স্বামী যদি স্ত্রীকে বলে যে আমি আর তোমাকে মারবো না। আর যদি মারি তাহলে তালাক হয়ে যাবে। এটা বলার পর যদি কখনো মারে তাহলে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
তালাকের শর্ত সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: স্বামী স্ত্রীকে কথা দিয়েছে যে আর গায়ে হাত তুলবে না। স্ত্রী শর্ত দিয়েছে যে, গায়ে হাত তুললে তালাক হয়ে যাবে এবং স্বামী তা মেনে নিয়েছে। এখন যদি স্বামী পুনরায় স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে, তাহলে কি তালাক পতিত হবে?
উত্তর
হ্যাঁ, যদি স্বামী স্পষ্টভাবে এই শর্তে সম্মত হয় যে, "গায়ে হাত তুললেই তালাক" এবং এরপর সে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে, তাহলে তালাক পতিত হবে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিস্তারিত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ
১. শর্তযুক্ত তালাকের বিধান
ইসলামী ফিকহে শর্তযুক্ত তালাক (তালাকে মু'আল্লাক) বৈধ। যখন কেউ বলে, "যদি অমুক কাজ করি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক" — এই ধরনের শর্তযুক্ত বক্তব্য শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হয়।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা বাকারা: ২২৯)
হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা করে করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রাজ'আত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিযী: ১১৮৪)
২. হানাফী ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে, শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হলেই তালাক পতিত হয়। এটি ইজমা (ঐকমত্য) দ্বারা প্রমাণিত।
ফাতাওয়া আলমগীরী তে উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ বলে, 'যদি আমি অমুক কাজ করি তাহলে আমার স্ত্রী তালাক' — এরপর সে ঐ কাজ করলে তালাক পতিত হবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৩৭৩)
রদ্দুল মুহতার (শামী) তে বলা হয়েছে:
"শর্তযুক্ত তালাকের ক্ষেত্রে শর্ত পূরণ হওয়া মাত্রই তালাক পতিত হয়, চাই তা গুরুত্ব সহকারে বলা হোক বা রাগের মাথায়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৬৫)
৩. এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত
আপনার প্রশ্নে উল্লেখিত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে:
১. স্বামী বলেছে: "আর কখনো গায়ে হাত তুলবে না" ২. স্ত্রী বলেছে: "যদি গায়ে হাত তোলো তাহলে তালাক হয়ে যাবে" ৩. স্বামী এই শর্ত মেনে নিয়েছে
এক্ষেত্রে স্বামীর "মেনে নেওয়া" দ্বারা শর্তযুক্ত তালাকের ঘোষণা কার্যকর হয়েছে। এখন যদি স্বামী স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে, তাহলে শর্ত পূরণ হওয়ায় তালাক পতিত হবে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা
তবে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে:
ক. নিয়তের গুরুত্ব: স্বামী যদি শর্তটি মেনে নেয় শুধু স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য, কিন্তু তার নিয়ত তালাকের ছিল না, তবুও হানাফী মাযহাব মতে শর্ত পূরণ হলে তালাক পতিত হবে। কারণ তালাকের ক্ষেত্রে নিয়তের চেয়ে বক্তব্যের গুরুত্ব বেশি।
খ. হাত তোলার ধরন: "গায়ে হাত তোলা" বলতে সাধারণত মারধর করা বুঝায়। তবে যদি স্বামী শুধু হাত তুলে কিন্তু না মারে, তাহলে সেটি শর্ত পূরণ হয়েছে কিনা তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। সাধারণত হাত তোলা এবং মারার মধ্যে পার্থক্য করা হয়।
গ. তালাকের সংখ্যা: এটি প্রথম তালাক হবে। এরপর স্বামী-স্ত্রী ইচ্ছা করলে নতুন করে নিকাহ করতে পারবেন (যদি এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হয়)। ঘ গায়ে হাত তুলা বা প্রহার করার দ্বারা একবারই তালাক পতিত হবে। পরবর্তীতে মারলে আর তালাক হবে না।
ফতোয়া
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ফতোয়া হলো:
যদি স্বামী স্পষ্টভাবে স্ত্রীর শর্তে সম্মত হয় যে, "গায়ে হাত তুললে তালাক" এবং এরপর সে স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে (মারধর করে), তাহলে একটি তালাকে বায়েন (অপারক) পতিত হবে। অর্থাৎ তালাক কার্যকর হয়ে যাবে এবং স্ত্রী তার উপর হারাম হয়ে যাবে। তবে ইদ্দতের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী নতুন নিকাহ করতে পারবেন (যদি এটি প্রথম তালাক হয়)।
ব্যবহারিক পরামর্শ
১. স্বামীর কর্তব্য: স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা সম্পূর্ণ হারাম ও গুনাহের কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।" (তিরমিযী: ৩৮৯৫)
২. স্ত্রীর কর্তব্য: স্ত্রীর উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং স্বামীকে সংশোধনের চেষ্টা করা। তবে শর্ত দেওয়ার আগে পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
৩. পরিবারের ভূমিকা: ঝগড়া এড়াতে এবং সম্পর্ক ঠিক রাখতে উভয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যস্থতা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।