতে হবে তাওবাও কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবারও একই কাজ করি ইচ্ছায় অনিচ্ছায় নজর চলে যাওয়া মাত্রই বুকে অস্বস্তি শুরু হয় আতঙ্কিত হই গুনাহ হয়েছে বলে আসলেই কি গুনাহ হয়েছে??
এছাড়াও তাওবা করার সময় মনে হয় আমি কি তাওবা শর্ত গুলো পূরণ করতে পারছি?? আমার তাওবা কি খাঁটি হচ্ছে?? এগুলোর কারণে আর মনোযোগ নষ্ট হওয়ার কারণে বা আল্লাহ সম্পর্কে মনে খারাপ চিন্তা আসলে কি তাওবা বাতিল হয়ে যাবে??
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার মধ্যে যে উদ্বেগ, ভয় এবং বারবার সন্দেহ হচ্ছে, এটি মূলত 'ওয়াসওয়াসা' (Waswasa) বা শয়তানি কুমন্ত্রণার লক্ষণ। ইসলামী আইন ও হানাফি ফিকহের আলোকে এই বিষয়গুলোর বিস্তারিত সমাধান নিচে দেওয়া হলো।
আপনার প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এবং সাথে সাথে এই ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায় তুলে ধরা হলো:
১. স্বামীকে "ভুলে গেছি" বলা প্রসঙ্গে মিথ্যার গুনাহ
আপনি যখন স্বামীকে বলেছিলেন যে, "কী বলতে চেয়েছিলাম তা ভুলে গেছি", অথচ সেটি আপনার মনে ছিল না—এটি মিথ্যা হবে কি না, সে সম্পর্কে ইসলামী নিয়ম হলো:
- মিথ্যার সংজ্ঞা: কোনো বিষয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করে সত্যকে গোপন করাকে মিথ্যা বলে। আপনি যদি সত্যিই সেই মুহূর্তে কথাটি ভুলে গিয়ে থাকেন, তাহলে তা মিথ্যা নয়; বরং এটি একটি ভুল বা বিস্মৃতি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, "আমাদের প্রতিপালক! যদি আমরা ভুলে যাই বা ভুল করি, তবে আমাদেরকে পাকড়াও করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)। হাদিসে এসেছে, উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয়, তা ক্ষমা করা হয়েছে। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৪৫)।
- সিদ্ধান্ত: যেহেতু আপনি সত্যিই কথাটি ভুলে গিয়েছিলেন, তাই এটি মিথ্যা বলার গুনাহ নয়। আপনার ওপর কোনো গুনাহ হবে না। তবে, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করুন।
২. পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বান্ধবীদের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে গীবতের গুনাহ
আপনি বলেছেন যে, "আমার সিট পড়েনি তাই এ প্লাস পেয়েছি, ওদের সাথে সিট পড়লে ওরা জ্বালাতো, এতে আমার সময় নষ্ট হতো"—এই কথাগুলো বলার পর আপনার মনে গীবতের ভয় হচ্ছে।
- গীবতের সংজ্ঞা: কোনো মুসলমানের অনুপস্থিতিতে এমন বিষয় আলোচনা করা, যা শুনলে সে অপছন্দ করবে, তাকে গীবত বলে। (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)।
- বিশ্লেষণ: আপনি এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির দোষ বা ত্রুটি বর্ণনা করেননি। আপনি শুধু একটি সাধারণ পরিস্থিতি (সিট না পড়া) এবং তার ফলাফল (সময় বাঁচানো) সম্পর্কে বলেছেন। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চরিত্র বা সম্মানহানির জন্য বলা হয়নি। বরং এটি আপনার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা। তাই এটি গীবতের আওতায় পড়বে না। তবে, যদি আপনার কথার মাধ্যমে কারো মনে কষ্ট দেওয়ার আশয় থাকে, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, এটি গীবত নয়, ইনশাআল্লাহ।
৩. মোবাইলে পুরুষের ছবির দিকে নজর পড়া প্রসঙ্গে গুনাহ
- অনিচ্ছাকৃত নজর: ইসলামী নিয়ম হলো, প্রথম নজর (অনিচ্ছাকৃত) ক্ষমার যোগ্য, কিন্তু দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো গুনাহ। হাদিসে আছে, হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হে আলী! প্রথম নজরের পর আর দ্বিতীয় নজর নিও না। কেননা প্রথম নজর তোমার জন্য, কিন্তু দ্বিতীয় নজর তোমার জন্য নয় (অর্থাৎ গুনাহ)।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৯, তিরমিজি: ২৭৭৭)।
- আপনার অবস্থা: আপনি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো ছবির দিকে তাকিয়ে পড়েন এবং সাথে সাথে মনে করেন এটি গুনাহ হয়ে গেছে, তখন এটি আপনার ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য ছাড়াই হয়েছে। এটি গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে না। তবে, আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার তাকান, তাহলে সেটি গুনাহ হবে এবং এর জন্য তাওবা করতে হবে। যেহেতু আপনি বলছেন "ইচ্ছায় অনিচ্ছায় নজর চলে যায়", তাই অনিচ্ছাকৃত অংশটি ক্ষমার যোগ্য। শুধু ইচ্ছাকৃত অংশের জন্য সতর্ক থাকুন এবং চোখ নিচু করে রাখার চেষ্টা করুন।
তাওবার শর্ত ও ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়
আপনি তাওবার সময় মনে করেন যে, "তাওবার শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না" এবং "তাওবা খাঁটি হচ্ছে কি না"—এটি একটি সাধারণ ওয়াসওয়াসা। ইসলামী বিধান অনুযায়ী:
১. তাওবার শর্ত: তাওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে: * গুনাহ থেকে বিরত থাকা। * কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। * দৃঢ় সংকল্প করা যে, ভবিষ্যতে এই গুনাহে ফিরে যাব না। (যদি গুনাহটি আল্লাহর হকের সাথে সম্পর্কিত হয়)। * আর যদি গুনাহটি বান্দার হকের সাথে সম্পর্কিত হয়, তবে তার থেকে ক্ষমা চাওয়া বা হক আদায় করা। * আপনি যদি এই শর্তগুলো মানসিকভাবে পূরণ করার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনার তাওবা খাঁটি এবং কবুলযোগ্য। শয়তান আপনাকে বারবার সন্দেহে ফেলার চেষ্টা করে যে, "তোমার তাওবা কবুল হচ্ছে না", যাতে আপনি হতাশ হয়ে পড়েন এবং তাওবা করা ছেড়ে দেন।
- ওয়াসওয়াসার চিকিৎসা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "তোমরা সন্দেহ ত্যাগ করো এবং নিশ্চিত বিষয় গ্রহণ করো।" (সুনানে নাসায়ী: ৫৭১৫)। ওয়াসওয়াসার মূল চিকিৎসা হলো:
- আওরাদ ও দোয়া: সকাল-সন্ধ্যায় 'আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' পড়া এবং দরূদ শরীফ বেশি পড়া।
- মনোযোগ অন্যদিকে সরানো: যখনই এই সন্দেহ বা খারাপ চিন্তা আসবে, তখনই "আল্লাহু আকবার" বলে জোরে বা মনে মনে বলুন এবং অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দিন।
- আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ চিন্তা: আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি বলেন, "বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আয-যুমার: ৫৩)। শয়তান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করার জন্যই এই খারাপ চিন্তা আপনার মনে আনে। এই চিন্তা আপনার তাওবা বাতিল করবে না, বরং এগুলো শয়তানের প্ররোচনা মাত্র। আপনি এগুলোকে গুরুত্ব দেবেন না।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া ও পরামর্শ
- ১ নং প্রশ্নের উত্তর: আপনার "ভুলে গেছি" বলা মিথ্যা নয়, কারণ আপনি সত্যিই ভুলে গিয়েছিলেন। কোনো গুনাহ হয়নি।
- ২ নং প্রশ্নের উত্তর: আপনার বর্ণনাটি গীবত নয়, কারণ এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির দোষ বর্ণনা ছিল না। কোনো গুনাহ হয়নি।
- ৩ নং প্রশ্নের উত্তর: অনিচ্ছাকৃত নজর পড়া গুনাহ নয়। ইচ্ছাকৃত তাকানো থেকে বিরত থাকুন। আপনার আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
- তাওবা প্রসঙ্গে: আপনার তাওবা খাঁটি হচ্ছে। শয়তান আপনাকে ওয়াসওয়াসায় ফেলছে। এই সন্দেহগুলোকে জ্ঞান করে কান দেবেন না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত এবং দরূদ শরীফ পাঠে মনোযোগী হোন।
আল্লাহ তাআলা আপনার এই ওয়াসওয়াসা দূর করে দিন এবং আপনার তাওবা কবুল করুন। (আমিন)