কসম না মানতে পারলে করণীয় কি?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর: আল্লাহর কসম ভঙ্গ করলে করণীয়
আল্লাহর নামে কসম (শপথ) করে কোনো কাজ না করার প্রতিজ্ঞা করা, কিন্তু পরে তা পালন করতে না পারা শরিয়তে কসম ভঙ্গ (حنث في اليمين) হিসেবে গণ্য হয়। এর জন্য কাফফারা (كفارة اليمين) আদায় করা wajib (ওয়াজিব) হয়। নিচে বিশদ বিবরণ দেওয়া হলো।
কাফফারার বিধান (কুরআন ও হাদিসের আলোকে)
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَٰكِنْ يُؤَاخِذُكُمْ بِمَا عَقَّدْتُمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদের তোমাদের পক্ষ থেকে গৃহীত শপথের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না, কিন্তু পাকড়াও করেন সেই শপথের জন্য যা তোমরা দৃঢ়ভাবে করেছ। তার কাফফারা হলো: দশজন মিসকিনকে মধ্যমমানের খাদ্য খাওয়ানো যা তোমরা নিজেদের পরিবারকে খাওয়াও, অথবা তাদেরকে বস্ত্র দান করা, অথবা একজন দাস মুক্তি দেওয়া। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটাই তোমাদের শপথের কাফফারা যখন তোমরা শপথ কর। আর তোমরা তোমাদের শপথ রক্ষা করো। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর বিধানসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৮৯)
হানাফি মাযহাবের বিস্তারিত ফতোয়া
হানাফি ফিকহের প্রধান কিতাবসমূহে কসম ভঙ্গের কাফফারা সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিধান উল্লেখ করা হয়েছে:
-
কাফফারার বিকল্পসমূহ: কাফফারা আদায়ের তিনটি বিকল্প রয়েছে—তার যে কোনো একটি পালন করতে হবে। ক্রমানুসারে বাধ্যবাধকতা নেই (তবে সামর্থ্য থাকলে দাস মুক্তি বা খাদ্য/বস্ত্র দান উত্তম)।
- একজন দাস মুক্তি দেওয়া (আজকাল প্রযোজ্য নয়)।
- দশজন মিসকিনকে দুই বেলা মধ্যম মানের পেট ভরে খাবার খাওয়ানো (প্রত্যেককে) অথবা তাদেরকে খাদ্যশস্য মূল্য হিসেবে সাড়ে তিন সের (প্রায় ৩.৬ কেজি) গম বা সমতুল্য প্রদান করা।
- দশজন মিসকিনকে কাপড় দান করা (প্রত্যেককে এক জোড়া পোশাক, যেমন লুঙ্গি/পায়জামা ও গেঞ্জি/শার্ট, বা চাদর)।
- যদি এই তিনটির কোনোটি করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে টানা তিন দিন রোযা রাখতে হবে।
-
একাধিক কসম ভঙ্গ: যদি একই কসম বারবার ভাঙা হয়, অথবা ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে একাধিক কসম ভাঙা হয়, তাহলে প্রতিটি ভাঙার জন্য পৃথক কাফফারা আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৭২; ফতোয়া আলমগীরী, ২/৫০)
-
কসম ভঙ্গের সময়: যে মুহূর্তে কাজটি করা হলো বা কাজটি না করে রাখা হলো (যে কাজের কসম করা হয়েছিল), সেই মুহূর্তেই কসম ভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হবে। কাফফারা ফরজ হওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভাঙা শর্ত নয়; বরং কসমের পর কাজটি করা মাত্রই কসম ভঙ্গ হয়। তবে ভুলে বা জোরপূর্বক করলে কসম ভাঙবে না। (আল-হিদায়া, ২/৪০৮; ইমদাদুল ফতোয়া, ২/২৯৭)
গুরুত্বপূর্ণ টিকা
- কসম ভঙ্গের নিয়ত: যদি মনে মনে কসম করেন বা ভাষায় উচ্চারণ না করেন, তবে কসম হবে না। উচ্চারণ করলেই শুধু কসম গণ্য হয়। (ফতোয়া উসমানী, ২/৩১১)
- ওয়াজিব ত্যাগের কসম: যদি কসম করে কোনো ওয়াজিব কাজ (যেমন সালাত) না করা বা হারাম কাজ (যেমন মিথ্যা বলা) করার প্রতিজ্ঞা করেন, তাহলে সেই কসম ভেঙে ওয়াজিব পালন করা বা হারাম ত্যাগ করা জরুরি এবং কাফফারা দিতে হবে। (বাহেশতী জেওর, ৬/১৬)
- মন থেকে অনুতপ্ত হওয়া: কাফফারা আদায়ের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করা উত্তম, কারণ শপথ রক্ষা না করা একটি গুনাহ।
সারসংক্ষেপ
আপনি যদি আল্লাহর নামে কসম করে কোনো কাজ না করার প্রতিজ্ঞা করে থাকেন, কিন্তু পরে তা পালন করতে না পারেন, তবে আপনার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। এখন আপনি নিচের যেকোনো একটি পদ্ধতি অবলম্বন করুন (পূর্ণ সামর্থ্য অনুযায়ী):
- দশজন দরিদ্রকে দুই বেলা আহার করান, অথবা প্রত্যেককে সাড়ে তিন সের (প্রায় ৩.৬ কেজি) গম দান করুন।
- দশজন দরিদ্রকে পোশাক (প্রত্যেককে একটি করে জোড়া কাপড়) দান করুন।
- যদি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে টানা তিন দিন রোযা রাখুন।
উল্লেখ্য: দাস মুক্তির বিকল্প বর্তমানে অপ্রচলিত। তাই খাওয়ানো বা বস্ত্র দান গ্রহণযোগ্য।
মাসআলা: আপনি যদি কসমের কাজটি আবারও ভেঙে ফেলেন (অর্থাৎ পূর্বের কাজটি আবার করেন), তাহলে আবারও কাফফারা দিতে হবে।
সূত্র ও রেফারেন্স
- কুরআন মাজিদ: সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৮৯
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/৭২-৭৪ (কাফফারার বিবরণ)
- ফতোয়া আলমগীরী (ফতোয়া হিন্দিয়া): ২/৫০, ৫৫ (কসম ভঙ্গের বিধান)
- আল-হিদায়া (মারগিনানী): ২/৪০৮ (কসম ভঙ্গের শর্ত)
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভী): ২/২৯৭ (বিস্তারিত)
- ফতোয়া উসমানী (মুফতি তাকি উসমানী): ২/৩১১ (কসমের শর্ত)
- বাহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): ৬/১৬ (ওয়াজিব ত্যাগের কসম)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী): ২/৬২৫ (সূরার তাফসির)
- শারহু মাআনি আল-আসার (তাহাবী): ২/৩৭৯-৩৮২
- উসুলুশ শাশী: কসমের আলোচনা