"দিনের প্রথম ভাগের ইবাদত সারাদিনের জন্য যথেষ্ট" সম্বলিত হাদীস দ্বারা কোন নামায উদ্দেশ্য?
Faith and Belief · Hanafi
Question
হাদিসে কুদসিতে আছে, "হে আদম সন্তান! তুমি আমাকে দিনের প্রথমভাগে (দুহারের নামাজ পড়ে) আমার ইবাদতের জন্য খালি করো, আমি তোমার পরবর্তী কাজগুলোতে (দিনের বাকি অংশে) তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব (বারাকাহ দেব)।" (তিরমিজি: ৪৭৫)।
এই হাদিসের ব্যখ্যা জানতে চাচ্ছি।
আর এই হাদিস দ্বারা ইশরাকের নামাজ এর কথা বলা হয়েছে নাকি সালাতুল দুহার?
ইশরাক তো পড়া উত্তম সূর্যোদয়ের পরে আর সালাতুল দোহার নামাজ তো পড়া উত্তম সকাল ৯ টা থেকে দশটার মধ্যে।এখন এই হাদিসে কোন নামাজের কথা বলা হয়েছে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। নিচে বিস্তারিতভাবে উত্তর দেওয়া হলো।
হাদিসের ব্যাখ্যা
আপনি যে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, তা ইমাম তিরমিজি (রহঃ) তাঁর 'সুনান' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি হলো:
"হে আদম সন্তান! তুমি দিনের প্রথমভাগে আমার জন্য খালি হও (অর্থাৎ আমার ইবাদতে মনোনিবেশ কর), আমি তোমার দিনের বাকি অংশে তোমার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাব (বারাকাহ দেব)।" (তিরমিজি: ৪৭৫)
এই হাদিসের ব্যাখ্যা: এই হাদিসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে দিনের শুরুতে (সকাল বেলায়) তাঁর ইবাদতের জন্য সময় বের করার নির্দেশ দিচ্ছেন। এর অর্থ হলো, সকালে কিছু সময় আল্লাহর ইবাদতে (নামাজ, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি) কাটালে, আল্লাহ তাআলা বান্দার সারাদিনের কাজে বারাকাহ দান করবেন এবং তার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিজে সামলিয়ে দেবেন। এটি একটি মহান প্রতিশ্রুতি যে, আল্লাহর জন্য সময় ব্যয় করলে আল্লাহ তাকে পার্থিব ও পারলৌকিক উভয় দিক থেকেই যথেষ্ট করে দেবেন।
এই হাদিসে কোন নামাজের কথা বলা হয়েছে? (ইশরাক নাকি সালাতুল দুহা?)
আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর হলো, এই হাদিসে মূলত 'সালাতুল দুহা' (চাশতের নামাজ)-এর কথাই বলা হয়েছে, তবে এর মধ্যে ইশরাকের নামাজও অন্তর্ভুক্ত।
হানাফি ফিকহ ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ:
১. সালাতুল দুহা (চাশতের নামাজ):
- হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ 'আল-হিদায়াহ' এবং 'ফাতাওয়া আলমগিরি'-তে উল্লেখ আছে, দুহার নামাজের সময় শুরু হয় সূর্যোদয়ের পর থেকে যখন সূর্য একটি বর্শার সমান উপরে ওঠে (প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর) এবং তা স্থায়ী থাকে যাবত না সূর্য ঠিক মাথার উপরে আসে (যাওয়াল)। তবে সর্বোত্তম সময় হলো সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে, যেমনটি আপনি উল্লেখ করেছেন।
- ইশরাকের নামাজ মূলত সালাতুল দুহারই একটি অংশ। সূর্যোদয়ের পরপরই (১৫-২০ মিনিট পর) যে নামাজ পড়া হয়, তাকে 'ইশরাক' বলা হয় এবং এরপর থেকে যাওয়ালের আগ পর্যন্ত যে নামাজ পড়া হয়, তা 'দুহা' বা 'চাশত' নামে পরিচিত। উভয়ের বিধান ও ফজিলত প্রায় একই।
২. হাদিসের প্রেক্ষাপট:
- তিরমিজি (রহঃ) এই হাদিসটি বর্ণনা করার পর 'আবওয়াবুস সালাত' (নামাজের অধ্যায়)-এ 'সালাতুদ দুহা' (চাশতের নামাজ) প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিজি তাঁর গ্রন্থে এই হাদিসটিকে 'সালাতুদ দুহা' অধ্যায়ে স্থান দিয়েছেন।
- হাদিসটির ব্যাখ্যায় অনেক মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ বলেছেন, "দিনের প্রথমভাগে আমার জন্য খালি হও" অর্থ হলো দুহার সময় নামাজ পড়া। কারণ, দুহার সময় হলো দিনের প্রথমার্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩. হানাফি পণ্ডিতদের মত:
- মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর ব্যাখ্যায় এসেছে, এই হাদিসে সাধারণভাবে 'সালাতুদ দুহা'-এর কথাই বলা হয়েছে। যেহেতু ইশরাকের নামাজও দুহার সময়ের অন্তর্ভুক্ত, তাই এই হাদিস দ্বারা ইশরাকের নামাজও উদ্দেশ্য হতে পারে। তবে মূল লক্ষ্য হলো, সকাল বেলায় আল্লাহর ইবাদতে সময় দেওয়া।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- এই হাদিসে সালাতুল দুহা (চাশতের নামাজ)-এর কথা বলা হয়েছে, এবং যেহেতু ইশরাকের নামাজ দুহার সময়েরই একটি অংশ, তাই এটিও এই হাদিসের আওতাভুক্ত।
- আপনি যদি সূর্যোদয়ের ১৫-২০ মিনিট পর ২ রাকাত নামাজ পড়েন, সেটি ইশরাক। আর যদি সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে পড়েন, সেটি সালাতুল দুহা। উভয় ক্ষেত্রেই এই হাদিসের ফজিলত পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। (আমিন)
উল্লেখ্য:
- সূত্র: সুনান আত-তিরমিজি (৪৭৫), আল-হিদায়াহ (ফাসল ফি ওয়াকতিদ দুহা), ফাতাওয়া আলমগিরি, রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি)।