ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে কী করা উচিত?
Family Life · Hanafi
Question
দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি, এবং এ বিষয়ে আপনাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি।
আমি মোটামুটি জেনারেল পরিবারের মেয়ে। আল্লহর অনুগ্রহে দ্বীনের বুঝ পেয়েছি। প্রায় ১.৫ বছর আগে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হই।
সেখানে গিয়ে আমি বিভিন্ন চ্যালেন্জের মুখোমুখি হই। প্রথমত সহ-শিক্ষার পরিবেশ, দ্বিতীয়ত দীর্ঘ জার্নিতে অসুস্থ হয়ে পড়া। এছাড়াও এই পড়াশোনা করে আমি কি করবো যেহেতু আমার চাকুরি করার কোন মানসিকতা নেই। একারনে আমি ভার্সিটিতে যাওয়া বন্ধ করে দেই। পরবর্তীতে পারিবারিক দিক বিবেচনা করে আমি ৭ কলেজের অন্তর্ভুক্ত একটি মহিলা কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। এর ধারাবাহিকতায় আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাতিল করতে যাই। কিন্তু সেখানে ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান এবং ডিন স্যার আমাকে অনেক বুঝিয়েছেন এবং হলে উঠার সুযোগ করে দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলছেন। এদিকে আমার পরিবারও আন্তরিকভাবে চাচ্ছে না যে আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়ে সাধারন একটি কলেজে ভর্তি হই। এছাড়াও এ কাজ করলে আমাকে চারিদিকের অনেক কটু কথা বা সমালোচনাও সহ্য করতে হবে।
অন্যদিকে আমি দ্বীনের জন্য এ ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছি। আমি একটি অনলাইনে কওমি মাদ্রাসায় নাহবেমীর পর্যন্ত পড়েছি এবং বেফাক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে বোর্ড স্টেন্ড করেছি। মাদ্রাসার পড়াশোনা শেষ করা আমার স্বপ্ন। কিন্তু দীর্ঘসময় বাসায় অবস্থানের কারণে আমার মানসিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং পারিবারিক বিভিন্ন দায়িত্বের (আমার বাবা ২০২৪ সালে মারা যান তারপর থেকে পরিবারে বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয় )কারণে আমি এই পড়াশোনাটাও এগিয়ে নিতে পারছি না।
সকল দিক বিবেচনায় আমার এখন কি সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত আমি একেবারেই বুঝতে পারছি না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এর হলে থেকে পড়াশোনা করলে হয়তো মাদ্রাসার পড়াশোনাটা ধীরগতিতে হলেও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে যদি মহিলা কলেজে ভর্তি হই সেক্ষেত্রে সশরীরে কোন কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালানোর ইচ্ছা আছে। উভয় ক্ষেত্রেই কতটুকু সফল হবো আল্লাহ তায়ালায়ই ভালো জানেন।
অন্যদিকে পরিবার আমার বিয়ের জন্যও চেষ্টা করছে।
এহেন পরিস্থিতিতে আমার কি করা উচিত? পরিবারের অমতে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিবো নাকি নিজের সিদ্ধান্তকে প্রাধান্য দিবো?
আমি ইস্তেখারাও করেছি কিন্তু চারিদিকের টাপোড়নে মনস্থির করতে পারছিনা।
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রিয় বোন, আপনার জটিল পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছি। দ্বীনের প্রতি আপনার আগ্রহ ও ত্যাগের মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
মূলনীতি
ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব হলে কী করা উচিত, এ বিষয়ে কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে কয়েকটি মূলনীতি উল্লেখ করছি:
১. দ্বীনি ইলম অর্জনের গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের পথে চলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, দ্বীনি ইলম অর্জন ফরযে কিফায়া, তবে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য নিজের দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করা জরুরি।
২. সহ-শিক্ষার পরিবেশ
হানাফি ফিকহের আলোকে, ইসলামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও সহ-শিক্ষা নিষিদ্ধ। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ
"আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং জাহেলিয়াতের যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করবে না।" (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)
রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, ২৬৩ পৃষ্ঠা)-এ উল্লেখ আছে যে, নারীর জন্য এমন শিক্ষা অর্জন করা জায়েয যা তার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনীয়, তবে এমন পরিবেশে নয় যেখানে ফিতনার আশঙ্কা থাকে।
৩. পিতামাতার আনুগত্য
পিতামাতার আনুগত্য ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ, তবে দ্বীনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট হারাম বা গুনাহের কাজে পিতামাতার আনুগত্য করা যাবে না। রদ্দুল মুহতার (৯ম খণ্ড, ৫৭৮ পৃষ্ঠা)-এ উল্লেখ আছে:
"পিতামাতার আনুগত্য ওয়াজিব, তবে এমন বিষয়ে নয় যা আল্লাহর নাফরমানি।"
আপনার পরিস্থিতির বিশ্লেষণ
আপনার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি:
ক. জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা:
- সহ-শিক্ষার পরিবেশ রয়েছে, যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাযুক্ত
- তবে ডিন ও চেয়ারম্যান হলে থাকার সুযোগ দিচ্ছেন, যা কিছুটা নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে
- মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করে চাকরি করার মানসিকতা আপনার নেই
খ. মহিলা কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি:
- এটি মহিলা কলেজ, তাই সহ-শিক্ষার সমস্যা নেই
- ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ দ্বীনি জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত
- এখানে পড়লে সশরীরে কওমি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পাবেন
গ. কওমি মাদ্রাসার পড়াশোনা:
- এটি আপনার স্বপ্ন এবং দ্বীনি ইলম অর্জনের মাধ্যম
- অনলাইনে পড়াশোনা করছেন, তবে সশরীরে পড়ার ইচ্ছা আছে
আমার পরামর্শ
প্রিয় বোন, আপনার পরিস্থিতিতে আমি নিম্নোক্ত পরামর্শ দেব:
১. মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়াই উত্তম
আপনার ক্ষেত্রে মহিলা কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হওয়াই অধিকতর উপযুক্ত মনে হচ্ছে। কারণ:
- এটি সহ-শিক্ষার পরিবেশ থেকে মুক্ত
- ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ দ্বীনি জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত
- এখানে পড়ার পাশাপাশি সশরীরে কওমি মাদ্রাসায় পড়ার সুযোগ পাবেন
- আপনার চাকরির মানসিকতা না থাকায় মার্কেটিং ডিগ্রির প্রয়োজনীয়তা নেই
২. পরিবারের সাথে আলোচনা করুন
পরিবারের অমতকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুন, তবে দ্বীনের বিষয়ে আপোষ করবেন না। ফাতাওয়া উসমানী (২য় খণ্ড, ৪৫৬ পৃষ্ঠা)-তে উল্লেখ আছে:
"সন্তানের জন্য পিতামাতার আনুগত্য করা ওয়াজিব, কিন্তু যদি পিতামাতা এমন কাজের আদেশ করেন যা শরীয়তের পরিপন্থী, তাহলে সেক্ষেত্রে আনুগত্য করা জায়েয নয়। তবে তাদের সাথে নম্রভাবে কথা বলা এবং বিষয়টি বুঝিয়ে বলা উচিত।"
আপনি পরিবারকে বুঝিয়ে বলুন যে:
- সহ-শিক্ষার পরিবেশ আপনার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর
- ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ আপনার দ্বীনি জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক
- মহিলা কলেজে পড়লেও ভালো ফলাফল করা সম্ভব
৩. ইস্তেখারার পর সিদ্ধান্ত নিন
আপনি ইস্তেখারা করেছেন, কিন্তু মনস্থির করতে পারছেন না। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) বলেছেন, ইস্তেখারার পর যে বিষয়ে অন্তর প্রশান্তি অনুভব করে, সেটিই উত্তম। তবে অন্তর সম্পূর্ণ প্রশান্ত না হলে, শরীয়তের মূলনীতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
৪. বিয়ের বিষয়ে
পরিবার আপনার বিয়ের চেষ্টা করছে। বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি দ্বীনদার ও উপযুক্ত পাত্রের সাথে বিয়ে করলে তা আপনার দ্বীনি শিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে বিয়ের পরও আপনি মাদ্রাসার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন যদি স্বামী সহযোগিতা করেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আমার মতে, আপনার জন্য উত্তম সিদ্ধান্ত হবে:
- মহিলা কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তি হওয়া - এটি সহ-শিক্ষার পরিবেশ থেকে মুক্ত এবং দ্বীনি জ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত
- সশরীরে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া - এটি আপনার স্বপ্ন পূরণের উপায়
- পরিবারের সাথে নম্রভাবে আলোচনা করে তাদের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা করা - তবে দ্বীনের বিষয়ে আপোষ না করা।
তাদের সিদ্ধান্ত মাফিক বিবাহের জন্য রাজী হওয়ারও পরামর্শ থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
"যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা আত-তালাক: ২-৩)
আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিন, আমিন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।