নারী দন্ত চিকিৎসকের জন্য পুরুষ রোগী দেখা কি পর্দার অন্তরায় হবে?

Business and Job · Hanafi

Question No: 469
Questioner: T
Question Asked: 21 May 2026, 09:34 AM
Reviewed & Published: 21 May 2026, 12:26 PM
Views: 27
Tokens: 4,472
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.একজন মেয়ে ডেন্টিস্ট;যিনি পরিপূর্ণ পর্দা করেন। ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে যদি কোনো পুরুষের দাঁত উঠায় বা চিকিৎসা করে,তবে কি হারাম হবে?
২.অনেকে বলে মুখ খুলে রাখা জায়েজ। এটা কি জায়েজ?
পর্দা বিষয়ক রেফারেন্স দিলে মুনাসিব হতো;যাতে কেউ জিজ্ঞাসা করলে তাকে সঠিক বিষয়টা জানাতে পারি।

Answer

উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আল-হামদুলিল্লাহি ওয়াকাফা ওয়াসালামু আলা রাসূলিহি আল মুস্তাফা।

প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর দেওয়ার আগে মৌলিক নীতি স্পষ্ট করা জরুরি যে, ইসলামে পুরুষ ও নারীর মধ্যে পর্দা কেবল পোশাকের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দৃষ্টি, কথাবার্তা, একাকীত্ব (খলওত) ও স্পর্শের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে প্রতিটি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর ও পর্দা বিষয়ক রেফারেন্স দেওয়া হলো।


প্রশ্ন ১: পূর্ণ পর্দাকারী মহিলা ডেন্টিস্টের জন্য যন্ত্রের মাধ্যমে পুরুষ রোগীর দাঁত তোলা/চিকিৎসা করা কি হারাম?

উত্তর:
হ্যাঁ, এটি সাধারণ অবস্থায় হারাম এবং নাজায়েয। তবে চরম প্রয়োজনে (যেমন- পুরুষ রোগীর তীব্র ব্যথা বা জীবননাশের আশঙ্কা) এবং নির্দিষ্ট শর্ত পালন সাপেক্ষে জায়েয হতে পারে।

কারণ:
১. পুরুষের সাথে একাকীত্ব (খালওয়াহ):
ডেন্টাল চেম্বারে রোগী ও ডাক্তার একা থাকলে এটি ‘খালওয়াহ’ (একাকীত্ব) গণ্য হবে। হাদীসে এসেছে:

“কোনো পুরুষ কোনো মহিলার সাথে একাকী মিলিত হবে না, যতক্ষণ না তার সাথে কোনো মাহরাম উপস্থিত থাকে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৩৩)
হানাফী ফিকহে খালওয়াহ নাজায়েয এবং তা গুনাহের কারণ। (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৫৫)

২. স্পর্শ ও দৃষ্টির পর্দা:
এমনকি যন্ত্রের মাধ্যমে চিকিৎসা করলেও হাতের স্পর্শ ও নিকটবর্তী হওয়া অনিবার্য। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেছেন:

“পুরুষের জন্য গায়রে মাহরাম নারীর দিকে (শাহওয়াত ছাড়া) তাকানো জায়েয নয়, চিকিৎসার প্রয়োজনেও নয়, যতক্ষণ না তার কোনো অঙ্গ দেখা ফিতনার কারণ হয়।” (শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তাহাবী)
তবে সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজনে দৃষ্টি ও স্পর্শের অনুমতি আছে, কিন্তু তা কেবল সীমিত পরিমাণে এবং নারী চিকিৎসক না থাকলে। এখানে প্রশ্নে বলা হয়েছে “মেয়ে ডেন্টিস্ট” নিজেই পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করছেন, সুতরাং তিনি তো আছেনই, বরং উল্টো উনার জন্যই পুরুষ রোগী নাজায়েয।

৩. প্রয়োজনের মাত্রা:
দাঁত তোলা সাধারণত জীবননাশের কারণ নয়, সহনীয় ব্যথায় কমপক্ষে পুরুষ ডেন্টিস্ট খুঁজে বের করার সুযোগ থাকে। ফতোয়ায় এসেছে:

“গায়রে মাহরাম নারীর দ্বারা চিকিৎসা তখনই জায়েয, যখন কোনো নারী চিকিৎসক না থাকে এবং রোগ গুরুতর হয়।” (ফতোয়া হিন্দিয়া, ৫/৩২৪; ফতোয়া উসমানী, ২/১৯২)

শর্তসাপেক্ষে জায়েযের ক্ষেত্র:

  • রোগীর জীবননাশের আশঙ্কা বা তীব্র ব্যথায় পুরুষ ডেন্টিস্টের অনুপস্থিতি।
  • চেম্বারে রোগীর মাহরাম মহিলা উপস্থিত থাকা (বাবা, ভাই, স্বামী ইত্যাদি)।
  • ডেন্টিস্ট নিজে পূর্ণ পর্দা করবেন, চোখ-মুখ ঢেকে রাখবেন, প্রয়োজনমাফিক শুধু হাত পর্যন্ত খোলা রাখবেন।
  • যন্ত্রের মাধ্যমেই কাজ করবেন, সরাসরি হাতের স্পর্শ এড়িয়ে চলবেন।

সারমর্ম: পূর্ণ পর্দাকারী মহিলা ডেন্টিস্টের জন্য সাধারণ অবস্থায় পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করা হারাম। এটা এড়িয়ে চলা ওয়াজিব। যদি কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা শুধুমাত্র চরম প্রয়োজনে এবং উপরোক্ত শর্ত পালন সাপেক্ষে।


প্রশ্ন ২: অনেকে বলে ‘মুখ খুলে রাখা জায়েয’, এটা কি ঠিক?

উত্তর:
এ কথা সঠিক নয়। বরং গায়রে মাহরাম পুরুষ ডেন্টিস্টের সামনে মুখ খোলা এবং দাঁত দেখানোও নাজায়েয এবং পর্দার লঙ্ঘন, যদি না তা চিকিৎসার প্রয়োজনে এবং অত্যাবশ্যকীয় অবস্থায় হয়।

কারণ:
১. মুখ ও চেহারা পর্দার আওতায়:
হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, ফিতনার ভয় থাকলে মহিলার চেহারাও গায়রে মাহরাম পুরুষ থেকে ঢেকে রাখা ওয়াজিব। ইমাম শামী (রহ.) লিখেছেন:

“বর্তমান যুগে নারীদের চেহারা ও হাতও সতরের অন্তর্ভুক্ত, কারণ ফিতনা সাধারণ হয়ে গেছে।” (রদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
তাছাড়া ডেন্টিস্টের সামনে মুখ খোলার অর্থ হলো দাঁত, মাড়ি, জিহ্বা ইত্যাদি দেখা, যা চেহারার অংশ এবং সাধারণত পর্দার আড়ালে রাখা হয়।

২. প্রয়োজন ছাড়া অনুমতি নেই:
কুরআনে নির্দেশ:

“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য (যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা) ছাড়া গোপন না করে।” (সূরা নূর: ৩১)
ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “প্রকাশ পায়” বলতে শুধু চেহারা ও হাতকে বোঝানো হয়েছে, কিন্তু তাও কেবল মাহরাম ও স্বামীর জন্য; অমাহরামের জন্য তা নাজায়েয। (মাআরিফুল কুরআন, ৬/৪১৩)

৩. দৃষ্টির পর্দা ও স্পর্শ:
ডেন্টিস্টের দৃষ্টি সরাসরি রোগীর মুখের ভেতরে পড়বে, যা দৃষ্টির পর্দা ভঙ্গ করে। তাছাড়া যন্ত্র ব্যবহার করলেও মুখ খোলা অবস্থায় থাকা ও কথাবার্তা বলা ফিতনার কারণ হতে পারে।

প্রয়োজনে অনুমতি:
যদি কোনো নারী ডেন্টিস্ট না থাকে, রোগীর দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা বা সংক্রমণ থাকে এবং পুরুষ ডেন্টিস্ট ছাড়া উপায় না থাকে, তবে শুধুমাত্র প্রয়োজনমাফিক মুখ খোলা জায়েয হতে পারে। শর্তাবলী:

  • মুখের বাইরের অংশ (গাল, ঠোঁট) না দেখিয়ে কেবল দাঁত পর্যন্ত সীমিত রাখা।
  • মাহরাম পুরুষ বা মহিলা উপস্থিত থাকা।
  • ডেন্টিস্টের দৃষ্টি যেন ফিতনার দিকে না যায় (অর্থাৎ শুধু দাঁত দেখবেন, সৌন্দর্যের দিকে নয়)।

সারমর্ম: সাধারণ অবস্থায় অমাহরাম পুরুষ ডেন্টিস্টের সামনে মুখ খোলা হারাম ও গুনাহ। এটি ‘জায়েয’ বলে প্রচার করা ভুল এবং বিভ্রান্তিকর।


পর্দা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স:

(ক) কুরআন থেকে:

  1. সূরা নূর (২৪:৩১):
    “তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে… এবং তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া…”

    • সাধারণত প্রকাশ পায় বলতে চেহারা ও হাত বুঝিয়েছেন অধিকাংশ মুফাসসির, কিন্তু ফিতনার যুগে তা-ও ঢেকে রাখা উচিত বলে ইমাম আবু হানীফা ও পরবর্তী হানাফী ফুকাহারা বলেছেন। (মাআরিফুল কুরআন, ৬/৪১৪)
  2. সূরা আহযাব (৩৩:৫৯):
    “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের ও কন্যাদের এবং মুমিনদের নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের কষ্ট দেওয়া হবে না।”

    • চাদর টেনে দেয়ার অর্থ হলো চেহারাও ঢেকে ফেলা। তাফসীরে কুরতুবীতে এসেছে, এই আয়াত প্রমাণ করে নারীদের চেহারা ঢেকে চলা উচিত।
  3. সূরা নূর (২৪:৩০):
    “মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে।”

    • এটি দৃষ্টি পর্দার নির্দেশ, যা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

(খ) হাদীস থেকে:

  1. “নারী সম্পূর্ণরূপে সতর (ঢাকার যোগ্য)।” (তিরমিযী, হাদীস: ১১৭৩)
  2. “তোমাদের কেউ যেন কোনো অমাহরাম নারীর সাথে একাকী অবস্থান না করে, যতক্ষণ না তার সাথে মাহরাম উপস্থিত থাকে।” (বুখারী, হাদীস: ৩২৩৩)

(গ) হানাফী ফিকহের কিতাব:

  1. রদ্দুল মুহতার (১/৪০৬):
    ইমাম শামী (রহ.) ফিতনার যুগে চেহারা ও হাতও সতরের অন্তর্ভুক্ত বলে ফতোয়া দিয়েছেন।
  2. ফতোয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৪):
    “নারীর পক্ষে পুরুষের চিকিৎসা করা জায়েয নয়, তবে যদি কোনো নারী চিকিৎসক না থাকে এবং রোগ সাংঘাতিক হয়, তাহলে শর্তসাপেক্ষে জায়েয হবে।”
  3. ফতোয়া উসমানী (২/১৯২):
    “মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী দেখাও নাজায়েয, কারণ এতে খলওত ও স্পর্শ হয়।”
  4. বেহেশতী জেওর (পর্দা অধ্যায়):
    হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) স্পষ্ট বলেছেন, “চেহারা ও হাত অমাহরামের সামনে খোলা রাখা দুরুস্ত নয়।”
  5. শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবী):
    ইমাম আবু হানীফার মত উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “প্রয়োজন ছাড়া অমাহরাম নারীর দিকে তাকানো জায়েয নয়।”

শেষ কথা:

প্রথম প্রশ্নের উত্তর: পুরুষ রোগীর জন্য পূর্ণ পর্দাকারী মহিলা ডেন্টিস্ট দ্বারা চিকিৎসা নেওয়া নাজায়েয – মহিলা ডেন্টিস্টের জন্যও তা নাজায়েয, ব্যতীত জরুরী অবস্থায় শর্তসাপেক্ষে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: মুখ খুলে রাখা জায়েয নয় – বরং অমাহরাম পুরুষের সামনে তা পর্দা ভঙ্গের কারণ।

মহিলা ডেন্টিস্টদের উচিত পুরুষ রোগী গ্রহণ না করা এবং পুরুষ ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন না হওয়া। যদি কোনো পুরুষ রোগী পড়েই যায়, তবে মহিলা ডেন্টিস্ট উক্ত রোগীকে উপদেশ দেবেন যেন তিনি পুরুষ ডেন্টিস্টের কাছে যান। আল্লাহ তাআলা সবাইকে পর্দা পালনের তাওফীক দিন।

والله أعلم بالصواب
এবং আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.