দ্বীনদার নয়,তবে সে আমাকে ভালোবাসবে এবং সেইফটি দিবে,এই কারনে কাউকে বিয়ে করা যাবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিয়ে সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: আমার বয়স ২৫। বাসা থেকে বিয়ে প্রস্তাব আনে যা দ্বীনদারিতায় পছন্দ হয় না। তারা ছেলেপক্ষকে ছবি দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। আমি প্র্যাকটিসিং হতে চাই এবং এমন মানসিকতার কাউকে চাই। অন্যদিকে একজন পরিচিত ভাই আমাকে বিয়ে করতে চায়, কিন্তু তার দ্বীনদারিতায় তেমন কিছু পাইনি, তবে সে আমাকে অনেক ভালোবাসে। আমি কি শুধু ভালোবাসা এবং নিরাপত্তার জন্য এমন কাউকে বিয়ে করতে পারব?
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বিয়ের মূল ভিত্তি কী হওয়া উচিত?
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বড় ধরনের অশান্তি ছড়িয়ে পড়বে।" (তিরমিযী: ১০৮৪, ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)
এই হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও চরিত্র-ই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। ভালোবাসা বা শারীরিক আকর্ষণ গৌণ বিষয়।
২. শুধু ভালোবাসার ভিত্তিতে বিয়ে করা কি সঠিক?
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其著名的著作 রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় ও নৈতিক দিক থেকে উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন করা। শুধুমাত্র পার্থিব সুবিধা বা আবেগের ভিত্তিতে বিয়ে করা উচিত নয়।" (রাদ্দুল মুহতার, ৩/৫৮)
শুধু "সে আমাকে ভালোবাসবে" বা "সে নিরাপত্তা দেবে" এই চিন্তায় দ্বীনদারি না থাকা ব্যক্তিকে বিয়ে করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়। কারণ:
- দ্বীনদারি না থাকলে ভবিষ্যতে ধর্মীয় জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি হতে পারে
- সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে
- ভালোবাসা সময়ের সাথে সাথে কমতে পারে, কিন্তু দ্বীনদারির অভাব থেকে যাবে
৩. ছবি দেওয়ার বিষয়ে ইসলামী নির্দেশনা
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, বাসা থেকে ছেলেপক্ষকে ছবি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে:
- অ-মাহরাম পুরুষকে ছবি দেওয়া বা দেখা জায়েয নয়
- বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো: মেয়ে পর্দার আড়াল থেকে ছেলেকে দেখতে পারে (হাদীসে অনুমতি আছে), কিন্তু ছবি আদান-প্রদান করা ইসলামী পদ্ধতি নয়
ফাতাওয়া উসমানি-তে উল্লেখ আছে:
"বিয়ের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো, সম্ভাব্য পাত্র-পাত্রীকে পর্দার আড়াল থেকে দেখা যেতে পারে। তবে ছবি আদান-প্রদান বা সামাজিক মাধ্যমে দেখা ইসলামী পদ্ধতি নয়।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫৬)
৪. অভিভাবকদের চাপের মুখে কী করা উচিত?
আপনার উচিত অভিভাবকদের সাথে শান্তভাবে কথা বলা এবং তাদের বোঝানো যে:
- আপনি দ্বীনদার পাত্র চান
- ছবি দেওয়া ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়
- দ্বীনদার পাত্র পাওয়া গেলে আপনি রাজি আছেন
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:
"বিয়ের ক্ষেত্রে সন্তানের মতামত নেওয়া জরুরি। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ধর্মীয় পছন্দকে সম্মান করা।" (বেহেশতী জেওর, ৮/৪৫)
৫. আপনার করণীয়
১. দ্বীনের দিক থেকে পছন্দ না হলে সেই প্রস্তাবে রাজি হবেন না - কারণ এটি আপনার ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হবে ২. পরিচিত ভাইয়ের ব্যাপারে - তার দ্বীনদারি সম্পর্কে আরও জানার চেষ্টা করুন। সম্ভবত আপনি তার সম্পর্কে পুরোপুরি জানেন না। তার নামায, রোযা, চরিত্র ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজ নিন ৩. ইস্তিখারা করুন - আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দোয়া করুন ৪. অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করুন - তাদের বোঝান যে আপনি দ্বীনদার পাত্র চান এবং ছবি দেওয়া ইসলামী পদ্ধতি নয়
৬. গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেছেন:
"বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্বীনদারি। ভালোবাসা একটি গৌণ বিষয়। দ্বীনদার স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ, কিন্তু ভালোবাসা থাকলেই দ্বীনদারি তৈরি হবে না।" (মা'আরিফুল কুরআন, ৪/৩৮০)
সংক্ষিপ্ত উত্তর
না, শুধুমাত্র ভালোবাসা ও নিরাপত্তার জন্য দ্বীনদারি না থাকা ব্যক্তিকে বিয়ে করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক নয়। বিয়ের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দ্বীনদারি ও চরিত্র। আপনার উচিত:
- অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করে দ্বীনদার পাত্রের সন্ধান করা
- ছবি দেওয়ার পরিবর্তে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে পাত্র দেখার ব্যবস্থা করা
- পরিচিত ভাইয়ের দ্বীনদারি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানার চেষ্টা করা
- আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করা
আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য উত্তম জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
সূত্র:
- কুরআন ও হাদীস
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)
- ফাতাওয়া উসমানি
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতী মুহাম্মদ শফী)